পাটুরিয়া ঘাটে ২৫ কি.মি. দীর্ঘ যানজট, ঘরমুখো যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২০   

নিরঞ্জন সুত্রধর, শিবালয় (মানিকগঞ্জ)

ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি- সমকাল

ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি- সমকাল

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ-রুটে ফেরি স্বল্পতা, ঈদে ঘরমুখো যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি এবং পদ্মা-যমুনা নদীতে প্রচণ্ড স্রোতের কারণে ফেরি চলাচলে বিঘ্ন হওয়ায় শুক্রবার পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ফেরি পারাপারের জন্য ঘাট এলাকায় আসা বাস, ট্রাক ও প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি পাটুরিয়া-ঢাকা মহাসড়কের মহাদেবপুর পার্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার রাস্তা বিস্তৃত হয়ে পড়ে। এ নৌ-রুটে বর্তমানে ১৬টি ফেরি ও ২২টি লঞ্চ দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার করা হলেও বেশির ভাগ ফেরি পুরাতন। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাঝে মধ্যেই বিকল হয়ে দুই-একটি ফেরিকে মেরামতের জন্য ভাসমান কারখানা মধুমতিতে পড়ে থাকতে হচ্ছে। এ ছাড়া নৌ-রুটে চলাচলরত ফেরিগুলো বার বার বিকল হয়ে পড়ায় ফেরি স্বল্পতা দেখা দেয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফেরি বিকল থাকার কারণে যানবাহন কম পারাপার হচ্ছে। ফেরিতে যানবাহন কম পারাপার হওয়ায় এবং ঈদে যানবাহনের বাড়তি চাপ থাকায় ঘাট এলাকায় প্রতিদিন দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে ফেরি পারাপার যাত্রীদেরকে ঘাট এলাকায় এসে যানজটে পড়ে প্রায় ১২-১৩ ঘন্টা করে ফেরি পারাপারের জন্য অপেক্ষায় থেকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

কিন্ত পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ-রুটের নদীতে স্রোত না থাকলে স্বাভাবিক সময়ে ফেরি পারাপার হতে সময় লাগে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ মিনিট। প্রায় আধা ঘন্টা সময়ের নৌ-রুট পাড়ি দিতে নদীতে স্রোতের কারণে সময় লাগছে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। এ ছাড়া গাবতলী থেকে শুরু করে মহাসড়কের সাভার, আমিন বাজার, নবীনগর ও ধামরাইসহ বিভিন্ন স্থানে যানজটের কারণে প্রায় পুরো রাস্তাতেই ধীর গতিতে যানবাহন চালিয়ে আসতে হচ্ছে বলে জানান বাস চালকরা। ফলে মহাসড়কেও সময় যাচ্ছে স্বাভাবিকের চেয়ে দুই-তিন গুণেরও বেশি। স্বাভাবিক সময়ে গাবতলী থেকে পাটুরিয়া ঘাটে আসতে সময় লাগে মাত্র দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। এখন রাস্তার বিভিন্ন স্থানে যানজটের কারণে সময় লাগছে প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘন্টা।

এদিকে ফেরি পারাপার যাত্রীদেরকে পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় এসে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষায় থাকার কারণে অনেক যাত্রী দ্রুত গৌন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যে লঞ্চ পারাপার বাসে ওঠে ঘাটে আসছেন। কিন্ত লঞ্চ পারাপার বাসে এসে লঞ্চ ঘাটের প্রায় আধা কিলোমিটার আগে লঞ্চ টার্মিনালে বাস থেকে যাত্রীদেরকে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাসে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ঘাট এলাকায় এসেও আবার ১০ টাকার রিকশা ভ্যানের ভাড়া জনপ্রতি ৫০ থেকে ৮০ টাকা দিতে হচ্ছে। আর অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে যারা রিকশা-ভ্যানে যেতে পারছেন না তাদেরকে আধা কিলোমিটার পায়ে হেঁটে ঘাট এলাকায় এসে লঞ্চ ও ফেরিতে উঠতে হচ্ছে। অনেক যাত্রী ঘাটে যানজটের কারণে বাস থেকে নেমে লঞ্চে পারাপার হয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।

