নোয়াখালীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে (৪৮) দরপত্রের শিডিউল ফরম বিক্রিতে গড়িমসি করার অভিযোগ এনে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও হাসপাতালে ভাংচুর করা হয়েছে। 

এ ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল রোববার দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা কর্মবিরতি অব্যাহত রেখেছেন।

এ হামলার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহীন ও তার অনুসারীদের অভিযুক্ত করেছেন।

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ৯ কোটি টাকা মূল্যের এমএসআর সামগ্রী কিনতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গত ৫ সেপ্টেম্বর দরপত্র আহ্বান করে। দরপত্র বিক্রির স্থান ছিল জেলা প্রশাসক কার্যালয়, নোয়াখালী সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয়। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার সমকালকে জানান, তিন জায়গায় বিক্রির কারণে তখন দরপত্রের অনেক শিডিউল ফর্ম বিক্রি হয়। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রহস্যজনক কারণে তা বাতিল করে পুনরায় গত ১১ নভেম্বর দরপত্র আহ্বান করে। নতুন বিজ্ঞপ্তিতে শুধু জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয়ে দরপত্রের শিডিউল বিক্রির স্থান নির্ধারণ করা হয়।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. হেলাল উদ্দিন জানান, জেলা আওয়ামী লীগের প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহীন ১৫০-২০০ জন অনুসারী নিয়ে রোববার দুপুর ১২টার দিকে তার কার্যালয়ে দরপত্র শিডিউল কিনতে আসেন। এ সময় দাপ্তরিক রেজিস্ট্রার মেইন্টেইন করতে একটু দেরি হয়ে যায়। এতে উত্তেজিত হয়ে দুপুর সোয়া ১টার দিকে ২০-৩০ জন যুবক তার ওপর চড়াও হয় এবং মেরে আহত করে।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিম জানান, তিনি এ সময় বাধা দিতে গেলে হামলাকারীরা তাকেও লাঞ্ছিত করে। তারা হাসপাতালের সাইনবোর্ড ও প্রধান ফটক ভাঙচুর করে। ঘটনার প্রতিবাদে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা দুপুর ২টা থেকে কর্মবিরতি শুরু করেছেন। তবে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে। 

অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহীন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বলেন, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে দেড় কোটি টাকার কমিশন নিয়ে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন। তাই কৌশলে প্রথম দরপত্র বাতিল করে দ্বিতীয় দরপত্র আহ্বান করেছেন।

অ্যাডভোকেট শাহীন বলেন, ‘গতকাল দুপুর ১২টার দিকে দরপত্র শিডিউল কিনতে গেলে তত্ত্বাবধায়ক ও তার কর্মচারীরা আমাকে দুই ঘণ্টা বসিয়ে রাখে। তারপর শিডিউল দিলে সেটি নিয়ে চলে আসি। কিন্তু এরপর অন্য ঠিকাদাররা শিডিউল কিনতে হাসপাতালে গেলেও তাদের কাছে তা বিক্রি করা হয়নি। এতে তারা উত্তেজিত হয়েছে বলে শুনেছি।’

সুধারাম মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকির হোসেন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। জরুরি বিভাগ ছাড়া হাসপাতালের সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এই ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) নোয়াখালী জেলা শাখার সভাপতি ডা. ফজলে এলাহী খান এ হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান জানান, তিনি হাসপাতালের চিকিৎসক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধর্মঘট প্রত্যাহার করে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

রোগীদের দুর্ভোগ

রোববার বিকেল ৪টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, নোয়াখালী মৌজা এলাকার গুরুতর অসুস্থ সুমি আক্তারকে (২৯) জরুরি বিভাগে নিয়ে এসেছেন তার স্বামী রাজু হোসেন। 

কিন্তু দুপুর ২টায় অসুস্থ রোগীকে নিয়ে এলেও হাসপাতালের কর্মচারীরা তাকে সিএনজি থেকে নামাতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

একই রকম জানালেন কবিরহাট উপজেলার নলুয়া ভূঁইয়ারহাট গ্রামের সাইফুল ইসলাম। 

তিনি বলেন, তার বাবা সালাহ উদ্দিনের (৭০) পেট ফুলে তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। কিন্তু দুই ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষার পর এখন বাধ্য হয়ে তাকে প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যেতে হচ্ছে।