গাজীপুরে রেলপথে নাশকতা
রাতের পরিকল্পনা বৈঠকে ছয় আইনজীবীসহ ২৮ জন
.
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০১:১০ | আপডেট: ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০৬:৫৫
গাজীপুরে রেলপথে নাশকতার আগে ১১ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে ২৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান আজমল ভূঁইয়ার টাংকিরপাড়ের বাসায় গোপন বৈঠক হয়। সেখানে বিএনপিপন্থি একাধিক কাউন্সিলরসহ ২৮ জন উপস্থিত থাকার তথ্য পেয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ছয়জন ছিলেন আইনজীবী। ওই বৈঠকেই কে কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
শ্রীপুরের ভাওয়ালগড়ের বনখড়িয়া এলাকায় রেলপথে নাশকতায় ঘটনার জড়িত সাতজনকে গত শনিবার গ্রেপ্তার করে গাজীপুর মহানগর পুলিশ। গ্রেপ্তার তিনজন রোববার আদালতে জবানবন্দি দেন। তারা হলেন– মহানগর বিএনপির সদস্য ও আজিম উদ্দিন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সদস্য শাহানুর আলম, মেহেদী হাসান ও জান্নাতুল ইসলাম। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে রেল ঘিরে নাশকতার বড় পরিকল্পনা ও বৈঠকে যারা ছিলেন, তাদের নাম-পরিচয় উঠে এসেছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ১১ ডিসেম্বর রাতে কাউন্সিলর হাসানের বাসার ওই পরিকল্পনা বৈঠকে ছিলেন আইনজীবী মেহেদী হাসান এলিস, আব্দুস সালাম, মনির, সাইদুল, নাসির ও কৌশিক। তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আরও ছিলেন ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ শাহীন আলম, সাইফুল ইসলাম টুটুল, অটোরিকশা ব্যবসায়ী নজরুল, মৎস্য খামারি বুলবুল, জয়নুদ্দিন, ব্যবসায়ী আসাদ সরকার, লিটন, পারভেজ, আইনুদ্দিন, বিল্লাল, রশিদ ও আক্তার তালুকদার।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈঠকে থাকা আইনজীবীদের কেউ কেউ বিএনপি নেতাকর্মীর মামলা আদালতে পরিচালনা করে আসছেন। নাশকতার পরিকল্পনাকারী হিসেবে আইনজীবীসহ যাদের নাম আসছে, তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা হবে।
শাহানুর আলম আদালতে স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, ওই বৈঠকে খাবার পরিবেশনের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। রেলপথের নাশকতার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব ইবনে সিনহা তোহাকে দেওয়া হয়। তোহা আজিম উদ্দিন কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক। সাড়ে ১২টার দিকে পরিকল্পনা বৈঠক শেষ হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৩ ডিসেম্বর গাজীপুরে রেললাইন কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়।
গাজীপুরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার সাতজন হলেন– গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. হাসান আজমল ভূঁইয়া, জান্নাতুল ইসলাম, মেহেদী হাসান, জুলকার নাইন আশরাফি ওরফে হৃদয়, শাহানুর আলম, সাইদুল ইসলাম ও সোহেল রানা।
তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানান, তোহা ছাড়াও পরিকল্পনাকারীর অনেককে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি। যারা রেলপথ কাটার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এমন গুরুত্বপূর্ণ দু’জনকে আইনের আওতায় আনতে এরই মধ্যে একাধিক স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। ওই পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য, ভাওয়ালগড়ের বনখড়িয়ায় রেলপথ কাটার জন্য গাজীপুরের বাইরে থেকে দু’জনকে ওই এলাকায় নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একজন ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। অন্যজনের পরিচয় ও পেশা প্রকাশ করতে রাজি হননি ওই কর্মকর্তা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ধারণা, গাজীপুরের ঘটনার পলাতকরা মঙ্গলবার ভোরে তেজগাঁওয়ের ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন।
গাজীপুরের ঘটনায় গ্রেপ্তার জান্নাতুল ইসলাম আদালতে জবানবন্দি ও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানান, ঘটনার রাত ৯টার দিকে তোহা তাকে ফোন করে গাজীপুরে একটি মসজিদের সামনে যেতে বলেন। কিছু সময় পর মাইক্রোবাস নিয়ে তোহা সেখানে আসেন। ওই গাড়িতে তোহাসহ সাতজন ছিলেন। গাড়ির পেছনে একটি গ্যাস সিলিন্ডার, একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও দুটি ব্যাগ ছিল। গাজীপুরের বিআইডিসি বাজারে নাশতা করেন তারা। এর পর তোহাকে কোনো এক ব্যক্তিকে ফোনে জানান, দেড় ঘণ্টা পর কাজ শুরু হবে। দেড় ঘণ্টা পর তারা বনখড়িয়া এলাকায় যান। সেখানে গিয়ে দেখেন– মঈন, মেহেদী ও রাব্বী আগে থেকে দাঁড়িয়ে আছেন। এর পর তারা রেলপথের পাশ দিয়ে এক-দেড় ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করেন। এ সময় জান্নাতুল ও তোহার হাতে ব্যাগ ছিল। মঈন বহন করছিলেন গ্যাস সিলিন্ডার। আর মেহেদীর হাতে ছিল অক্সিজেন সিলিন্ডার। জান্নাতুল পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে আসা দুই ব্যক্তি তাদের সঙ্গে ছিলেন। তবে তাদের নাম জানা নেই। বনখড়িয়া ব্রিজের কাছে রেলপথ কাটা শুরু করেন তারা। ঢাকা থেকে আসা দুই ব্যক্তি রেলপথ কাটার ব্যাপারে পারদর্শী ছিলেন। তারা মূলত লাইন কাটছিলেন, বাকিরা সহায়তা করেন। রেলপথ কাটা শেষ করে মাইক্রোবাস নিয়ে সবাই গাজীপুর থেকে ঢাকায় চলে আসেন।
বিয়ের বরযাত্রীর কথা বলে রেন্ট-এ-কারের মাইক্রোবাসচালক সাইফুল ইসলামকে ওই রাতে ভাড়া করে দুর্বৃত্তরা। সাইফুল সমকালকে বলেন, রাত যত গভীর হচ্ছিল, যাত্রীদের তৎপরতা দেখে তিনি ভয় পেয়ে যান। অধিকাংশ মাস্ক পরা ছিল। রেলপথ থেকে অনেক দূরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। দেড় ঘণ্টা দেরি হবে বলে তাকে গাড়ির ভেতরে ঘুমিয়ে পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে যাত্রীদের একজন তাকে পাহারা দিচ্ছিলেন।
গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, নাশকতার ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা জানা গেছে। একাধিক জায়গায় অভিযান চলছে।
গাজীপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি কামাল হোসেন বলেন, নাশকতার যে বৈঠক হয়েছিল সেখানে বিএনপিপন্থি আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার অনেকে ছিলেন।
- বিষয় :
- ট্রেনে আগুন