এদিকে কাটা লাইনের বাসের চাপ বেশির কারণে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ লঞ্চ মালিক শ্রমিকরা লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী নিতে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে। যাত্রীরা দ্রুত গৌন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ট্রলারেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন পদ্মা-যমুনা নদী। রাতে স্পিডবোড ও ট্রলার চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হলেও এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ মালিক শ্রমিকরা তা মানছেন না।

এবার ঈদের ছুটি ঈদের এক দিন আগে হওয়ায় ঘাটে যানবাহন যাত্রীদের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক বেশি। আপনজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে যাত্রীরা গত কয়েক দিন ধরে বাড়ি ফেরা শুরু করলেও গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে লঞ্চ ও ফেরিতে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়ের কারণে কোথাও ঠাই ছিল না। ঘাট এলাকায় ছিল ঘরমুখো লাখ যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। যদিও রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ঘরে ফেরা যাত্রীদেরকে যানজটে পড়ে দুর্ভোগ পোহাতে হলেও তাদের চোখে-মুখে কষ্টের ছাপ দেখা যায়নি। হাসি খুসি ভাবেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন তারা।

নারায়ণগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা যশোর গামী ট্রাক চালক ময়নাল হোসেন জানান, গত বুধবার রাতে পাটুরিয়া ঘটে আসেন। কিন্ত আজ শুক্রবার দুপুর ২টা পর্যন্ত ফেরি পারাপারের জন্য অপেক্ষায় থেকেও ফেরির টিকিট পাননি তিনি।

ঢাকার গাবতলী থেকে ছেড়ে আসা দর্শনা গামী বাসের চালক হাবিবুর রহমান জানান, আজ সকাল ৮টায় গাবতলী থেকে বাস ছেড়ে সড়কে যানজটের কারণে পাটুরিয়া ঘাটে আসেন ১২টার দিকে। কিন্ত আজ শুক্রবার দুপুর ২টা পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেও ফেরিতে উঠতে পারেননি।

গাবতলী থেকে ছেড়ে আসা পিরোজপুর গামী সেবা গ্রীণ লাইন বাসের চালক সিরাজ জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় বাস ছেড়ে সাড়ে ১১টায় পাটুরিয়া ঘাটে আসেন। কিন্ত গতকাল বিকেল সোয়া ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও ঘাটে যানজটের কারণে ফেরি পারাপার হতে পারেননি তিনি।

এরকম শ’ শ’ ট্রাক ও বাস চালকরা ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় আছেন ঘাট এলাকায়। যদিও এবার কাটা লাইন বাসের যাত্রী বেশি দেখা গেছে।

আরিচা অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, এ নৌ-রুটে চলাচলরত ফেরি গুলো দীর্ঘ দিনের পুরানো। এ কারণে বার বার বিকল হয়ে পড়ে । তবে বিকল হয়ে পড়া ফেরি গুলো দ্রুত মেরামত করে দেওয়া হচ্ছে।

আরিচা অফিসের বিআইডব্লিউটিসির ডিজিএম জিল্লুর রহমান জানান, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে প্রায় আড়াই হাজার যানবাহন পারাপার হয়। কিন্ত ঈদের সময় ৫ হাজার থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার যানবাহন পারাপার করতে হয়। এ নৌ-রুটে বর্তমানে ১৪টি ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। আসন্ন ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের কারণে বিভিন্ন যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ঘাট এলাকায় এ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

শিবালয় থানার ওসি ফিরোজ কবির জানান, পাটুরিয়া ঘাট এলাকাসহ ঢাকা-পাটুরিয়া মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমান আদালত, র‌্যাব ও পুলিশসহ বিভিন্ন  আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন নিয়োজিত রয়েছে।