সংকট উত্তরণের পথ কী
জেতার আগেই বিজয়ীর আচরণ আওয়ামী লীগের
সুলতানা কামাল
সুলতানা কামাল
প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৩ | ০১:৪৭
সংলাপ নাকচ। রাজনৈতিক সংকট সমাধান হয়নি। বাড়ছে অর্থনৈতিক সংকটও। হরতাল-অবরোধ করছে বিএনপি ও সমমনারা। নেতাদের অনেকে কারাগারে, বাকিরা আত্মগোপনে। চলছে দ্বাদশ সংসদের নির্বাচনী ট্রেন। প্রার্থী বাছাইয়ে ব্যস্ত আওয়ামী লীগ ও শরিকরা। ‘কিংস পার্টি’ও প্রার্থী ভাগাতে দিচ্ছে লোভনীয় টোপ ও চাপ। সর্বত্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এ পরিস্থিতিতে যা বলছেন বিশিষ্টজন
অগ্রহায়ণ মাসের দশটা দিন চলে গেল। আবহাওয়ার তেলেসমাতিতে এখন বাতাসে আর সেই ছোটবেলার মৌসুমি ফুল-ফলের পরিচয় পাই না। রান্নাঘর থেকে শীতের সবজি রান্নার গন্ধ ভেসে আসে না। বছরের এই সময়টায় একদিকে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করার তোড়জোড়; আর পরীক্ষা শেষে দেশের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া, আবহাওয়া সুখকর থাকায় নানা অনুষ্ঠান, চড়ুইভাতি, আনন্দ-উৎসব, মেলায় গিয়ে নাগরদোলা আর চরকিতে চড়ার উদ্দীপনার কিছুই অবশিষ্ট নেই। এ সময়টা নাচ-গান, নাটক আর যাত্রাপালা অনুষ্ঠানের জন্যও সবচেয়ে উপযুক্ত। গ্রামে যাত্রাপালার সুদিনের সমাপ্তি ঘটেছে বহুদিন আগেই ধর্মান্ধ, মৌলবাদী সংকীর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির দাপটে। শহরে সামাজিক জীবন আগের তুলনায় সংকুচিত হয়ে এলেও কিছু না কিছু আনন্দ আয়োজনের প্রচলন ছিল।
ইদানীং নবীন-প্রবীণ, শিশু থেকে বয়স্ক– সবাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘরবন্দি জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
বিরাট বিরাট চওড়া রাস্তা তৈরি হচ্ছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে একবার উঠে পড়তে পারলে অপেক্ষাকৃত ধনীরা নির্বিঘ্নে চলাচলের সুখ কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারছেন। কিন্তু নেহাত প্রয়োজন না হলে কি নিজস্ব গাড়ি, কি সরকারি যানবাহন বা অন্য যে কোনো ভাড়া করা শকটে (গাড়ি) বাড়ি থেকে বের হওয়ার কথা ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যায় অধিকাংশ মানুষের। শুধু তাই নয়, রীতিমতো ভয় লাগতে থাকে। ১৫ মিনিটের রাস্তা পেরোতে কতক্ষণ লাগবে, কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। হিসাবের বাইরের সংখ্যার নানা রকমের যানবাহনের বেপরোয়া, অনিয়ন্ত্রিত এবং আইন ভাঙা চলাচলে রাস্তায় বেরোনো মানুষের নাজেহাল অবস্থা। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনকেও দেখতে যাওয়ার আগ্রহ দমিয়ে রাখতে হয় অধিকাংশ সময়। এমনকি জন্ম, মৃত্যু, বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতেও একজন আরেকজনের কাছে ছুটে যেতে, পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারছে না সব সময়। একটা স্বাভাবিক, মানবিক জীবনযাপন ক্রমে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। দুঃসহ যানজটই শুধু এর একমাত্র কারণ নয়। এটি অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম। অন্য কারণগুলো হচ্ছে মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অনিরাপত্তাজনিত।
এখন আমরা এমন একটা সময় অতিক্রম করে চলেছি, যেখানে প্রতিদিন সকালে উঠে খবর নিতে হয় বাইরে বেরোনো কতটা নিরাপদ। রাস্তায় কয়টা গাড়ি পুড়েছে, কোন এলাকায় রাজনৈতিক দলের সদস্য বা কার সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার কারণে বা তাদের কোন নেতার সমর্থনে শয়ে শয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে বা ভাড়া করা পিকআপে করে মিছিলে বের হয়েছে বলে সাধারণ মানুষ অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ-শিক্ষায়তন কিংবা হাসপাতালে সময়মতো পৌঁছানোর আশা ছেড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথে বসে থাকছে অসহায়ের মতো। এর ওপর যেদিন গুরুত্বপূর্ণ বা অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা চলাচল করবেন, সেদিন কোনো রাস্তা সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়ে আছে। কম গুরুত্বপূর্ণ মানুষের জন্য ভাগ্যে লেখা হয়ে গেছে নিজেদের বাজারহাট, অন্য সব দৈনন্দিন কাজকর্ম– সব কিছু সমাধা করতে কেবলই কৌশল বের করতে গলদঘর্ম হওয়া। এর সবই যে নতুন করে হচ্ছে, তা নয়। তবে এ মুহূর্তে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিয়েছে, সাধারণ মানুষ পড়েছে শাঁখের করাতের মধ্যে। ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনী তপশিল ঘোষণা করতে পেরে নিজের শক্তির পরিচয় পেয়ে নির্বাচনে জেতার আগেই বিজয়ীর মতো আচরণে ব্যস্ত। কী এক অস্থিরতায় রাষ্ট্রীয় এবং দলীয় শক্তি ব্যবহার করে হাজার হাজার নির্বিচার গ্রেপ্তার আর বিচারহীন আটকের মতো মরিয়া আচরণ করে সমাজে আতঙ্কের সৃষ্টি করে চলেছে। অন্যদিকে অন্যতম, হিসাবমতে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল বিএনপি ২৮ অক্টোবরের আগে যতটুকু জনসমর্থন আদায় করতে পেরেছিল, নিজেদের জন্য সেদিনের ন্যক্কারজনক ঘটনায় তা খুইয়ে দিনের পর দিন অবরোধ আর হরতালের কর্মসূচি দিয়ে পথে-ঘাটে অনিরাপত্তা সৃষ্টি করে, জনজীবন বাধাগ্রস্ত করে মানুষের বিপন্নতা তীব্রতর করে তুলেছে। তবে সেখানে জনগণের কথা আসতে হবে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষ এবং দিন আনা দিন খাওয়া জনগোষ্ঠী।
অস্বাভাবিক সংখ্যায় মামলা এবং দ্রুত রায় ঘোষণা করে বিএনপির বেশকিছু শীর্ষ নেতার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বস্তুত সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দিশাহীন আন্দোলনের নামে বিএনপি নিজেই নির্বাচনের পথ থেকে অনবরত দূরে সরে যাচ্ছে। সেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন।
কোনো পক্ষই জনগণকে এ অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আনছে বলে প্রতীয়মান নয়। এ থেকে নৈতিকভাবে রাজনীতিকরাও যে লাভবান হচ্ছেন, সেটিও বলা চলে না; বরং তারাও ক্রমে জনগণের আস্থা, বিশ্বাস ও ভরসা হারাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের একটাই চাওয়া– এই সীমাহীন অনিশ্চিত অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মানুষের কল্যাণকামী রাজনৈতিক হিসেবে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। বক্তৃতা-বক্তব্যে মানুষের জন্য রাজনীতি করার যে কথা উচ্চারণ করেন, উচ্চতম সততায় সেটা ধারণ করুন, বাস্তবায়ন করুন।