মুক্তিদ্ধুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত পাবনার ঈশ্বরদীর অন্যতম প্রধান খাবার হোটেল হিসেবে পরিচিত ‘তৃপ্তি হোটেল’। ঈশ্বরদী এসে তৃপ্তি হোটেলে সকাল, দুপুর কিংবা রাতের খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এই হোটেলের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর কোন দরজা ছিল না। এখনো সারা বছর এবং দিন-রাত ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে এই হোটেলটি। তবে প্রতিষ্ঠার ৪৯ বছর পর হোটেলটিতে লাগানো হয়েছে দরজা আর শাটার।

দেশের প্রতিথযশা সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক নেতা, এমপি, মন্ত্রী, পদস্থ কর্মকর্তাদের পদচারণা পড়েছে এই হোটেলে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে যেমন ‘দরজাবিহীন’ এই হোটেল নিয়ে প্রচার হয়েছে সচিত্র প্রতিবেদন তেমনি দেশের একাধিক শীর্ষ সংবাদপত্রেও এই হোটেলকে নিয়ে ‘যে হোটেলে দরজা নেই’-এমন শিরোনামে প্রকাশ হয়েছে একাধিক প্রতিবেদন। ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশেনও (বিবিসি) এই হোটেল নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার করেছে।

এই হোটেলে আড্ডায় মেতেছেন সাহিত্যিক আনিসুজ্জামান, সাংবাদিক কলামিষ্ট রণেশ মৈত্র, শাহরিয়ার কবির, কাজী মুকুল, প্রয়াত চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনসহ দেশের প্রতিথযশা সাংবাদিক সাহিত্যিকরা। এখানে পদচারনা পড়েছে প্রয়াত রাজনীতিক কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডল, লেখক-সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব কামাল লোহানী, সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত শামসুর রহমান শরীফ, প্রয়াত সাবেক এমপি মহিউদ্দিন আহমেদ, বিএনপির সাবেক এমপি সিরাজুল ইসলাম সরদার, সাবেক এমপি আব্দুল বারি সরদার, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব, সাবেক পৌর মেয়র মকলেছুর রহমান বাবলুসহ আরো বেশ কিছু বর্ষীয়ান রাজনীতিকের।

আন্তর্জাতিক পর্যটক এলিজা বিনতে এলাহী ছাড়াও রাশিয়া, বেলারুশ, চীন, ভারত, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের অসংখ্য নাগরিকরা এই হোটেলের খাবার খেয়ে প্রশংসা করেছেন। 

ঈশ্বরদীর সাংবাদিক-সাহিত্যিক ও সুশিল সমাজের মানুষের নিকটও এই হোটেলটি সুস্থ আড্ডা দেওয়ার আদর্শ স্থান বলে এখনো বিবেচিত। এখনো ঢাকা থেকে কোন সাংবাদিক অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করতে ঈশ্বরদীতে এলে একবেলা আহার সেরে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে এই হোটেলে আসেন। 

ঈশ্বরদীর সিনিয়র সাংবাদিক মাহাবুবুল হক দুদু বলেন, এমন একটা সময় ছিল এই তৃপ্তি হোটেল ছিল সংবাদকর্মীদের প্রাণবন্ত আড্ডা ও খাবার জায়গা।সময়ের পরিবর্তনে এখন সেই আড্ডা আর হয় না, তবে এই হোটেলে দেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক সাহিত্যিক, রাজনীতিক, বুদ্বিজীবীদের আনাগোনা ছিল সে স্মৃতি ঈশ্বরদীর সিনিয়র সাংবাদিকদের নিকট এখনো জ্বলজ্বল করছে।

ঈশ্বরদী নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ কিরণ বলেন, ঈশ্বরদীর পুরনো মোটরস্ট্যান্ডে (মাহবুব আহমেদ খান স্মৃতি মঞ্চ) সারা বছর নানা কারণে রাজনৈতিক-সামাজিক জনসভা হতো। সেসব জনসভায় আগত অতিথিদের আপ্যায়ন করানোর প্রধান জায়গা ছিল এই তৃপ্তি হোটেল।

ঈশ্বরদীর প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান ফান্টু বলেন, এই তৃপ্তি হোটেলের খবারের সুখ্যাতি শুধু দেশেই নয়, অন্যদেশের মানুষও জানেন। এই হোটেল প্রতিষ্ঠার পর এখানে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা ফকির নুরুল ইসলাম, সাবেক এমপি মহিউদ্দিন আহমেদসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতারা ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদেরও আলোচনা-আড্ডার জায়গা ছিল এখানে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করার ২ দিন পর ১৯ ডিসেম্বর এই হোটেলটি চালু করেন আব্দুর রহিম নামের এক ব্যবসায়ী। কোন পূর্ব পরিকল্পনা না থাকলেও কাকতালীয়ভাবে ঐতিহাসিক ঈশ্বরদী মুক্ত দিবসের দিনই (১৯ ডিসেম্বর’৭১) এই হোটেলটির যাত্রা শুরু হয় বলে জানান তৃপ্তি হোটেলের অন্যতম পরিচালক আমজাদ হোসেন। 

এই হোটেলের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম প্রয়াত ইদ্রিস আলীর ছেলে আব্দুল হান্নান জানান, প্রয়াত আব্দুর রহিমের পর হুমায়ুন কবির ও আমার বাবা মহব্বত আলী এই হোটেলটির হাল ধরেন। এর পর মহব্বত আলীর ছোট ভাই ইদ্রিস আলী ইদু হোটেলটি পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন, তবে হোটেল পরিচালনায় ছিলেন তারই ছোট ভাই আমজাদ হোসেন ডোমনা। বংশ পরম্পরায় বর্তমানে হোটেলটি পরিচালনা করেন ইদ্রিস আলী ইদুর দুই ছেলে আব্দুল মান্নান ও আব্দুল মালেক মানিক।

তৃপ্তি হোটেলের শুরুর প্রায় অর্ধশতাব্দি পর কয়েকদিন আগে অবশেষে এই হোটেলে সার্টার দরজা লাগানো হয়েছে। হোটেলটি পরিচালনাকারীরা আক্ষেপ করে বলেন, দরজাবিহীন এই হোটেলটির ঐতিহ্যময় বৈশিষ্ট্য আর ধরে রাখা গেল না। এখন থেকে আর বলার সুযোগ রইলনা যে, এই হোটেলের দরজা-জানালা নেই।

হোটেলের বর্তমান পরিচালক আব্দুল মালেক মানিক জানান, করোনাকালে যখন প্রশাসন হোটেলটি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় তখন বন্ধ থাকা হোটেলটিতে স্থানীয় বখাটের দল রাতভর আড্ডা দিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট করে দিচ্ছিল। তাই বাধ্য হয়ে হোটেলটি রক্ষা করার স্বার্থে প্রতিষ্ঠার ৪৯ বছর পর দরজা ও শাটার লাগাতে বাধ্য হয়েছি। তৃপ্তি হোটেলের দরজা লাগানোর মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যময় এই হোটেলের প্রধান বৈশিষ্ট্যও হারিয়ে গেল।

মন্তব্য করুন