শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবির ঘটনায় ঘাতক এমভি এসকেএল-৩ নামে কার্গো জাহাজটিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে মুন্সীগঞ্জের মেঘনা নদী থেকে জব্দ করেছেন কোস্টগার্ড সদস্যরা। এ সময় কার্গো জাহাজটির চালকসহ ১৪ স্টাফকেও আটক করা হয়েছে। এদিকে লঞ্চডুবির ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের গঠিত পৃথক তদন্ত কমিটি গণশুনানি করেছে। এতে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা দুর্ঘটনার জন্য কার্গো জাহাজটির চালকের একগুঁয়েমিকে দায়ী করেছেন।
এমএল সাবিত আল-হাসান নামে লঞ্চটির ডুবে যাওয়ার সময় কার্গো জাহাজটি ছিল ফিরোজা রঙের। আত্মগোপনে থাকার চার দিনের মাথায় মেঘনা নদী থেকে আটক করার সময় সেটির রং বদলে আকাশি ছিল।
গজারিয়া নৌ পুলিশ জানায়, আইনি ঝামেলা এড়াতে কার্গো জাহাজটির সংশ্নিষ্টরা কৌশলে রং পরিবর্তন করে মেঘনা নদীতে নোঙর ফেলে পরে ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদী হয়ে গন্তব্যের দিকে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। গজারিয়া উপজেলার নয়ানগর গ্রামসংলগ্ন এলাকায় নোঙরে রেখে রং পরিবর্তন করা হয়। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে কোস্টগার্ড সদস্যরা কার্গো জাহাজটি জব্দ করেন।
আটককৃতরা হলেন- জাহাজের মাস্টার ওয়াহিদুজ্জামান, ড্রাইভার মজনু মোল্লা, সুকানি আনোয়ার মল্লিক ও নাজমুল মোল্লা, গ্রিজার ফাহান মোল্লা ও হৃদয় হাওলাদার, ডেকটেনডেল মো. আবদুল্লাহ, লস্কর রাজিবুল ইসলাম, আলিম শেখ, নূর ইসলাম, মো. সাগর, সাকিব সর্দার, আফসার ও বাবুর্চি আবুল বাশার।
আটকের পর বিকেলে জাহাজটিকে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে আসা হয়। নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনালে এনে রাখার পর জাহাজটিকে একনজর দেখতে উৎসুক জনতা ভিড় করে। নারায়ণগঞ্জ নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদ বলেন, জাহাজটিকে কোস্টগার্ড সদস্যরা ১৪ জন ক্রুসহ আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। আমরা আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
জানা গেছে, কার্গো জাহাজটি বাগেরহাট-২ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শেখ সারহান নাসের তন্ময়ের মালিকানাধীন এসকে লজিস্টিকস নামে প্রতিষ্ঠানের। ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের কয়লাঘাটসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতে মুন্সীগঞ্জগামী লঞ্চটিকে সজোরে ধাক্কা দিলে মুহূর্তেই নদীতে ডুবে যায়। পরে কার্গো জাহাজটি লাপাত্তা হয়ে যায়।
লঞ্চডুবির ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাবুলাল বৈদ্য বাদী হয়ে কার্গো জাহাজ ও সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে বন্দর থানায় মামলা করেন। লঞ্চডুবিতে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের অধিকাংশই মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা।
গণশুনানিতে ২৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ : গতকাল শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীরে দুর্ঘটনাস্থলের অদূরে সৈয়দপুর কয়লাঘাট এলাকায় সকাল ১০টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত একই স্থানে দুটি তদন্ত কমিটির কাছে লঞ্চ দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রী, মৃত যাত্রীদের আত্মীয়স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শী ২৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এক দিনেই গণশুনানি শেষ হয়।
