'অহন যেহানে পদ্মা সেতুর গোড়া দেখতেছেন, ওইহানে (সেখানে) আমাগো বাড়ি আছিল, পাশেই জমি আছিল। আমাগো জমির উপরে পদ্মা সেতু অইছে, এর চেয়ে আর পাওনের কী আছে, এইডাই তো গর্বের।' শরীয়তপুরের জাজিরায় নাওডোবা পুনর্বাসন সাইটের বাসিন্দা সাইদুর রহমান নিজেদের জায়গায় গড়ে ওঠা পদ্মা সেতু নিয়ে এভাবেই নিজের গর্বের কথা বলছিলেন।

সাইদুর রহমান জানালেন, নাওডোবা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কালু বেপারীকান্দি এলাকায় তাঁদের বসতভিটা ছিল। পদ্মা সেতু প্রকল্পে বসতভিটাসহ তাঁদের পরিবারের এক বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। বিনিময়ে নগদ টাকা এবং পুনর্বাসন সাইটে ৭ শতাংশের প্লট পেয়েছেন। এখানে জীবনমান বেশ উন্নত। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের জায়গায়, নিজের বাড়ির পাশে এত বড় একটা প্রকল্প দেখছেন তাঁরা।

মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের বাসিন্দা তৌহিদুল ইসলামের পরিবারের বসতভিটাও অধিগ্রহণ করা হয়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্পে। তিনিসহ তাঁর পরিবার এখন পদ্মা সেতুর মাওয়া টোল প্লাজার অদূরে কুমারভোগ পুনর্বাসন সাইটে পাওয়া প্লটে থাকেন। শুরুর দিকে বাপ-দাদার বসতভিটা হারিয়ে আতঙ্কে ছিল তাঁর পরিবার। কিন্তু পদ্মা সেতু বাস্তবে রূপ নেওয়ায় এখন উচ্ছ্বাস তাঁদের ভেতর। চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক নিয়েই বিক্রমপুর আদর্শ কলেজের শিক্ষার্থী তৌহিদুল বলছিলেন, যেখানে এখন সেতুর টোল প্লাজা হয়েছে, সেখানেই তাঁদের বাড়ি ছিল। তাঁদের দেওয়া জায়গা দিয়েই ঢাকা থেকে এসে পদ্মা সেতুতে উঠতে হবে। দেশের হাজার হাজার লোক তাঁদের দেওয়া জায়গা দিয়ে গিয়ে সেতুতে চড়বেন। এটাই তো বড় পাওয়া।

পদ্মা সেতুর স্বপ্নকে আজকের বাস্তবে রূপ দিতে সাইদুর রহমান আর তৌহিদুল ইসলামের মতো ৩ হাজার ১১টি পরিবারের বসতভিটা ও জমিজমা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তাঁদের জন্য পদ্মার দুই পাড়ে লৌহজংয়ের কুমারভোগ ও যশলদিয়া এলাকা, জাজিরার নাওডোবা ও মাদারীপুরের শিবচরের বাকরেরকান্দিতে মোট সাতটি পুনর্বাসন সাইট তৈরি করে ছয়টিতে ক্ষতিগ্রস্তদের প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অন্য একটিতে সেতুর কাজে যুক্ত বিদেশি প্রকৌশলীরা থাকছেন। রাজধানীর উন্নত আবাসিক এলাকার মতো করে সাজানো হয়েছে এসব পুনর্বাসন কেন্দ্র। চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সুদৃশ্য মসজিদ, বাজার পর্যন্ত রয়েছে সেখানে। তবে কবরস্থান ও খেলার মাঠ না থাকার আক্ষেপ রয়েছে কুমারভোগ সাইটের বাসিন্দাদের মধ্যে।

নাওডোবা পুনর্বাসন সাইটের এক বাসিন্দা বলছিলেন, তাঁরা থাকার জায়গা পেয়েছেন। কিন্তু জাজিরার এলাকাটা কৃষিনির্ভর ছিল। এসব জমি থেকে তাঁদের বছরের খাবার আসত, তা বিক্রি করে সংসারের অন্য খরচ চালাতেন। এসব কৃষি জমিতে অনেক দিনমজুর শ্রম বিক্রি করে সংসার চালাতেন। তাঁরা থাকার জায়গা পেলেও কৃষি জমি না থাকায় অনেকটা বেকার হয়ে গেছেন।

এই সাইটের পরিচালনা কমিটির সভাপতি দাদন আলী বেপারী বলেন, বাড়ি-জমি হারিয়ে আক্ষেপ ছিল। কিন্তু সেতু হওয়ায় চরাঞ্চলের মধ্য দিয়ে বিশাল সড়ক তৈরির পর কোনো আক্ষেপ নেই। এখন মনে হচ্ছে, সরকার ভালো কাজেই তাঁদের বসতভিটা অধিগ্রহণ করেছে এবং তাঁরাও দেশের ভালোর জন্য তা দিয়েছেন।

৬৬ বছর বয়সী ওসমান গণি আর ৬৮ বছর বয়সী শাহে আলম কাওলার সঙ্গে কথা হচ্ছিল লৌহজংয়ের কুমারভোগ পুনর্বাসন সাইটের মসজিদের সামনে। দু'জনই পরিবার নিয়ে ওই সাইটে বসবাস করেন। তাঁরা বলছিলেন, বাপ-দাদার জমি, বাড়ি সরকার নেওয়ায় শুরুতে হতাশা, আতঙ্ক আর ক্ষোভ ছিল। পূর্বপুরুষদের বাড়িঘর ছাড়তে কষ্টও হচ্ছিল। বাড়ির কাছের ভয়াল সেই গাঙে (পদ্মা নদী) একেকটা পিলার দেখে হতাশাটা কমে যায়। পদ্মা সেতু পুরো হয়ে যাওয়ার পর এখন গর্ব হচ্ছে, আফসোস আর নেই।

শিবচরের বাখরেরকান্দি পুনর্বাসন এলাকার বাসিন্দা হোসেন বেপারীর স্ত্রী জবেদা বেগমের কাছে পুরো বিষয়টি এখনও ঘোরের মতোই। তিনি বলেন, মাদবরেরচর শুক্কুর হাওলাদার কান্দি এলাকায় তাঁদের বসতভিটায় কুঁড়েঘর ছিল। সরকার তা নিয়ে টাকাও দিল, আবার ঢাকার মতো থাকার ব্যবস্থাও করেছে।

নাওডোবা পদ্মা সেতু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম ঘুরে দেখালেন স্কুলের ক্যাম্পাস। সুদৃশ্য তিনতলা ভবনের সঙ্গে বিশাল খেলার মাঠ। ক্যাম্পাসটি দেখলে মনে হয়, যেন রাজধানীর কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস এটি। এই শিক্ষক জানালেন, প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ সালে চালু হওয়া এই স্কুলে এখন ২৪৮ জন শিক্ষার্থী। সুন্দর পরিবেশে তারা পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে। স্কুলের রেজাল্টও ভালো।