পেঁয়াজ বেচাকেনার তথ্য গোপনে ৯০ জনের সিন্ডিকেট

কত টাকায় কেনা আর কত টাকায় বেচা- এই তথ্য গোপন রাখতে তৈরি করা হয়েছে সিন্ডিকেট

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের পকেট কাটতে এক হয়েছে অন্তত ৯০ ব্যবসায়ীর একটি সিন্ডিকেট। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের এসব ব্যবসায়ী এখন পেঁয়াজ আনছেন বার্মিজ পণ্যের আড়ালে। প্রশাসন সতর্ক থাকায় অখ্যাত প্রতিষ্ঠান দিয়ে আমদানি করা হচ্ছে। ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পেঁয়াজ বেচাকেনায়ও তারা সম্পৃক্ত করছেন অপরিচিত ব্যবসায়ীদের। মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজে মুনাফা বেশি করার সুযোগ থাকায় ৯০ জনের এই সিন্ডিকেটে ৬০ জনই কক্সবাজারের। বাকিরা ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী। গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পাওয়া এই তালিকা ধরে অভিযান শুরু করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ছদ্মবেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে এই সিন্ডিকেটের কৌশলও জেনেছে গোয়েন্দা সংস্থা। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ এসেছে মন্ত্রণালয় থেকেও।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেন বলেন, পেঁয়াজের দাম নিয়ে কারসাজি করতে বেশ কিছু ব্যবসায়ী কিছু অপকৌশল নিয়েছেন। তথ্য গোপন করে যারা বাজার অস্থির করছেন, তাদের তালিকা আমাদের হাতে এসেছে। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে চট্টগ্রামে টানা অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে অন্য জেলাগুলোতে তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না। শক্তিশালী এ সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে যুগপৎ অভিযান দরকার।

চট্টগ্রামের পাইকারি মোকাম খাতুনগঞ্জে টানা অভিযান পরিচালনা করা ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম বলেন, পেপারলেস মার্কেট তৈরি করে যারা বাজার অস্থির করছেন, তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য পেয়েছি আমরা। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশনাও পেয়েছি আমরা। এজন্য সহায়ক আরও কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তালিকায় থাকা কারও কারও ঠিকানা ভুয়া পেয়েছি। আবার এমন কিছু ব্যবসায়ী পেয়েছি, যারা মূলত বার্মিজ পণ্য আমদানি করে মিয়ানমার থেকে। সব বিষয় মাথায় রেখে অভিযান আরও জোরদার করব আমরা।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, পেঁয়াজ বেচাকেনার তথ্য গোপন করার এ সিন্ডিকেটে আছেন অন্তত ৯০ জন। তাদের ৭০ শতাংশই হচ্ছেন কক্সবাজারের। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের শীর্ষ আমদানিকারকরা নিজেদের সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে অখ্যাত ব্যবসায়ীদের দিয়ে বার্মিজ পণ্যের আড়ালে পেঁয়াজ আমদানি করাচ্ছেন। পাইকারি মোকামে সরবরাহ করতেও অপরিচিত এসব ব্যবসায়ী সামনে থাকছেন। কত টাকায় কেনা ও কত টাকায় বেচা- এই দুটি তথ্য গোপন রাখতে এমন সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছে। কোনো তথ্য-প্রমাণ না রাখতে পেপারলেস মার্কেট তৈরি করেছেন তারা। শুধু বিশ্বস্ত কমিশন এজেন্ট ও পাইকারদের কাছে পণ্য সরবরাহ করছেন তারা। মুখে মুখে দর ঠিক করেই পেঁয়াজ পাইকারি মোকামে বিক্রি করা হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি উপসচিব সেলিম হোসেন টেকনাফ স্থলবন্দর, কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনকে পেপারলেস মার্কেট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেছেন। টেকনাফ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি মনিটর করতে বলা হয়েছে। প্রকৃত পেঁয়াজ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান, আড়তদার, পাইকারি বিক্রেতা ও খুচরা বিক্রেতারা যেন ব্যবসা করেন, তা নিশ্চিত করতে বলেছেন সংশ্নিষ্টদের।

৯০ জনের এই সিন্ডিকেটে থাকা কক্সবাজারের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- নিউ বার্মিজ মার্কেটের তাজমহল শপিং মল, টেকনাফ বাস স্টেশনের হামিদ অ্যান্ড ব্রাদার্স, বার্মিজ মার্কেটের গফুর এন্টারপ্রাইজ, টেকনাফ রশিদ মার্কেটের পারভীন এন্টারপ্রাইজ, পুরান পালানপাড়ার মিফতাহুল এন্টারপ্রাইজ, গোদার বিলের মিয়া হোসেন ব্রাদার্স, গনি মার্কেটের চৌধুরী ট্রেডার্স, লামার বাজার রোডের এম এস কবির ট্রেডিং, কে কে পাড়ার বড় হাজী ট্রেডার্স, চকরিয়ার পালাকাটা এলাকার রেড ডট এন্টারপ্রাইজ, শাহপরীর দ্বীপের মাহী অ্যান্ড ব্রাদার্স, কে কে পাড়ার মেসার্স আবসার অ্যান্ড ব্রাদার্স, ওলিয়াবাদের মেসার্স জুনায়েদ এন্টারপ্রাইজ, কলেজপাড়ার শুক্কুর অ্যান্ড ব্রাদার্স, শাহার বিলের ইয়াসিন ফিশিং, কলেজপাড়ার কবির অ্যান্ড সন্স, লামার বাজারের এম এ ট্রেডিং, মাসুম এন্টারপ্রাইজ, কুলালপাড়ার হাজী নূর ট্রেডিং, বাসস্টেশনের এন ইসলাম এন্টারপ্রাইজ, উপরের বাজার এলাকার বেলাল এন্টারপ্রাইজ, গণি মার্কেটের মা এন্টারপ্রাইজ এবং মাদ্রাসা রোডের বিসমিল্লাহ ট্রেড সেন্টার। সিন্ডিকেটে থাকা চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- পূর্ব নাসিরাবাদের এজিএমবি ট্রের্ডাস, স্টেশন রোডের জিন্নাহ অ্যান্ড ব্র্রাদার্স, মেসার্স সৌরভ এন্টারপ্রাইজ, আসাদগঞ্জের বিসমিল্লাহ স্টোর, রেয়াজউদ্দীন বাজারের জাফর এন্টারপ্রাইজ, হক ট্রেডার্সসহ ৩০ প্রতিষ্ঠান।