গোলায় ঘুমধুমে দুই প্রাণহানি
নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে সোমবার নিহত হোসনে আরার ভাই শাহ আলমের হাতে বিস্ফোরিত মর্টার শেলের অংশ (বাঁয়ে) ও স্বজনের কান্না সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক, ঢাকা; কক্সবাজার ও টেকনাফ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০১:২৪ | আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০৬:৫২
আতঙ্ক, ভয়ভীতির মধ্যেই মিয়ানমার সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া মর্টার শেলের গোলায় এবার প্রাণহানিও দেখল বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের মানুষ। গতকাল সোমবার দুপুরের দিকে ঘুমধুমের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের জলপাইতলী গ্রামে ওপার থেকে আসা গোলার আঘাতে নিহত হয়েছেন বাংলাদেশি নারীসহ দু’জন। এতে আহত হয়েছে এক শিশু।
এ পটভূমিতে সীমান্তজুড়ে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। সোমবার দুপুরে থেমে থেমে মর্টার শেল ও বিরামহীন গোলাগুলির শব্দে ঘুম নেই সীমান্তের কয়েক হাজার বাসিন্দার। বন্ধ রাখা হয়েছে পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসা। পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনের কাজকর্ম প্রায় বন্ধ। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে জান্তা সরকার ও সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন আরাকার আর্মির মধ্যে চলছে তুমুল সংঘর্ষ। এর জের ধরে গতকাল পর্যন্ত দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) ১০৬ সদস্য অস্ত্রসহ বাংলাদেশে ঢুকেছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের নিরস্ত্রীকরণ করে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেছে। এ ছাড়া ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আছে মিয়ানমারের চাকমা সম্প্রদায়ের অন্তত ৪০০ জন। পাশাপাশি কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গাও সীমান্তে জড়ো হচ্ছে। রোহিঙ্গা ঠেকাতে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বিজিবি।
এদিকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলবের বিষয়ে সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। সরকারের সবুজ সংকেত পেলে মঙ্গলবার তাঁকে তলব করে কড়া বার্তা দেওয়া হতে পারে। গেল বছরের মাঝামাঝি থেকে মিয়ানমারের পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে থাকে। আর জানুয়ারি থেকে দেশটির অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত চলে আসে। এর প্রভাবে বাংলাদেশিরাও আক্রান্ত হচ্ছে।
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, নিহতের একজন জলপাইতলী গ্রামের বাদশা মিয়ার স্ত্রী হোসনে আরা বেগম (৪৫); অন্যজন রোহিঙ্গা নাগরিক নবী হোসেন (৭০)। তিন উখিয়া কুতুপালং ৮ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা। হোসনে আরার ধানক্ষেতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে এসেছিলেন নবী। তিনি বলেন, সোমবার বেলা পৌনে ৩টার দিকে নবী হোসেনের দুপুরের খাবার দিতে রান্নাঘরে যান হোসনে আরা। তখন মর্টার শেলটি এসে রান্নাঘরে পড়ে।
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ওসি আবদুল মান্নান বলেন, দু’পক্ষের গোলাগুলির সময় মর্টার শেল এসে বিস্ফোরিত হয়েছে। তখন ঘটনাস্থলে দু’জন নিহত হন। তবে হেলিকপ্টার থেকে বোমা মারার সময় গোলাটি এসে পড়েনি।
নবী হোসেনের লাশ নিতে ঘটনাস্থলে আসেন ছেলে ইমাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা দিনমজুর। প্রতিদিনের মতো সোমবার কাজের খোঁজে বের হন। এরই মাঝে হঠাৎ খবর আসে– মিয়ানমারের মর্টার শেলে বাবা মারা গেছেন। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট প্রাণে বাঁচতে আমরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছি। এর পরও বাবার প্রাণ রক্ষা হলো না! শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের মর্টার শেলে মারা গেলেন। এর চেয়ে বেদনার আর কী হতে পারে!’
