নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের হাসেম ফুডসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার আট আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ। তাদের পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রথম দিন তারা কিছু কিছু তথ্য দিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কারখানা ঘিরে নানা অনিয়মের প্রশ্নে নিশ্চুপ প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মো. আবুল হাসেম। এত ঘটনার দায়-দায়িত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলেও স্পষ্ট কোনো জবাব দেননি তিনি।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম সমকালকে বলেন, কারখানা ঘিরে যেসব অনিয়ম ছিল, তার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আরও অনেক বিষয় তদন্তে উঠে আসবে। কারখানাটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া তো দূরে থাক, দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সামান্য ব্যবস্থাও রাখা হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র সমকালকে জানায়, পুলিশ গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছে। তাদের মধ্যে চারজনকে বিশেষভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা হলেন- প্রতিষ্ঠানের মালিক আবুল হাসেম, প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহান শাহ আজাদ, ডিজিএম মামুনুর রশিদ ও প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলী কাম প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন। তাদের কাছে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এবং ভবন নির্মাণ-সংক্রান্ত বিষয় জানতে চাওয়া হচ্ছে। ঘটনার সময় গ্রেপ্তার তিন কর্মকর্তাই প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করছিলেন। আট আসামির চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

সূত্র জানায়, পুলিশ গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করছে, কীভাবে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত এবং কেন প্রতিষ্ঠানে যথেষ্ট পরিমাণ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কার দায় বেশি। ভবন নির্মাণের সময় যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও নকশার অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কিনা, তাও জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। তা ছাড়া ভবন নির্মাণের সময় সংশ্নিষ্ট কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কেউ অবৈধ আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে অনুমোদন দিয়েছিল কিনা, তাও জানার চেষ্টা চলছে।

কারখানা পরিদর্শন কর্তৃপক্ষ, শ্রম অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিসের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো দায় রয়েছে কিনা, তাও জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। কারখানা পরিদর্শন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনের কথা রয়েছে। সেখানে শিশু শ্রমিক রয়েছে কিনা, সেটি যাচাই করার কথা ছিল শ্রম অধিদপ্তরের। অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের বেশির ভাগই ছিল শিশু-কিশোর। এ ছাড়া ভবনের ফায়ার সেফটির বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের স্থানীয় কার্যালয় থেকে ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল কিনা, তাও জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। অগ্নিনির্বাপণে এসে ফায়ার সার্ভিস থেকে দাবি করা হয়েছিল যে ভবনটিতে ফায়ার সেপটির কোনো নকশা অনুমোদন করা হয়নি। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের কোনো গাফিলতি রয়েছে কিনা, তাও জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রূপগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হুমায়ূন কবীর বলেন, তারা গ্রেপ্তারদের নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সংশ্নিষ্ট কোনো কিছুই জিজ্ঞাসাবাদে বাদ দেওয়া হচ্ছে না।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণের উপকরণের অপ্রতুলতার বিষয়টি প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। তা ছাড়া প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কেন ফাইবার রাখা হয়েছে, ছয় তলার ছাদ কেন তালাবদ্ধ ছিল- এসব বিষয়ও জিজ্ঞাসাবাদ করে জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কারখানা প্রাঙ্গণে নিহতদের স্বজনের আহাজারি :হাসেম ফুডসে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের লাশের অপেক্ষায় থাকা স্বজনের কান্না যেন থামছেই না। গতকাল দুপুরে কারখানার সামনে নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের আহাজারি করতে দেখা গেছে। তারা শ্রমিকদের লাশ দ্রুত ফিরে পেতে চান। এ দুর্ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তারা। স্বজনদের কান্নায় কারখানার চারপাশ ভারি হয়ে গেছে। গতকাল সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডিএনএর নমুনা দিয়ে কারখানায় চলে আসেন স্বজনরা।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত সেলিনা আক্তারের (১৩) বাবা সেলিম মিয়া মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। বারবার দৌড়ে চলে যাচ্ছিলেন ওই ভবনটির সামনে। বিলাপ করতে করতে তিনি বলছিলেন, 'মাইয়াডারে তোমরা দেখতে দেও বাবা। আমার মাইয়ারে কেন কাজে পাঠাইলাম?' পাশেই দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন নিহত তুলি আক্তারের বাবা আব্দুল মান্নান। তিনি বলছিলেন, 'আমি তোরে ছাড়া কেমনে থাকমু। কারখানার মালিকরা সব গেট বন্ধ কইরা দিছিলো। প্রতিটা গেট তালা দিয়ে সব মানুষরে মারছে।'

বিষয় : রূপগঞ্জ ট্র্যাজেডি সজীব গ্রুপের হাসেম ফুডস

মন্তব্য করুন