রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে বলা যায়, এরা জম্ম থেকেই জ্বলছে। এই জন্ম থেকে জ্বলার বিষয়টি তাদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগের সময় থেকে। এর সূত্রপাত ঘটে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান বার্মা দখল করে। এর ফলে, ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তা বার্মার ক্ষমতা দখলের পর ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর 'অপারেশন কিংড্রাগন' পরিচালনা করে। এর পর থেকেই তাদের ওপর দমন-নিপীড়ন চলতে থাকে। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তবে গত ২৫ আগস্ট, ২০১৭ মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কমপক্ষে ২০টি তল্লাশি চৌকিতে হামলার জের ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মুসলিম বিদ্রোহীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয় বলে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এর পর থেকে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী প্রাণ বাঁচাতে শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, যদিও বাংলাদেশ সরকার এখনও তাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে অনুপ্রবেশকারী হিসেবেই আখ্যায়িত করছে। ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, ২৫ আগস্ট থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে সর্বমোট ৬ লাখ ২৭ হাজার ৬৮০ জন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়াও গত ৫০ বছরে তিন দফায় (১৯৭৭-৭৮, ১৯৯১-৯২ ও ২০১২ সালে) প্রবেশকৃত (প্রতিবারই সহিংসতা ও দমন-নিপীড়ন এড়াতে) চার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আগে থেকেই শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক। আর এখনও রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। ইউএনএইচসিআর এবং আইওএমের মতে, প্রতিদিন কয়েকশ' রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে এবং মানবিক কারণে বাংলাদেশও তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু ঘনবসতির এই দেশে তারা খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান সংকটসহ নানা ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে। এসব ঝুঁকির মধ্যে অন্যতম হলো রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়া বা তার শিকার হওয়া। কারণ আগের তিন দফায় প্রবেশকৃত রোহিঙ্গাদের কারও কারও জঙ্গি তৎপরতাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যমতে, রামুতে বৌদ্ধ বিহারে সন্ত্রাসী হামলায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম, মাদক পাচার, মানব পাচার, অস্ত্র বেচাকেনা, ধর্ষণ, ভাসমান পতিতাবৃত্তি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, চোরাকারবারি, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই ইত্যাদি অপরাধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারে। পক্ষান্তরে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে মানব পাচার, নারী ও শিশু পাচার, ধর্ষণ, ছিনতাই, শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধের শিকারও হতে পারে।

প্রথমত, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের যেসব অপরাধ করার আশঙ্কা রয়েছে তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনে রিক্রুট হওয়া। কারণ জঙ্গি সংগঠনগুলোর জঙ্গি কর্মী সংগ্রহের একটি বড় উৎস হলো নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষ আর রোহিঙ্গাদের ওপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে চলমান নির্যাতন তাদের জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার ঝুঁকিকে বৃদ্ধি করেছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে মার্টনের নৈরাজ্য বা এনোমি তত্ত্ব দিয়ে তাদের অপরাধ কার্যক্রমকে ব্যাখ্যা করা যায়। মার্টনের মতে, মানুষ যখন সমাজ জীবনের প্রত্যাশিত লক্ষ্যগুলো সমাজের প্রচলিত নিয়ম-কানুনের মধ্যে থেকে অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তখনই সে অপরাধ সংঘটিত করে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে।

দ্বিতীয়ত, সম্প্রতি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ড্যানিলোম্যানডিক তার এক গবেষণায় (২০১৭) দেখান, বেশিরভাগ সিরীয় শরণার্থী মানব পাচার চক্রের সঙ্গে তথ্যদাতা ও সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করছে। সুতরাং রোহিঙ্গাদেরও একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে।

তৃতীয়ত, ইংল্যান্ডের কিছু গবেষকের এক গবেষণায় দেখা যায়, আমেরিকার শরণার্থীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এর থেকে ধারণা করা যেতে পারে, রোহিঙ্গারা চোরাকারবারি, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই ইত্যাদি অপরাধে সম্পৃক্ত হতে পারে। অপর এক গবেষণায় ডিয়াকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড ইভান (২০১৪) দেখান, ভিয়েতনামের শরণার্থীদের সঙ্গে মাদক পাচারের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান, যা ইঙ্গিত দেয় রোহিঙ্গারা মাদক পাচারেও সম্পৃক্ত হতে পারে। এ ছাড়াও রোহিঙ্গাদের অস্ত্র বেচাকেনা, ধর্ষণ, ভাসমান পতিতাবৃত্তি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইত্যাদি অপরাধ কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা তো রয়েছেই।

চতুর্থত, এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলে প্রবেশ করায় সেখানকার অধিবাসীরা (বিশেষ করে কক্সবাজার ও বান্দরবান) সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে, যাদের মধ্যে রোহিঙ্গা দ্বারা বিভিন্ন অপরাধের শিকার হওয়ার ভীতি তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে হত্যাসহ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। ফলে পার্বত্যাঞ্চলের মানুষের মধ্যে অপরাধভীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পঞ্চমত, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে মানব, নারী, শিশু এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচারকারীদের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। কারণ বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের গণনা বা বায়োমেট্রিক নিবন্ধন চলমান। যার ফলে তাদের খুব সহজেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার করার লক্ষ্যে অপহরণ করা হতে পারে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এ সম্পর্কে সহজে অবগতও হবে না।

রাজারত্নাম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক রেমিমাহ জাম দাবি করেন, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে দেরি করে ফেলেছে। তার মতে, আল কায়দা ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যুকে পুঁজি করে নতুন যোদ্ধা সংগ্রহের চেষ্টায় নেমে পড়েছে, যা বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের জন্য অনেক বড় হুমকিস্বরূপ। পরিশেষে বলা যায়, রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দূরীকরণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক তাদের অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত রোহিঙ্গাদের জন্য অতি সত্বর কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে তারা সহজে মানসিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারে।

গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট

মন্তব্য করুন