রাস্তার পাশে ডালায় সাজানো বর্ণিল ফুল। এসব ফুল নিয়ে বসেছেন নারীরা। ডালার ফুলগুলো যত রঙিন, ফুল নিয়ে বসা নারীদের জীবন ততই ধূসর। জীবনের ক্রান্তিলগ্নে সন্তানরা যখন খোঁজ নেয় না তখন ঝোপঝাড় থেকে কুড়ানো ফুল বিক্রি করে টিকে থাকার জন্য লড়ছেন। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছেন না তাঁরা। ময়মনসিংহ নগরীতে ফুলের হাটে নারীদের সঙ্গে আলাপে উঠে আসে এমন বেদনার চিত্র।

নগরীর কে বি ইসমাইল রোডের প্রাক্তন পৌরসভা ভবনের সামনে পৌর কাঁচাবাজার। এটি ঘেঁষে প্রতিদিন বর্ণিল ফুলের পসরা সাজিয়ে বসেন একদল নারী। ঠাকুরকে অঞ্জলি দিতে ভোরে ফুলের জন্য সেখানে ছুটে যান সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। সকাল ৯টা পর্যন্ত বেচাকেনা চলে। শুধু ফুল নয়, বেলপাতা, তুলসীপাতা, দূর্বাঘাস, আমপাতা সবই বিক্রি হয়। এক ভাগ পূজার ফুল বিক্রি হয় মাত্র ১০ টাকায়।

রাস্তার পাশে ফুল বিক্রেতা নারীদের বয়স ৫০ থেকে ৭০ বছরের অধিক। তাদেরই একজন ষাটোর্ধ্ব রাহিমা খাতুন। বাড়ি নগরীর চরগোবিন্দপুর গ্রামে। স্বামী মারা গেছেন ৪০ বছর আগে। বিধবা ভাতার আওতায় আছেন তিনি। নিজের ভিটে না থাকায় থাকেন ভাইদের বাড়ি। ৫ বছর ধরে ফুল বিক্রি করছেন। গত রোববারের আয়-ব্যয়ের ফিরিস্তি সমকালের কাছে তুলে ধরেন ফুল বিক্রেতা রাহিমা। তিনি বলেন, রোববার ৩০০ টাকার ফুল বিক্রি করেছেন। তা থেকে ৫ টাকা খাজনা দিতে হয় নয়নকে। নৌকা পারাপারে ৫ টাকা, সকালের নাশতা ৩০ টাকা, ১০ টাকার চা, ২০ টাকার অটোরিকশা ভাড়া, দুই কেজি চাল ১২০ টাকা, ২০ টাকার লবণ, ৫ টাকার রসুন, ৫ টাকার পেঁয়াজ, ৫ টাকার কয়েল, ৫ টাকার মোমবাতি, ২০ টাকার পুঁইশাক ও ২০ টাকার পাটশাক কিনে ঘরে ফিরে থাকে মাত্র ৩০ টাকা। এভাবেই চলছে তাঁর দুঃখের সংসার।

নগরীর বিনপাড়া এলাকার প্রয়াত কিশোরী ঘোষের স্ত্রী চম্পারানী ঘোষ (৬০)। সন্তানরা দেখাশোনা না করায় ভাগ্য তাঁকে রাস্তায় এনে দাঁড় করেছে। রাস্তার পাশে বসে ফুল বিক্রি করলেও তাদের ৫ টাকা করে খাজনা দিতে হয় নয়নকে। তিনি বয়স্কভাতা পান না। নয়ন নামের এক ব্যক্তি রাস্তায় বসে ফুল বিক্রি করা নারীদের কাছ থেকে ৫ টাকা করে খাজনা নেয়। অবশ্য গতকাল সোমবার তাঁর সন্ধান করে পাওয়া যায়নি।

কল্পনা রানী ঘোষ (৭০) নামের আরেক ফুল বিক্রেতা বলেন, 'বছর খানেক আগে যে চাল ৩০ টাকা কেজিতে কিনতে পারতাম, একই চাল এখন ৬০ টাকা কেজি দরে কিনতে হয়। এক কেজি তেল একসঙ্গে কিনতে পারি না। ২০ টাকার করে তেল কিনে সংসার চালাই।'

ময়মনসিংহ সিটি মেয়র ইকরামুল হক টিটু বলেন, সিটিতে বিধবাভাতা বন্ধ রয়েছে। যেসব নারী বয়স্কভাতা পাননি, তাঁদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।