তানজিলা আক্তার ও মনিরা আক্তার মুন্নী নামে দুই বোন লঞ্চটির যাত্রী ছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে তারা বেঁচে যান। গণশুনানিতে তারা বলেন, ঘটনার দিন তাদের লঞ্চটি নির্মাণাধীন শীতলক্ষ্যা সেতুর কাছাকাছি আসতেই পেছন থেকে এসকেএল-৩ নামের কার্গো জাহাজটি ধেয়ে আসতে থাকে। ওই সময় লঞ্চের দোতলায় পেছনের দিকে থাকা যাত্রীরা চেঁচিয়ে কার্গোটির গতি কমাতে এবং লঞ্চ বরাবর না আসতে বলতে থাকেন। কিন্তু কার্গোর চালক তাতে পাত্তা না দিয়ে লঞ্চটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেন। ধাক্কা দিয়ে বেশকিছু দূর নিয়ে যান। এরপর লঞ্চটি একপাশে ঘুরে গিয়ে কাত হয়ে ডুবে যায়। ঘটনার পর পরই তারা দুই বোন নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তীর থেকে আসা নৌকা তাদের উদ্ধার করে। তারা কার্গো জাহাজের সংশ্নিষ্টদের বিচার দাবি করেন।
গণশুনানিতে অংশ নিয়ে ডুবে যাওয়া লঞ্চের কেরানি মঞ্জুর আলী বলেন, কার্গোর ধাক্কায় লঞ্চ ডুবতে শুরু করলে অনেকের সঙ্গে তিনিও নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এরপর তীরে উঠে তিনি নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনালে চলে আসেন। এরপর তিনি লঞ্চ মালিক সমিতিসহ সংশ্নিষ্টদের কাছে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কার্গোর নাম প্রকাশ করেন। এরপর পুলিশ এবং বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের কাছে কার্গোর নাম ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরও জানানো হয়। কিন্তু লঞ্চ মালিক তিন থানা ঘুরেও মামলা করতে পারেননি। শুধু তাই নয়, বিআইডব্লিউটিএ থেকে যে মামলা করা হয়েছে তাতেও দায়ী জাহাজের নাম উল্লেখ করা হয়নি। ক্ষোভ প্রকাশ করে মঞ্জুর আলী বলেন, ঘাতকের নাম জানা গেলেও তাকে মামলায় আসামি করা হলো না। বিষয়টি তার বোধগম্য নয়।
গণশুনানিতে অংশ নেওয়া অন্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি কোনো নিছক দুর্ঘটনা নয়। কার্গোর চালক তার শক্তি প্রদর্শনের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এটি করেছে। কার্গোর চালক চাইলেই এই দুর্ঘটনা এড়াতে পারত। এই দায় কোনোভাবেই কার্গোর চালক এড়াতে পারেন না।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আব্দুছ ছাত্তার শেখ। তদন্ত কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরা ববিসহ কমিটির সদস্যরা একই স্থানে পৃথকভাবে গণশুনানি করেন। এই কমিটি আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে।
গণশুনানিতে লঞ্চ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রী মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান তালতলা এলাকার মো. জাকির, একই জেলার নয়াগাঁও এলাকার বাসিন্দা তানজিলা ও মনিরা আক্তার মুন্নী, লঞ্চের কেরানি মঞ্জুর আলী, দক্ষিণ কোর্টগাঁও এলাকার রায়হান সরদার ইফাজ, নিহত রুনা আক্তারের চাচা মনিরুজ্জামান, প্রত্যক্ষদর্শী নির্মাণাধীন শীতলক্ষ্যা সেতুর শ্রমিক মো. হালিম, পূবালী সল্টের শ্রমিক আলামিন সর্দার, মো. সাঈদ, মো. মামুন বেপারী প্রমুখ দুর্ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন তদন্ত কমিটির কাছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক আব্দুছ ছাত্তার শেখ বলেন, 'আমরা আজকে গণশুনানি করলাম। এ বিষয়ে আমরা তদন্ত কমিটি পরে বসে নানা দিক পর্যালোচনা করে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেব। কার্গো জাহাজের ধাক্কায় লঞ্চটি ডুবে ৩৪টি মূল্যবান প্রাণ আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে। আমরা তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।'

মন্তব্য করুন