আদালতের বারান্দায় আর কত ঘুরবেন তিনি
অশীতিপর রাবেয়া
ওয়াকিল আহমেদ হিরন
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০১৯ | ১৯:১৬
'১৮ বছর ধরে আদালতে হাজিরা দেই। মামলা শেষ হয় না। কবে শেষ হবে, তাও জানি
না। পুলিশরে শরবত, মোরাব্বা বানাই খাওয়াছি। তারপরেও মামলায় আমারে আসামি
বানাইছে। আমি আর বাঁচতে চাই না। মরতে চাই। অনেকদিন ধরে এই মামলায় হাজিরা
দেই। আদালত আমাকে মামলা থেকে খালাসও দেয় না, শাস্তিও দেয় না।'
অবৈধ অস্ত্র ও গুলি নিজ হেফাজতে রাখার অপরাধে তেজগাঁও থানার এসআই আবদুর
রাজ্জাক বাদী হয়ে অশীতিপর রাবেয়া খাতুনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের
করেছিলেন ২০০২ সালের ২ জুন। মামলা নম্বর ১৯৩৮/০২। এরপর তিনি গ্রেফতার হন,
ছয় মাস কারাগারে থেকে জামিনও পান। পরে তাকেসহ দুই আসামি জুলহাস ও মাসুদের
বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ২০০৩ সালের ২৪ মার্চ শুরু হয় মামলার বিচার।
তেজগাঁও থানা এলাকার ৩/ক গার্ডেন রোড, কাজী আবদুল জাহিদের ঘরের দক্ষিণ পাশ
থেকে গ্রেফতার করা হয় রাবেয়া খাতুনকে। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে একটি
বিদেশি পিস্তল ও ছয় রাউন্ড গুলি উদ্ধারের দাবি করে পুলিশ। সেই মামলা থেকে
মুক্তি পেতে ঢাকার আদালতের বারান্দায় ১৮ বছর ধরে ঘুরছেন এই অশীতিপর
মানুষটি।
রাবেয়ার আদালতে হাজিরার দিন ছিল গতকাল বুধবার। যথাসময়ে সকাল সাড়ে ৯টায় তিনি
ঢাকা মহানগর ১ নম্বর অতিরিক্ত জজ আদালতের দোতলায় লাঠিতে ভর দিয়ে হাজির হন।
পরনে ম্যাক্সি ও চোখে চশমা। এক হাতে পানের পলিথিন ব্যাগ, সঙ্গে মোবাইল।
হাজির হন এজলাস কক্ষের পেছনের বেঞ্চে। ন্যুব্জ হয়ে গেছেন বয়সের ভারে। পরিচয়
দিয়ে মামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি, 'কেউ যদি
আমাকে গলা কেটে মেরে ফেলত তাও শান্তি পেতাম। এই যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না।'
মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুরের সমীরপুর গ্রামে জন্ম রাবেয়ার। বিয়ের পর বাবা আদর
করে শ্বশুরবাড়ি যেতে দেননি। টাঙ্গাইল জেলার বাসিন্দা স্বামী শাহজাহান
সিরাজ কৃষিকাজ করতেন সে সময়। স্বাধীনতার পর দেশে কলেরা মহামারির রূপ নিলে এ
রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। রেখে যান দুটি মেয়ে। বর্তমানে রাবেয়া
মিরপুর কাজীপাড়ায় তার ছোট মেয়ের বাসায় থাকছেন। সেখান থেকে প্রতি তারিখে এসে
আদালতে হাজিরা দেন।
ছোট মেয়ে লাইলী ও তার জামাই ২০০২ সালে থাকতেন কারওয়ান বাজার কাজীপাড়ার
আন্দার ব্রিজের পাশে। ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তেজগাঁও থানার এক
দারোগা ও তার ফোর্সসহ ওই এলাকায় ফেনসিডিল আসক্তদের ধরতে অভিযান চালান। সে
সময় ছাপড়ার পাশে রাবেয়ার পান-সিগারেটের টং দোকান ছিল। রাবেয়া বলেন,
'দারোগাকে (এসআই) ঘরে নিয়ে বসতে দেই। মোরাব্বা ও শরবত বানিয়ে খাওয়াই। এই
সময় বাচ্চু নামে একজন ফরমার (পুলিশের সোর্স) ঘরে ঢুকে বলেন, নানি একটা লাঠি
দেন। এই বলে ঘরের ভেতর থেকে একটা লাঠি বের করার সময় সে চিৎকার করে বলে,
পাইছি, পাইছি। অস্ত্রসহ ব্যাগ দারোগার হাতে দেয় সে। এরপর দারোগা আমাকে বলে,
খালা তোমাকে তেজগাঁও থানায় সাক্ষী দিতে যেতে হবে। পরে থানায় আসার পর একটা
টিপসই দেই। রাতে থানায় থাকি। পরদিন কোর্টে চালান করে দেয় আমাকে। কোর্টে
আনার পর বিচারক ওই দারোগাকে বলেন, এই বৃদ্ধ মহিলাকে নিয়ে আসছ কেন? একজনকে
দেখলেই তাকে ধরে আনতে হবে? এরপর ছয় মাস কারাগারে থেকে জামিনে বেরিয়ে আসি।
তারপর থেকে প্রতি মাসেই একবার করে হাজিরা দেই আদালতে।' আলাপচারিতায় রাবেয়া
দাবি করেন তার বয়স ১০৪ বছর। কিন্তু পুলিশের করা ২০০২ সালের মামলায় রাবেয়ার
বয়স ৬০ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসাবে তার বয়স ৭৭ বছর। রাবেয়ার আইনজীবী
মেহেদী হাসান পলাশ জানান, আসামির বয়স ৮০ বছরের বেশি। পুলিশ সাধারণত মামলার
সময় আসামির বয়স অনেক ক্ষেত্রে কম লিখে থাকে।
রাবেয়ার মতো বৃদ্ধ শুধু নয়, ঢাকার আদালতগুলোতে এমন মামলার সংখ্যা অগণিত।
বিচার শেষ না হতেই মারা গেছেন অনেকে। দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষী না আসায় মামলার
