প্রয়োজন কৈশোরবান্ধব ব্যবস্থা

প্রজনন স্বাস্থ্য

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০১৮      

আমিনুর রহমান

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (২০১১) তথ্যানুযায়ী, বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি কিশোর-কিশোরী। উভয়ের সংখ্যাই প্রায় সমান। এই সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যসহ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে এই বিশাল সংখ্যক কিশোর-কিশোরী যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার এবং সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এখনও বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট সীমিত অর্থায়নে খাগড়াছড়ি, কিশোরগঞ্জ ও বরগুনা জেলার মোট চারটি উপজেলায় এ বিষয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করে। এসব এলাকায় যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক কয়েকটি সরকারি এবং এনজিওর কর্মসূচি রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, কিশোর-কিশোরীদের একটি বড় অংশ এখনও যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত তথ্য এবং সেবার উৎস সম্পর্কে সঠিকভাবে জানার সুযোগ পায়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী বাল্যবিয়ের হার ৫২ শতাংশ বলা হলেও ইউনিসেফের সর্বশেষ (২০১৮) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ৫৯ শতাংশ। তবে গবেষণাধীন এলাকায় বর্তমানে এই হার ৫০ শতাংশের বেশি। কিছু

এলাকা যেমন কিশোরগঞ্জ ও বরগুনার কিছু উপজেলায় এই হার ৬০ শতাংশের ওপরে, যা জাতীয় হারের চেয়ে বেশি।

তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, বাঙালিদের তুলনায় খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনগোষ্ঠী যথা ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমাদের মধ্যে বাল্যবিয়ের পাশাপাশি কিশোরী মায়ের সংখ্যা কম পাওয়া গেছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাধারণত পরিণত বয়সে ছেলেমেয়েদের বিয়েপ্রথা লক্ষ্য করা গেছে। এ ক্ষেত্রে বাঙালির চেয়ে পাহাড়িদের অর্জন বেশি।

অনেকে ধরেই নেয়, পরিবার পরিকল্পনা মানেই জন্মনিয়ন্ত্রণ বা জনসংখ্যা কমানো। এ ক্ষেত্রে পাহাড়িদের মধ্যে অনেক সময় এ ধারণা কাজ করে, পাহাড়িদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যই রাষ্ট্র পরিবার পরিকল্পনা বা জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। সেখানে একজন প্যারামেডিক জানান, 'অনেক সময় কিছু লোক (পাহাড়ি) জিজ্ঞেস করেন, আমরা তাদের জনসংখ্যা কমাতে এসেছি কিনা। যদিও বেশিরভাগ মানুষ এখন সহযোগিতা করছে; তবে এমন ধারণার কারণে কিছু মানুষ সেবা নিতেও দ্বিধা করে।' কিছু তথ্যদাতা জন্মনিয়ন্ত্রণকে 'হত্যা'র সঙ্গেও তুলনা করে।

গর্ভবতী মায়েদের সেবার ক্ষেত্রে নূ্যনতম চারবার গর্ভকালীন এবং দু'বার গর্ভ-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করার জন্য সরকার ও এনজিওর কর্মসূচি রয়েছে। এই সেবা গ্রহণের হার কয়েক বছর আগে গবেষণাধীন এলাকায় যথাক্রমে মাত্র ৯ ও ১০ শতাংশ ছিল, যা বর্তমানে যথাক্রমে প্রায় ৫০ ও ৮০ শতাংশে উন্নীত। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৪-এর তথ্যানুযায়ী এই সেবাগুলো গ্রহণের হার যথাক্রমে ৩১ ও ৩৬ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী

যদিও এ বিষয়ে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর পরিচালিত প্রকল্পগুলো সফলতা অর্জন করছে;

তবে এখনও কিশোরী মায়েদের অনেকেই

ঠিকমতো জানে না, তাদের নূ্যনতম কতবার এসব সেবা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে পাঠ্যপুস্তকে কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও শিক্ষকরা নিজেরা না পড়িয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ে নিতে বলেন বলে জানা যায়। বর্তমানে গবেষণাধীন এলাকায় ৬০ শতাংশ শিক্ষকের যৌন শিক্ষা সম্পর্কে ধারণা আছে, যা আগে আরও কম ছিল। ফলে বাকিরা শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে কার্যকরভাবে বলতে পারেন না। আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী নিজেরাও এগুলো ভালোভাবে পড়ে না বা পড়লেও এ বিষয়ে তাদের প্রশ্ন থাকলে তা কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারে না।

সমাজতত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের যৌন আচরণকে নিয়ন্ত্রণ ও 'সুশৃঙ্খল' করতে বিভিন্ন নৈতিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে যৌনতাকে ব্যক্তিগত এবং গোপন বিষয় হিসেবে পরিণত করা হয়েছে। এটি একটি সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। তবে ঐতিহাসিকভাবে এই নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত হয়েছে এবং মানুষের যৌনচর্চার পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত অপরাপর বিষয় যেমন যৌনস্বাস্থ্য, যৌনশিক্ষা, যৌনচর্চা সম্পর্কে আলোচনা করা ইত্যাদি বিষয়কে গোপন, অনৈতিক বা ট্যাবু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর ফলে এগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা লজ্জার বিষয় বা কখনও কখনও 'অসামাজিক' হিসেবেও দেখা হয়।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, সামাজিক বাধা ছাড়াও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কৈশোরবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং উন্নতকরণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যদিও ইতিমধ্যে জেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে 'কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্য কর্নার' চালু করা হচ্ছে। তবে কিশোর-কিশোরীদের একটি বড় অংশ এই সেবা কর্নার সম্পর্কে জানে না।

কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের উন্নয়নে নিল্ফেম্নাক্ত সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে :

প্রথমত, বর্তমানে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রের উদ্যোগে সংশ্নিষ্ট বিষয়ের ওপর বিভিন্ন সেশনের আয়োজন এবং স্থানীয় ভাষায় নির্মিত ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা যেতে পারে। পারিবারিক পরিসরে আলোচনা বাড়াতে অভিভাবকদের উৎসাহ প্রদান করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে স্যাটেলাইট ক্লিনিকের সংখ্যা এবং চুক্তিভিত্তিক হলেও জনবল বাড়ানো প্রয়োজন। পরিবার কল্যাণকেন্দ্রে দক্ষ কাউন্সিলর প্রয়োজন। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, যেসব এলাকায় সংশ্নিষ্ট বিষয়ে এনজিও কর্মসূচি রয়েছে, সেসব এলাকায় এনজিওকর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরের মানুষের

সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পরিবার কল্যাণকেন্দ্র এনজিও কর্মসূচির সফল বিষয়গুলো অনুসরণ করতে পারে।

চতুর্থত, শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে ভিডিও ডকুমেন্টারি বা ভিজুয়াল মাধ্যম ব্যবহার করে ওই বিষয়ে পাঠদান করতে পারেন। তবে সেখানে প্রশ্ন-উত্তরের ব্যবস্থা থাকতে তবে। এ ছাড়া এ বিষয়ে শিক্ষকদের

আরও বেশি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এ জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ কারিকুলামে সমন্বিত যৌনতা শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
shohaganp@gmail.com

গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট