ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

নকশা এবং দুর্বৃত্তায়নের অংশ

নকশা এবং দুর্বৃত্তায়নের অংশ
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২৩:১০

এবার শীত খানিক আগেই নেমেছে। গত শুক্রবার ভোর ভোর মনে হলো, হাতের কাছেই ময়মনসিংহ। এক দৌড়ে গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। তিন ঘণ্টার নিঃশ্বাস দূরত্বে উত্তরা থেকে ময়মনসিংহ, দিনে গিয়ে দিনে ঘুরে আসব ভেবে খুশি মনে রওনা দিয়ে কিছুদূর এগিয়েই থমকে যেতে হলো। টঙ্গী পেরিয়েই বাস, ট্রাক, গাড়ির সারি; গিজগিজে ভিড় ঠেলে গাড়ি এগোতে থাকে অতি ধীরে, গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে দুই কিলোমিটার আগে ভোগড়া নামক স্থানে পৌঁছে দেখি আশৈশব পরিচিত ময়মনসিংহ যাওয়ার সোজা রাস্তায় আর যাওয়া যায় না। পশ্চিম দিকে দুই কিলোমিটার ঘুরে নাওজোড় মোড় হয়ে পূর্বদিকে ভাওয়াল কলেজের সামনে দিয়ে গাড়ি এসে আবার ময়মনসিংহ রোডে নেমে সোজা রাস্তায় দাখিল হয়। এক বাক্যে যত সহজে বলা গেল, এই রাস্তায় যান চলাচল এখন ততটাই দুরূহ ও অবিশ্বাস্য শ্লথগতির। কয়েক হাতের বাইপাস রোডে হাজার হাজার বাস-ট্রাক-মোটরগাড়ি– সে এক ধুন্ধুমার পরিস্থিতি! ১০ মিনিটের রাস্তা সাড়ে তিন ঘণ্টায় পেরোতে পেরোতে নানা খবর নেওয়া গেল। জানা গেল, এয়ারপোর্ট থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পের এই রাস্তা ২০১৮ সালের এপ্রিলে শুরু হয়। প্রকল্প শুরুর সাত বছর পর সরকারি কর্তৃপক্ষের মনে হয়েছে, গাজীপুর ফ্লাইওভারের ইন্টারচেঞ্জ নকশায় ভুল আছে। ভাসমান রাস্তার পরিবর্তে কর্তৃপক্ষ এখন পিলারে মনোযোগী হয়েছে এবং এই কাজে তারা বরাদ্দপ্রাপ্ত চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা রাখতে না পেরে বিকল্প কোম্পানির দ্বারস্থ হয়েছে। এখন পিলার বসানোর কাজ চলছে, বলা হয়েছিল– এক মাসের মধ্যেই ভোগড়া বাইপাসের দুর্গতি থেকে রক্ষা পাবেন এই রাস্তায় যাতায়াতকারী লাখ লাখ মানুষ; কিন্তু গত পাঁচ মাসেও যাত্রীদের অবর্ণনীয় নরকবাসের যন্ত্রণা লাঘব হয়নি। আরও জানা গেল, কার্যাদেশ পেতে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ২৮ শতাংশ কম হারে কাজ করতে রাজি হয়ে চীনা প্রতিষ্ঠান এক পর্যায়ে কাজ চালু রাখতেই হিমশিম খেতে শুরু করে। প্রকল্প চলাকালে নিরাপত্তাজনিত অবহেলায় মোট ৬ বাংলাদেশির মৃত্যু এর অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতাকেও স্পষ্ট করে তোলে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে যারা চলাচল করেন, বিগত দেড় দশক তারা রাস্তায় অন্তহীন খোঁড়াখুঁড়ির সঙ্গে পরিচিত। রাস্তায় উন্নয়ন করতে হলে খোঁড়াখুঁড়ির বিকল্প নেই– এটা ন্যূনতম বাস্তবতা, সন্দেহ নেই; তবে আমার কন্যার জন্মমুহূর্ত থেকে যে খোঁড়াখুঁড়ি আমি দেখি টঙ্গী-গাজীপুর পাড়ি দিতে, আঠারো বছরে কন্যা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রার্থী পূর্ণবয়স্ক মানুষ; আর কত পরে আমি নিশ্চিন্তে এই রাস্তা পাড়ি দেব, জানি না। 

২.
প্রকল্প শুরুর সাত বছর পর বিআরটি (বাস র‍্যাপিড ট্রান্সপোর্ট) কর্তৃপক্ষের মনে হয়, রাস্তার নকশায় ভুল আছে। আমাদের আশপাশের সকল কাজে নকশায় ভুলের কথা মনে পড়ে কাজ শুরুর অনেক পরে। এতে ভোগান্তিই শুধু বাড়ে না, নানা ধরনের শক্তির বিপুল অপচয় হয়। কয়েকটি প্রজন্ম অনন্ত হতাশায় নিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত দুই জাতীয় নির্বাচনের পর এবারের নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের নকশার কথা জানতে পারি আমরা। এসব নকশা জাতীয় জীবনে ঘোরতর দুর্বিপাক যে নিয়ে আসবে না, তা জোর দিয়ে বলা যাবে না।

গতকাল (সোমবার) সমকালের প্রধান সংবাদ বলছে, ‘নানা কৌশলের পরও জাতীয় নির্বাচনের অর্ধেকসংখ্যক আসনও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করা যাচ্ছে না। প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর সারাদেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ১০১টিতে লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। বাকি আসনের ভোট হতে যাচ্ছে অনেকটাই একতরফা।’ গেল ক’দিনই গণমাধ্যমে প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল আসন ভাগাভাগি প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও শরিক ১৪ দলের আলাপ-আলোচনা। এ কোন নির্বাচনী নকশা হচ্ছে দেশে? নির্বাচনের আগে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রধান দল পরস্পর আসন ভাগাভাগি নিয়ে নিজেরাই আলোচনা করে? এমনই এক বিরোধী দল যে নিজে আমড়াগাছি করে সরকারি দলের কাছ থেকে ২৬ খানা আসন বুঝে নিয়ে নির্বাচনে যাওয়ার মুচলেকা দেয়। এবং সবই প্রকাশ্যে। গণমাধ্যমে। কোথায় সেই বিরোধী দলের ম্যানিফেস্টো– কী করবে তারা সংসদে যেতে পারলে, কিছুই জাতি জানতে পারে না। শুধু জানে, ২৬টি আসনে আওয়ামী লীগ ছাড় দিয়ে দিয়েছে তাদের। সেখানে নৌকা প্রতীক থাকবে না। সরকারি ও বিরোধী দলের এই অবিশ্বাস্য মেলবন্ধন অবশ্য এ দেশে নতুন নয়, পরপর তৃতীয়বারের মতো জাতীয় পার্টি এই অতুলনীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ। এই ভূমিকায় জাতীয় পার্টির নেতারা আখেরে লাভালাভের মুখ দেখলেও দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও কাঠামোর যে করুণ দশা হচ্ছে, তার দায় থেকে সংশ্লিষ্ট কেউই নিজেদের মুক্ত দাবি করতে পারবেন না। 

৩.
নিবন্ধের শুরু যে গ্রামযাত্রার বর্ণনায়, আট ঘণ্টার ভ্রমণ শেষে শেষ পর্যন্ত গ্রামে পৌঁছি বটে। সেদিনই আবারও আট ঘণ্টায় ঢাকা ফেরার চেষ্টা না করে ফুলবাড়িয়া উপজেলার ঘনগ্রাম বাদিহাটির তালতলা বাজারে সরল নিরক্ষর মানুষদের পাশে বসি। কেমন হচ্ছে নির্বাচন? কে কে দাঁড়ালেন? আপনারা ভোট দেবেন না? জিজ্ঞেস করি।

‘নির্বাচন তো একলার এইবার। বিএনপি তো নাইগগা। ভোট আর লাগবনি!’ (নির্বাচন তো একার এইবার। বিএনপি তো নাই!)– প্রান্তিক কৃষকের এই শঙ্কা দেশের অনেক মানুষের। অবশ্য আরেক বাক্‌পটু তরুণ বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিবাদ করলেন, ‘ক্যান! তুমরার বিএনপি ইলেকশনে না আইলে আমরা কী করাম! হেরা আইলোনা কেরে?’ (কেন! তোমাদের বিএনপি ইলেকশনে না এলে আমরা কী করব! তারা এলো না কেন?) 

নির্বাচনে বিএনপির অনুপস্থিতি নির্বাচনকে একপক্ষীয় করে তুলেছে, সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতা ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক অবশ্য চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এক রাতে সব নেতার মুক্তির প্রস্তাবেও নির্বাচনে আসতে রাজি হয়নি বিএনপি।’ সজ্জন ব্যক্তিত্ব আব্দুর রাজ্জাক, কিন্তু তাঁর এই উচ্চারণ ঘোরতর প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে। তার মানে কী? যে সংশয় ও আশঙ্কা কাজ করেছে, সেটাই প্রকাশ্য হলো– নাশকতার অভিযোগে বিএনপি নেতাদের জেলে পুরলেও তাদেরকে গ্রেপ্তারের প্রকৃত কারণ নির্বাচনকেন্দ্রিক! 

৪.
গতকাল সোমবারের আরও একটি সংবাদ, সমকালের প্রথম পৃষ্ঠায়– ‘আজ নয়, বিএনপির হরতাল কাল।’ সদ্য প্রয়াত কুয়েতের আমিরের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে আন্দোলন কর্মসূচি পরিবর্তন করেছে বিএনপি। এর মানে কী? কুয়েতের আমিরের স্মৃতির সঙ্গে বিএনপির দাবি করা ‘একতরফা’ নির্বাচন বাতিল আন্দোলনের কী সম্পর্ক? এতে কী বোঝা যাচ্ছে? বিএনপির কাছে হরতাল আর অবরোধের ডাক দেওয়া মানে শীতের পিঠা খাওয়ার নেমন্তন্নের মতো সুমিষ্ট? এর আগে আট দফায় সপ্তাহের মাঝে এক দিন মঙ্গলবার বাদ রেখে চার দিন অবরোধ, মাঝেমধ্যে হরতাল দিয়ে বিএনপি নিজেদের শূন্যগর্ভ ভাবনা বা নকশার প্রমাণ রেখেছে। এ দেশে হরতাল বা অবরোধ নতুন কিছু নয়, রাজনৈতিক আন্দোলনও আমাদের সকলের অভিজ্ঞতার মধ্যে আছে, তবে কখনও এরকম নিশ্চিন্ত মনে সপ্তাহের মাঝখানে এক দিনের বিরতিতে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আন্দোলনের ডাক দিয়ে অন্তরালে চলে যাওয়ার ঘটনা দ্বিতীয়টি আর নেই। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অবশ্যই দায়িত্ব নিয়ে সামনে থাকা উচিত। এভাবে আড়ালে আবডালে, আজ নয় কাল হরতাল দিয়ে তারা তাদের কৌশলের শূন্যতাই আরও স্পষ্ট করছেন। এর মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় অনেকে আশাবাদী হচ্ছেন, রাশিয়া এ দেশে আরব বসন্তের সূচনার আশঙ্কা করছে বলে সংবাদও বেরিয়েছে। তবে বাংলাদেশের সমস্যায় অন্যদের নাক দূরে রাখাই সবচেয়ে মঙ্গলজনক। নাক, কান, চোখ ও মাথা আমাদেরই আছে। এসবের নৈতিক ও সংগত ব্যবহার ন্যায়ভিত্তিক সমাজ তৈরি করবে। অন্তরাল, কর্তৃত্বপরায়ণতা বা পলায়নপরতা সবই এক পাল্লায় দুর্বৃত্তায়নের অংশ। 

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল ও সাহিত্যিক
mahbubaziz01@gmail.com

আরও পড়ুন

×