কাফকোতে সিএসআরের কোটি টাকা নয়ছয়

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

বহুজাতিক সার কারখানা কর্ণফুলী ফাটিলাইজার কোম্পানিতে (কাফকো) করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) কোটি টাকা নয়-ছয় হয়েছে। নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করে প্রতিষ্ঠানের সাবেক চেয়ারম্যান সিএসআরের সব টাকা নিয়ে গেছেন তার নিজ এলাকা বরিশালে। হোটেল ভাড়া, বিমান ভাড়া, রেস্তোরাঁয় খাওয়া, কবরস্থানের উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে নিজ এলাকাতে প্রায় সব টাকা খরচ দেখিয়েছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে তার সহযোগী ছিলেন কাফকোর চিফ করপোরেট অফিসার (সিসিও) এমডি রবিউল হক চৌধুরী। প্রসঙ্গত, কাফকোতে পদাধিকারবলে চেয়ারম্যান থাকেন শিল্প সচিব। সাবেক শিল্প সচিব আবদুল হালিম গত দুই বছর চেয়ারম্যান পদে থেকে এসব অনিয়ম করেন কাফকোতে।
চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত কাফকো। সার কারখানা হওয়ার কারণে এখানকার চারপাশে বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আনেকের গাছপালা নষ্ট হচ্ছে। অনেকের আবাদি জমিতে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। চারপাশে এত ক্ষতি সাধিত হওয়ায় কাফকোর সামাজিক দায়বদ্ধতার টাকা স্বাভাবিকভাবে খরচ হওয়ার কথা ছিল আনোয়ারায়। কিন্তু স্থানীয়দের জীবনমান উন্নয়নে কোনো টাকাই খরচ করেননি এ প্রতিষ্ঠানের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হালিম। গত ১৭ মে অবসরে যাওয়া এ কর্মকর্তা ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দকৃত সব টাকা খরচ করেছেন নিজ এলাকা বরিশালে! চট্টগ্রাম অঞ্চলের পেশাজীবীরা এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অধ্যাপক সিকান্দার খান বলেন, 'কাফকোর কারণে আশপাশের এলাকা মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এলাকার গরিব অসহায়-মানুষ। স্বাভাবিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা সিএসআরের টাকা। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ যদি এ টাকা তার নিজ এলাকায় নিয়ে গিয়ে আরাম-আয়েশে ব্যয় করেন, তবে সেটি খুব অনৈতিক কাজ।' জানা গেছে, সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হালিমের বাড়ি বরিশাল। এ জন্য তিনি বরিশালের ফজলুল হক স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে সাড়ে ১২ হাজার টাকা, কম্পিউটার ও সায়েন্স ল্যাবের জন্য ১৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, ল্যাপটপ উপহার হিসেবে ৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, ছারগরিয়া মসজিদে অনুদান হিসেবে ২ লাখ টাকা, ঢাকা থেকে বরিশালে যাওয়া-আসার উড়োজাহাজ ভাড়া ৬৮ হাজার ৪০০ টাকা, ফজলুল হক স্কুলের আইসিটি ল্যাবের জন্য ১ লাখ ১২ হাজার ১৬৬ টাকা, কম্পিউটার সেটআপের জন্য ২২ লাখ ১ হাজার ৬৮৬ টাকা, সায়েন্স ল্যাবের জন্য ২১ লাখ ৩ হাজার ৬৬০ টাকা, বরিশালের আরেকটি স্কুলের কম্পিউটার ল্যাবের জন্য ৫ লাখ টাকা, বরিশালের আরেকটি স্কুলের ল্যাপটপ কিনতে ৮ লাখ ৪ হাজার ১১৩ টাকা, শেরে বাংলা স্মৃতি বৃত্তির জন্য ৫ লাখ টাকা, হালতা হাজিবাড়ি কবরস্থান উন্নয়নে ২ লাখ ও ৭ লাখ টাকা, এ হাশেম বালিকা মাদ্রাসায় আর্থিক সহযোগিতা দেড় লাখ টাকা, ঢাকার সুরের ধারা স্কুলের জন্য ৫ লাখ ও দুই লাখ টাকা, হালতা স্কুলের জন্য ডোনেশন ৫ লাখ টাকা, ওই স্কুলে ল্যাপটপের জন্য ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৩১০ টাকা, নামহীন প্রতিষ্ঠানের ল্যাবের যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ১ লাখ ১২ হাজার ৭৫২ টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন। তা ছাড়া বরিশালে হোটেলে থাকা বাবদ ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫৪ টাকার বিল দেখানো হয়েছে। এর বাইরে বরিশাল আলতাফ স্কুলে ৫ লাখ এবং মুকুল স্মৃতি স্কুলে ৭ লাখ টাকা ডোনেশন দেখানো হয়েছে।
কাফকোতে গত তিন বছর ধরে কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক নেই। তাই চেয়ারম্যানের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও প্রধান করপোরেট কর্মকর্তা (সিসিও) মিলেই এখন কাফকোর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। বহুজাতিক এ প্রতিষ্ঠানটির ৪৯ শতাংশ শেয়ার বাংলাদেশ সরকারের আর ৫১ শতাংশ শেয়ার বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। এ জন্য খরচের ব্যাপারে এখানে আছে কিছু বিধিনিষেধ। কাফকোর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, আইনে ১০০ মার্কিন ডলার কিংবা সমপরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রার বেশি অর্থের পণ্য নগদ টাকায় কেনার সুযোগ নেই। এর বেশি কেনাকাটা করতে হলে তা কাফকোর ক্রয় কমিটির অনুমোদন লাগবে কিংবা ওই কমিটিই তা কিনবে। সাবেক চেয়ারম্যানের সঙ্গে সখ্য থাকায় সিসিও রবিউল হক চৌধুরী এ আইনের ধার ধারেননি। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার টাকায় তিনি সবকিছু কিনে বিলটি ধরিয়ে দিয়েছেন কাফকোকে। সিএসআরের এক কোটি টাকার মধ্যে ৮৩ লাখ ৮৯ হাজার ৮৬১ টাকা তিনি এভাবেই ব্যয় করেছেন। সিসিওর সহায়তায় ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরিশালের বাইরে ঢাকায় সুরের ধারা নামে একটি সঙ্গীত বিদ্যালয়কে মোট সাত লাখ টাকা দিয়েছেন সাবেক চেয়ারম্যান। দুই লাখ ও পাঁচ লাখ টাকা করে দুই ধাপে এ টাকা দেন তিনি।
এভাবে অর্থ বরাদ্দের ব্যাপারে জানতে সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি হাসপাতালে আছেন, পরে কথা বলবেন বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। পরে তাকে ফোন করা হলেও তিনি আর রিসিভ করেননি। বক্তব্য জানতে কাফকোর চিফ করপোরেট অফিসার রবিউল হক চৌধুরীকেও ফোন করা হয়। তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।

বিষয় : কাফকো