বিচার কার্যক্রম শেষ হয় না কারও কারও। বিলম্বিত বিচারের সংখ্যা বৃদ্ধি
পাচ্ছে দিন দিন।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ঢাকাসহ নিম্ন আদালতগুলোতে নারী-শিশু নির্যাতন, হত্যা,
মাদক, দেওয়ানিসহ নানা ধরনের মামলা দীর্ঘদিন বিচারাধীন থাকে। এসব মামলাতেও
আসামিদের অব্যাহতি এবং খালাসের হার বেশি। তারা বলেন, মামলার দ্রুত
নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু তদন্ত, উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ সময়মতো
উপস্থাপন, পুলিশ ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের কাজের সমন্বয় আর আদালতের
সক্ষমতা বাড়িয়ে দ্রুত ও কার্যকর বিচার।
নানা কারণে দেশের ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। আইনজ্ঞরা
বলছেন, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, বিচারক
সংকটসহ নানা কারণে বিচার কার্যক্রম নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে। বিচারাধীন
ফৌজদারি মামলার সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া এবং যথাসময়ে মামলা নিষ্পত্তি
না হওয়ায় বিচারপ্রার্থীর মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে হতাশা। ফলে বিচারপ্রার্থীরা
যথাসময়ে বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্নিষ্ট সূত্র মতে, দেশের নিম্ন আদালতগুলোতে বিচারাধীন
ফৌজদারি মামলার সংখ্যা সাড়ে ১৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময়
ধরে বিচারাধীন রয়েছে আড়াই লাখের বেশি মামলা।
রাবেয়ার মামলার নিষ্পত্তি প্রসঙ্গে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি)
আব্দুল্লাহ আবু সমকালকে বলেন, 'কী কারণে এ মামলাটির বিচার নিষ্পত্তিতে দেরি
হচ্ছে, সেটা আমার জানা নেই। দীর্ঘদিন সাক্ষী আদালতে না আসার কারণে বিচার
শেষ হচ্ছে না, সেটা ওই আদালতের সংশ্নিষ্ট পিপি সাহেবের জানানো উচিত ছিল।'
খোঁজ নিয়ে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান তিনি।
ফৌজদারি বিশেষজ্ঞ মোশাররফ হোসেন কাজল সমকালকে বলেন, 'আদালত তার আইন দ্বারা
পরিচালিত। যিনি বিচারক আছেন তিনি যদি বিচারকসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব নিয়ে
এগিয়ে আসেন, তাহলে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। এখানে রাষ্ট্রপক্ষকেও এগিয়ে
আসতে হবে। একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে আদালতে আসছেন। কিন্তু তার মামলা
নিষ্পত্তি হচ্ছে না। বিচারককে এ বিষয়টা বুঝতে হবে।'
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান
সমকালকে বলেন, 'এ ধরনের মামলায় অনেক মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে।
আমরা অনেকটা বিচারহীনতার সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে গেছি। কী কারণে কীভাবে একজন
বয়স্ক মহিলা অস্ত্র মামলায় আসামি হলেন সেটা আগে জানতে হবে। তারপর দীর্ঘদিন
ধরে তিনি ভোগান্তির শিকার। আদালতে এসে হাজিরা দিচ্ছেন, কিন্তু মামলা
নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আমাদের সিআরপিসিতে বলা আছে, ৩৬০ দিনের মধ্যে মামলা
নিষ্পত্তি করতে হবে। এখন প্রত্যেকে যদি যার যার অবস্থান থেকে তার দায়িত্ব
সমন্বয় করে পালন করেন, তাহলে কোনো সমস্যাই থাকে না। এ ব্যাপারে বিচারক,
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ও আসামিপক্ষের আইনজীবীর দায়িত্ব রয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষকেও বিষয়টি আদালতে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। কেন এই বৃদ্ধ
মহিলাকে প্রতি মাসে আদালতে হাজির হতে হবে, তারপক্ষে কেন তার আইনজীবী হাজিরা
দিচ্ছেন না, সেটাও জানা দরকার।'
রাবেয়া খাতুনের আইনজীবী মেহেদী হাসান পলাশ বলেন, 'একজন বয়স্ক মহিলা আইনের
প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে মামলা মোকাবেলা করছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ন্যায়বিচার
পাচ্ছেন না। তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য প্রতিটি তারিখে আদালতে
হাজিরা দেন। তবু মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এটি অনেকটা সাজানো ঘটনা। ২০০২
সালের মামলা। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে। ৫ বছর
