'এতোগুলা ক্ষতি হামরা কেনকা করি পোষামো! হামার সউগ শ্যাষ হইচে। এখন কী নিয়া বাঁচবো!' দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে সব হারানো রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় করিমপুর গ্রামের হিন্দুপল্লীর মাঝিপাড়ার বাসিন্দা জেলে ভবেশ চন্দ্র (৩০) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন কথাগুলো। 

তিনি আরও বলেন, 'মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া অনেক কষ্ট করি তিনটা পাকা ঘর দিছিনো। আশা করছিনু, বউ আর ছইলটাক নিয়ে সুখের সংসার গড়ি তুলিম। সেইটা আর হইলো না। খারাপ লোকের আগুনো সউগ একেবারে মিটি গেইল।'

ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ধরে পীরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে গিয়ে চতরাগামী পাকা রাস্তা। সেখান থেকে দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই আখিরা নদীর উপরে ব্রিজ। ব্রিজ পার হয়ে হাতের বামপাশে নদীর তীরে মাঝিপাড়া গ্রামের অবস্থান। এ গ্রামে যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পায় বসবাস করেন মৃত দিনোবন্ধু চন্দ্রের ছেলে ভবেশ চন্দ্র। 

ভবেশের সংসারে একমাত্র কন্যাসন্তান ও স্ত্রী রয়েছে। নদীতে মাছ ধরে স্থানীয় সোডাপীর বাজারে বিক্রি করেন। মাছ বিক্রির টাকায় সংসার চলে তার। তার মতো ৬৬টি জেলে পরিবারেরও জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম আখিরা নদীতে জাল ফেলে মাছ শিকার করা।

ভবেশ জানান, রোববার রাতে সোডাপীর বাজারে মাছ বেচে বাড়িতে রওনা দেন। পথে শোনেন বাড়িতে আগুন লেগেছে। বাড়ি পৌঁছে দেখেন- চারাপাশে মানুষের ছোটাছুটি। চিৎকার, ভয় আর কান্নার শব্দ। যে যেদিকে পারছে পালিয়ে জীবন রক্ষা করছে। আতঙ্কগ্রস্ত চোখে তিনি বলেন, 'মোর বউ ছইললোক নিয়্যা পালিয়ে যায়। এক পর্যায়ে মুইও দৌড় দিনু।'

ওই দিন রাতে অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ভাংচুর চালায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় সুবর্ণ চন্দ্র, ননীগোপাল চন্দ্র, মনি চন্দ্র, অমল, অতুল, সুনীলসহ প্রায় অর্ধশত বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়। তারা ঘরের আসবাবপত্র, চাল-ডাল, নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।

প্রসঙ্গত, রোববার দুপুরের দিকে এক কিশোরের ফেসবুক আইডি থেকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ওঠে। এরপর বিকেলে মাঝিপাড়ায় হামলা করে একদল দুর্বৃত্ত। হামলাকারীরা একটি মন্দিরসহ ৬৫টি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরে রাতে তারা অন্তত ২০টি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। সোমবার সকাল থেকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৫ জনকে।