কখনও দিনমজুরি, কখনও বা ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন নকিম উদ্দিন জোয়াদ্দার। সেই টাকা থেকেই কেনেন গাছের চারা। এসব চারা রোপণ করেন সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফাঁকা জায়গা বা সড়কের পাশে। দুই যুগ ধরে খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় এভাবে বৃক্ষরোপণ করে যাচ্ছেন তিনি। এ সময়ে দুই হাজারের বেশি চারাগাছ রোপণ করেছেন। পাশাপাশি সময় পেলেই মেতে থাকেন গাছের পরিচর্যায়।

উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়নের বান্দিকাটি গ্রামের বাসিন্দা নকিম উদ্দিনের (৮০) বাবা কামাল উদ্দিন জোয়াদ্দারও ছিলেন বৃক্ষপ্রেমী। তাঁর সেই বৃক্ষপ্রেম উৎসাহিত করে ছেলেকে। ১৯৯৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর তাঁর দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন নকিম। বলেন, বাবা বলতেন- গাছ লাগালে পরিবেশ ভালো থাকে, মানুষের উপকার হয়, পাখিদের উপকার হয়। সেই প্রেরণায় আজও গাছের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসা।

দুই যুগে নকিম উদ্দিনের হাতে রোপণ করা ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ শোভা পাচ্ছে পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিষদ চত্বর, আদালত চত্বর, থানা চত্বর, ফসিয়ার রহমান মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন মাদ্রাসা, ইউনিয়ন পরিষদসংলগ্ন স্থানে। এ ছাড়া সড়কের পাশেও ছায়া দিচ্ছে তার রোপিত গাছ। বান্দিকাটি গ্রামের চেঁচুয়া মসজিদ থেকে জহর চৌকিদারের বাড়ি পর্যন্ত সড়কের দুই পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। বর্তমানে এসব গাছ সরকারি সম্পদে পরিণত হয়েছে।

বৃক্ষপ্রেমিক নকিম উদ্দিনের পাঁচ ছেলে। তাদের মধ্যে চারজন ভ্যানচালক ও একজন মাছের ডিপোর কর্মী। তিন মেয়েরই বিয়ে হয়েছে। দিনমজুরির টাকায় যেখানে সংসার চালানোই কঠিন, সেখানে সেই টাকা থেকেই গাছের চারা রোপণ করেন তিনি। এ বিষয়টি তাঁর মহত্ত্বের পরিচয় দেয় বলে মনে করেন ফসিয়ার রহমান মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক শেখ রুহুল কুদ্দুস। তিনি বলেন, 'যখন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলাম, তখন নকিম উদ্দিন কলেজে ফলদ, বনজ ও ঔষধিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়েছিলেন। গাছগুলো এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। অনেক গাছেই ফল হয়, যে ফল শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মিলে খাই। এ গাছগুলো যতদিন বেঁচে থাকবে, নকিম উদ্দিনও ততদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।'

একইরকম মন্তব্য করেন গদাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শেখ জিয়াদুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, নকিম উদ্দিন অনেক বড় মনের মানুষ। তিনি আর্থিকভাবে সচ্ছল না হলেও আয়ের টাকা থেকেই গাছের চারা কিনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চত্বরে রোপণ করেন। এই যুগে তাঁর মতো মানুষ পাওয়া কঠিন। শেখ জিয়াদুল ইসলাম আরও বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরেও গাছ লাগানোর সময় নকিম উদ্দিনকে টাকা সাধলেও তিনি ফিরিয়ে দেন।

ফসিয়ার রহমান মহিলা কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী নূপুর মণ্ডল বলেন, 'ক্যাম্পাসে থাকা গাছের ফল আমরা অনেক মজা করে খেয়েছি। কিন্তু এই গাছগুলো যিনি রোপণ করেছেন, তিনি পেশায় দিনমজুর- জানতে পেরে তাঁকে নিয়ে গর্ব হয়।'

নকিম উদ্দিন বলেন, 'গাছ আমাদের ছায়া দেয়, ফল দেয় এবং পরিবেশ ভালো রাখে। বাবার এসব কথা মনে করে নিজ উদ্যোগে জনস্বার্থে গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিই। যেসব গাছ লাগিয়েছি, সেগুলো প্রতি বছর কম-বেশি পরিচর্যাও করি। গাছগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানে গাছ লাগিয়েছি সেখানে গিয়ে গাছগুলোকে জড়িয়ে ধরে আদর করি। গাছগুলো সব আমার সন্তানের মতো।'

সন্তানতুল্য গাছগুলোকে বড় করতে পেরে অনেক ভালো লাগে বলেও জানান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এভাবেই বৃক্ষরোপণের ইচ্ছা নকিম উদ্দিনের। এ জন্য তাঁর বা পরিবারের কোনো দাবি-দাওয়া নেই।

এ ব্যাপারে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মমতাজ বেগম বলেন, 'সমাজে আমরা যে যেখানে অবস্থান করি না কেন, সমাজের প্রতি প্রত্যেকের দায়বদ্ধতা রয়েছে। ভালো কাজ করার জন্য খুব বেশি অর্থ-সম্পদের যে প্রয়োজন হয় না- তা দিনমজুর নকিম উদ্দিন দেখিয়ে দিয়েছেন।'
নকিম উদ্দিন গাছের প্রতি দাবি ছেড়ে দিয়েছেন উল্লেখ করে ইউএনও মমতাজ বেগম বলেন, 'জনস্বার্থে তিনি গাছ রোপণ করেছেন। ইচ্ছে করলেই আমরা এই মহৎ ব্যক্তির মতো প্রতিদিন কিছু না কিছু ভালো কাজ করতে পারি।'