ধরে সাক্ষী আসছে না। গতকাল এ আদালতের পিপি এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তার
মৃত্যুর বিষয়ে বিচারককে অবহিত করেন। এ সময় বিচারক মো. আল মামুন মামলার
তদন্ত কর্মকর্তার মৃত্যু-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ডিএমপি
কমিশনারকে নির্দেশ দেন।'
তিনি আরও বলেন, 'আগের বিচারক মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে আসামির আত্মপক্ষ
সমর্থনের জন্য ধার্য করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আরেক বিচারক আসার পর
আত্মপক্ষ সমর্থন থেকে ফের আবারও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করা হয়। গত
পাঁচ বছর ধরে এ মামলার কোনো সাক্ষী সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালতে আসছে না।
তবুও মামলা চলছে। এ মামলা অনন্তকাল ধরে চলবে। হয়তো একদিন এই আসামি মারা
যাবেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) অনেক আগে মারা গেছেন। তার
সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়নি। এমন কী রাবেয়ার কাছ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্রও জব্দ
করা হয়নি। ফলে মামলাটি নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। রাবেয়া খাতুন খুবই অসুস্থ
এবং গরিব। প্রতি ৩ মাস পরপর তার শরীরে এক ব্যাগ রক্ত দিতে হয়। তিনি মামলার
ফিস দিতে পারেন না। কখনও ২শ' টাকা দেন। মানবিক কারণে এই মামলাটি পরিচালনা
করা হচ্ছে।'
এদিকে সংশ্নিষ্ট আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আবদুস সাত্তার দুলাল
সমকালকে জানান, মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার
সাক্ষ্যগ্রহণ এখনও হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষী হলো মামলা প্রমাণ করার
জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, কেউ আদালতকে জানায়নি যে, মামলার তদন্ত
কর্মকর্তা মারা গেছেন। তাছাড়া আমার কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই, যা আমি
আদালতকে দেখাব। পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হলে তিনি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ
করবেন বলে জানান।
মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামি রাবেয়া খাতুনকে তেজগাঁও থানা এলাকার ৩/ক
গার্ডেন রোড, কাজীপাড়া আবদুল জাহিদের ঘরের দক্ষিণ পাশ থেকে পালানোর সময়
একটি চটের ব্যাগসহ গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে একটি
বিদেশি পিস্তল ও ৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। রাবেয়ার সঙ্গে আরও দুইজন
আসামি জুলহাস ও মাসুদের সম্পৃক্ততা ছিল। আইনজীবী জানিয়েছেন, জুলহাস ছিল
রাবেয়ার মেয়ের জামাই। তাকে ধরার জন্য পুলিশ সেদিন বাসায় গিয়েছিল। পরে
জুলহাস মারা গেছে বলে জানা গেছে। মামলার অবস্থানগত কারণে রাবেয়াকে আসামি
করা হয়েছে।
২০০২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আবদুল আজিজ
তদন্ত শেষে ১২ জনকে সাক্ষী করে রাবেয়াসহ দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
দাখিল করেন। অপর এক আসামি মাসুদের বিরুদ্ধে সঠিক নাম-ঠিকানা খুঁজে না
পাওয়ায় অব্যাহতির সুপারিশ করেন। আদালতের নথিতে জুলহাস বর্তমানে পলাতক।
মামলাটিতে এ পর্যন্ত ১২ সাক্ষীর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ৬ জনকে আদালতে উপস্থাপন
করেছেন।
মামলায় ৬ সাক্ষীর মধ্যে ২০০৭ সালে তিনজনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন আদালত। এরপর
আবার ২০১৪ সালে আরও তিনজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১১ মের পর
থেকে আর কোনো সাক্ষী আদালতে আসেনি। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর আসামি রাবেয়া
খাতুনের আইনজীবী সাক্ষ্য সমাপ্ত করে আবেদন করেন পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য।
তৎকালীন বিচারক রুহুল আমীন আবেদন মঞ্জুর করে আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য
দিন ধার্য করেন। ২০১৭ সালের ২৮ অক্টোবর আরেক বিচারক এসে মামালটি আসামির
আত্মপক্ষ সমর্থনের পরিবর্তে ফের সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেন।
- বিষয় :
- অশীতিপর রাবেয়া