বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য কক্সবাজারের চেয়ে নোয়াখালীর ভাসানচর অনেক বেশি নিরাপদ ও সুবিধাজনক। দ্বীপটিতে আধুনিক সব অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি শরণার্থীদের আয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেখানকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাও উন্নতমানের। ভাসানচরকে আরও টেকসই করতে সুপেয় পানি সংরক্ষণ, কুটিরশিল্প স্থাপনসহ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের এক গবেষণায় এসব তথ্য মন্তব্য করা হয়েছে। শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। 'বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর: সুবিধা এবং প্রতিকূলতা' শীর্ষক ওই গবেষণায় কক্সবাজার ও ভাসানচরের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্নেষণ করা হয়। সেন্ট্রাল ফাউন্ডেশন ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (সিএফআইএসএস) গবেষণায় সহায়তা করে।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর মানবিক পদক্ষেপ বলে আমি মনে করি, যা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা নির্বাহের জন্য সহায়ক হবে। কারণ, কক্সবাজারের চেয়ে ভাসানচর অনেক উন্নত। কক্সবাজারে চরম অব্যবস্থাপনা আছে, কিন্তু ভাসানচরে সবকিছু অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখানে ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিএফআইএসএসের চেয়ারম্যান কমডোর এম. এন আবসার (অব.) বলেন, অনেক রোহিঙ্গা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাসানচরে আসছেন। আমাদের উচিত সব রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নিয়ে আসা। অসহায় রোহিঙ্গা জন গোষ্ঠীর জন্য ভাসানচর হবে নিরাপদ আশ্রয়স্থল, যা তাদের নিরাপত্তার সঙ্গে জীবন-যাপনে সহায়ক হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, ভাসানচর জীবনধারণের জন্য কক্সবাজারের চেয়ে উন্নত। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের দিকে নজর দিতে হবে। তিনি মনে করেন, ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও সমর্থন দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে চাপ দেওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসাইন বলেন, ইতোমধ্যে কিছু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল ভাসানচর বসবাসের জন্য উপযোগী ও টেকসই কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু ভাসানচর অনেক ভালো। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক মহলকে এগিয়ে আসতে হবে।

ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান বলেন, ভৌগোলিকভাবে ভাসানচর এখন অনেক নিরাপদ। কারণ দ্বীপটির চারদিক ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট আছে। বেড়িবাঁধ আছে। এমনকি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র আছে। ফলে এখানে বসবাস অনেক নিরাপদ।

গবেষণার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা হয়েছিল এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে রোহিঙ্গারা এতে অংশ নিয়েছিল জানিয়ে প্রকল্পের প্রধান গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ সরকার নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সুন্দর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে নোয়াখালীর ভাসানচরে আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্প সম্পন্ন করেছে এবং পর্যায়ক্রমে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই প্রশ্নকে সামনে রেখে আমরা গবেষণা চালিয়েছি। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা সমস্যা খতিয়ে দেখা এবং ভাসানচরের জীবিকা, নিরাপত্তা, সহনীয়তা ও মানবাধিকারের বিষয় পর্যালোচনা করা। কক্সবাজার ও ভাসানচরের সুযোগ-সুবিধার তুলনামূলক বিশ্নেষণ করা হয়েছে গবেষণায়। রোহিঙ্গাদের মতামত প্রতিফলনের জন্য দু'বার মাঠ পর্যায়ে কাজ করা হয়। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আমাদের বলেছেন, ভাসানচরে যে বাসস্থান তৈরি করা হয়েছে তা তাদের জন্য সুবিধাজনক। সবকিছু বিবেচনা করলে ভাসানচর তাদের জন্য নিরাপদ একটি জায়গা।

গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল ইসলাম। কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তরের সুবিধা এবং প্রতিকূলতার বিষয়ে করা গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে তিনি জানান, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জন্য সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। সেখানে বাসস্থান, চিকিৎসাসেবা, আয়-রোজগারের ব্যবস্থা, রান্নাঘর ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষার ব্যবস্থা। সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরো ক্যাম্পে সমানভাবে নেই। ফলে ক্যাম্প এলাকাটি দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের তুলনায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের অবহেলিত মনে করছে। ফলে তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের দ্বন্দ্ব বা সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ইয়াবা, অবৈধ অস্ত্র, পতিতাবৃত্তি, মানব পাচার এবং মাদকের বিস্তার ও কেনাবেচার বিষয়টি তুলে ধরা হয় গবেষণা প্রতিবেদনে।

গবেষণায় বলা হয়, দ্বীপটিতে আধুনিক সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ব্যবস্থা করা হয়েছে আয়-রোজগারের। উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপটিতে যাতায়াতের ভালো ব্যবস্থা আছে। মানবাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ভাসানচরে উন্নত আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুরক্ষা, স্যানিটেশনসহ আরও অনেক ব্যবস্থা চলমান আছে বলে জানানো হয় গবেষণা প্রতিবেদনে। তবে গবেষণার পানীয় জলের সুরক্ষা, বৃষ্টির পানির ব্যবহার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দেওয়াসহ বেশকিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গা শিশুদের তাদের নিজ ভাষায় পাঠদান এবং তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পালন করার ব্যবস্থা করা।

মন্তব্য করুন