ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মোশাররফ হত্যাকাণ্ড ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির উত্থান

স্মরণ

মোশাররফ হত্যাকাণ্ড ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির উত্থান

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৮:১৭ | আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৯:৫২

৩ ফেব্রুয়ারি যশোরের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুবার্ষিকী। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও গণপরিষদ সদস্য মোশাররফ হোসেনকে ১৯৭৪ সালের এই দিনে নিজ বাসভবনে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা হত্যা করে। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য ও জাসদের অন্যতম সহসভাপতি। যশোর জিলা স্কুল ও পরে যশোর এমএম কলেজের ছাত্র মোশাররফ হোসেন কিশোর বয়স থেকেই ছিলেন বিদ্রোহী প্রকৃতির। যে কোনো অন্যায় দেখলে রুখে দাঁড়াতেন। অভিজাত সামন্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় বিত্ত-বৈভবের মধ্যেই বড় হয়েছেন। কিন্তু দারিদ্র্যের কশাঘাতে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে অকুণ্ঠ ছিলেন সবসময়। অসহায় মানুষের প্রতি কিশোর মোশাররফের সহমর্মিতার অনেক ঘটনা পরে শুনেছি তার মায়ের মুখে। পরিণত বয়সে সাহায্যপ্রার্থীদের বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ দেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, কারও সন্তানের শিক্ষা ব্যয়ভার বহন থেকে শুরু করে সম্ভাব্য সবরকম সহায়তার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন উদারহস্ত।
অবিভক্ত বাংলার কলকাতায় অবস্থিত সুরেন্দ্রনাথ কলেজে (সাবেক রিপন কলেজ) আইনের ছাত্র ছিলেন মোশাররফ হোসেন। ভারত ভাগকে কেন্দ্র করে দেখা দেওয়া দাঙ্গার বিরুদ্ধে সেই তরুণ বয়সেই তিনি ছিলেন তৎপর। 'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই' কথাটি তিনি আদর্শ হিসেবে নিয়েছিলেন। পেশাগত জীবনে আইনজীবী হিসেবে মোশাররফ হোসেন যোগ দেন যশোর বারে। একই সঙ্গে সক্রিয় হন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু উত্থাপন করেন বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা। ছয় দফা দাবিকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের ভেতরেই বিরোধিতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। আওয়ামী লীগ ছেড়ে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টে (পিডিএম) যোগ দিয়েছিলেন অনেক নেতা। নবাবজাদা নসরুল্লাহর জোটে যোগ দিতে পশ্চিম পাকিস্তানে হাজির হওয়া নেতাদের মধ্যে যশোরের নেতাও ছিলেন। ৬ দফা আন্দোলন ও উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সূত্রে '৭০-এর নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের প্রতি প্রবল জনসমর্থন তৈরি হয়েছিল। তা দেখে তারা পরে ফিরেও আসেন।
ছয় দফা আন্দোলনের সময় যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন হাজি নূর বক্স। আর মোশাররফ হোসেন ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা তখন বেশ নাজুক। একদিকে আওয়ামী লীগ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের ওপর নির্বিচারে চলত সরকারি স্টিমরোলার, জেল-জুলুম-হুলিয়া-হেনস্তা। অন্যদিকে নেতাদের দলত্যাগ। এমন প্রতিকূল পরিবেশে যশোরে ছয় দফা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মোশাররফ হোসেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে যখন বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে, তখন যশোরে প্রায় একা হাতে আওয়ামী লীগকে সামলেছেন তিনি। রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব তথা আগরতলা মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিলাভের খবর যশোরে পৌঁছার পর মোশাররফ আনন্দ মিছিলের আয়োজন করেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে যশোর সদর আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন মোশাররফ হোসেন। কিন্তু পাকিস্তানে থেকে যাওয়ার চিন্তা নিয়ে যারা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি করতেন মোশাররফ হোসেন তাদের দলে ছিলেন না। বাংলার স্বাধীনতা অসম সাহসী দূরদর্শী কিছু মানুষের স্বপ্ন ছিল। সে স্বপ্নকে সাধারণ মানুষের কাছে সম্ভবপর এক নিকট ভবিষ্যৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ছিল দুঃসাহসী-দুঃসাধ্য এক কাজ। ধারাবাহিক রাজনৈতিক তৎপরতা ও আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনমানসকে প্রস্তুত করে তুলেছিলেন মোশাররফ হোসেনের মতো নেতারা।
তিনি জানতেন সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমেই ছিনিয়ে আনতে হবে স্বাধীনতা। একদিকে তিনি যেমন সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রশ্নে উদ্দীপ্ত ছাত্রলীগ নেতাদের তত্ত্বাবধান করেছেন, অন্যদিকে তেমনি ইপিআরের বাঙালি সেনা সদস্যদের সঙ্গে বজায় রেখেছেন নিবিড় যোগাযোগ। 'বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র' সংকলনের সপ্তম খণ্ডে তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তানের ৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন যুক্ত করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনে যশোরের ১২ জন এমপিকে অভিযুক্ত করার তথ্য রয়েছে। তাতে দেখা যায়, দু'জনের বিরুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশ চাওয়ার তথা পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতা করার অভিযোগ আনা হয় ১২৪ (ক) ধারায়। ওই দু'জনের একজন মোশাররফ হোসেন। আমার এখনও কানে বাজে, বাবাকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছিল ২৬ মার্চ। সংশ্নিষ্ট তালিকায় ১২৪ (ক) ধারায় অভিযুক্ত আরেকজন হলেন নড়াইলের এমপি মতিউর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন ১৯৭০ সালে ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর দলীয় পরিমণ্ডলে আদর্শিক দূরত্ব তৈরি হতে থাকে তার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে রাষ্ট্রদূত করে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেন। গণমানুষের জন্য রাজনীতি করা মোশাররফ তা মেনে নিতে পারেননি। ১৯৭২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মোশাররফ হোসেন সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও সংসদ থেকে পদত্যাগ করা বিরলপ্রজ রাজনীতিবিদদের একজন তিনি।
বাবার মৃত্যু দিবসে আমার মা ও আমরা সাত ভাইবোন তাকে স্মরণ করি অপূরণীয় ব্যক্তিগত ক্ষতির বেদনা নিয়ে। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ড এর রাজনৈতিক তাৎপর্যের জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির সবার জন্য স্মর্তব্য। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের যে প্রবণতায় মোশাররফ হোসেনকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল, সেই প্রবণতার ধারাবাহিকতায় প্রাণ দিতে হয়েছে আরও বহু মুক্তিযোদ্ধাকে। আমি মনে করি, এতেই স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির উত্থানের পথ তৈরি হয়েছিল।
সাবেক সংসদ সদস্য; সাবেক সভাপতি
মহিলা শ্রমিক লীগ

আরও পড়ুন

×