ঘুমধুমের জলপাইতলী সীমান্তের বাসিন্দা নুর নাহার বলেন, ‘মিয়ানমারের ওপারে যুদ্ধবিমান দেখা যাচ্ছে। মর্টার শেলে প্রতিবেশী এক নারীসহ দু’জন মারা গেল। ভয়ে আমরা পরিবারের লোকজন নিয়ে জীবন বাঁচাতে অন্যত্র চলে যাচ্ছি।’
টমটমচালক আবদুর গফুর বলেন, ‘বহু ঘটনা দেখেছি। আমার ৫১ বছর বয়সে আজকের মতো সীমান্তে এ ধরনের হামলা দেখেনি। এখন গাড়ি চলা বন্ধ রেখেছি। কী পরিস্থিতি, মানুষের বুকে এসে গুলি পড়ছে। সীমান্ত এলাকায় মর্টার শেল পড়ছে। চার দিন ধরে গাড়ি চালাতে পারছি না। খাওয়া-দাওয়া নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ মুজাহিদ উদ্দিন বলেন, ‘এ পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তা বিবেচনায় ঘুমধুম সীমান্তের পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। আজও বিজিপির সদস্যরা এপারে বিজিবির কাছে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্য যারা আহত তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সীমান্তে ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বলেছি।’
কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান সংঘর্ষের মধ্যে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আছেন দেশটির চাকমা সম্প্রদায়ের অন্তত ৪০০ জন। পাশাপাশি কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গাও সীমান্তে জড়ো হচ্ছেন।’ তিনি বলেন, মিয়ানমার সীমান্তে বসবাসকারীদের মধ্যে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় তারা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছেন।
এদিকে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী গত তিন দিনে পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ) ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর (এফএও) বিদ্রোহীদের কাছে আরও বেশ কয়েকটি ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের ৬২ সেনা নিহত হয়েছেন। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় জান্তাদের লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে বিদ্রোহীরা। ইরাবতীর খবরে বলা হয়, সাগাইং, মাগউই ও মান্দালে অঞ্চল এবং কাচিন ও কারেন প্রদেশে হতাহত ও ঘাঁটি দখলের ঘটনা ঘটেছে। জান্তার লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন-২৫৮ বাহিনীর অন্তত ১০০ সদস্যের ইউনিটের ওপর পিডিএফ ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
নড়েচড়ে বসেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
দেরিতে হলেও নড়েচড়ে বসেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত রোববার বিদ্রোহী সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির প্রতিরোধের মুখে পালিয়ে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের প্রবেশ ও বাংলাদেশ অংশে রাখাইনের সংঘাতের কারণে বাংলাদেশি হতাহত হওয়ায় নেপিদোকে প্রতিবাদপত্র দিয়েছে ঢাকা। প্রতিবাদপত্রে কী কারণে মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশে ঢুকেছেন, তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের সদস্যদের ফেরত নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। চিঠিতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এ ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে মর্টার শেলের আঘাতে দু’জন নিহত হওয়ায় ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলবের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা।
প্রতিবাদপত্র ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলবের বিষয়ে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সরকারের সবুজ সংকেত পেলে মঙ্গলবার (আজ) তাঁকে তলব করা হবে।

গতকাল সোমবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে মিয়ানমার পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রয়েছে। সোমবার সকালে মিয়ানমারের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেশটিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূতের কথা হয়েছে। মিয়ানমার তাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের ফেরত নিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে। এখন কোন প্রক্রিয়ায় ফেরত নেবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, এর আগে ভারতেও মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অনেকে ঢুকে পড়েছিল। সেখান থেকে সেই সদস্যদের আকাশপথে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
এসব সদস্য যদি না যেতে চায়, সে ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে– জানতে চাইলে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, তারা তো অবশ্যই যেতে চাচ্ছে। না হলে মিয়ানমারের সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে কেন। মিয়ানমার সরকার তাদের নিয়ে যেতে চায়। তিনি বলেন, দুই পাশ থেকেই যোগাযোগ হয়েছে।
মোট কতজন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে– উত্তরে তিনি বলেন, সোমবার সকাল পর্যন্ত ৯৫ জন। হয়তো এর মধ্যে আরও এসেছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন আহত অবস্থায় এসেছেন, তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সীমান্ত অরক্ষিত কিনা– এ নিয়ে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আমাদের সীমান্ত সুরক্ষিত। তারা যেহেতু পালিয়ে এসেছেন, তাদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি।
প্রতিবেশীদের কাছে বাংলাদেশ সহায়তা চাইবে কিনা– উত্তরে তিনি বলেন, যেহেতু দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে, ফলে এখনই তৃতীয় পক্ষকে সম্পৃক্ত করার সময় আসেনি।
কয়েক সপ্তাহ ধরেই বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় জোরালো যুদ্ধ করছে আরাকান আর্মিসহ কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তারা একত্রিত হয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে সীমান্তের কাছে বেশ কয়েকটি শহরসহ রাখাইনের বড় এলাকা দখল করে নিয়েছে বিদ্রোহীরা।