যমুনা অয়েল কোম্পানি

অফিসে না গেলেও বেতন ও ওভারটাইম বিল নেন তারা

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম

অফিসে না এসেই হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন তারা। ছুটিতে থেকেও অফিসে উপস্থিতি দেখান। এমনকি জালিয়াতির মাধ্যমে আদায় করেন ওভারটাইমের (অধিকাল ঘণ্টা) অর্থ। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এতে বাধা দিলে তাদের অপদস্থ করতে পর্যন্ত দ্বিধা করেন না তারা। অফিস টাইম ও ওভারটাইম জালিয়াতির দুই হোতা হচ্ছেন যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের চট্টগ্রামের পতেঙ্গা টার্মিনালের ফিটার মো. খোরশেদ আলম ও কোম্পানির খুলনা বিভাগীয় অফিসের পিয়ন শরিফুল ইসলাম। শেষ পর্যন্ত এই দু'জনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে দেখছে যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষ। পৃথক দুটি অভিযোগেরই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কোম্পানির ম্যানেজার  (অ্যাকাউন্টস) মেজবাহ উদ্দিনকে।

কোম্পানির ডিজিএম (পার্সোনেল) মাসুদ করিম সমকালকে বলেন, কোম্পানির ডিপো চট্টগ্রামের পতেঙ্গা টার্মিনালের ফিটার খোরশেদ আলম ও খুলনা বিভাগীয় অফিসের পিয়ন শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে অফিসে না এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর, ওভারটাইম জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শরিফুল ইসলাম যমুনা অয়েলের খুলনা বিভাগীয় অফিসের পিয়ন হলেও দাপট দেখিয়ে অন্যদের তটস্থ করে রাখেন। চলতি বছরের ১০ ও ১১ ফেব্রুয়ারি দু'দিন কর্মস্থলে যাননি তিনি। ১২ ফেব্রুয়ারি কর্মস্থলে যোগ দিয়ে অনুপস্থিতির দু'দিন শারীরিক অসুস্থতা দেখিয়ে ছুটির জন্য আবেদন করেন। এই ছুটি মঞ্জুরও হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসের ওভারটাইমের বিলে দেখা যায় ১০ ও ১১ ফেব্রুয়ারি অফিস করেছেন তিনি! শুধু অফিসই করেননি, ওভারটাইমও করেছেন। ওভারটাইম শিটে রয়েছে, ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৮টায় অফিসে হাজির হয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ছিলেন। অর্থাৎ, ওইদিন তিনি ১১ ঘণ্টা অফিসে ছিলেন এবং নির্ধারিত অফিস সময় ছাড়াও ২ ঘণ্টা ওভারটাইম করেন! একইভাবে ১১ ফেব্রুয়ারি যথারীতি সকাল সাড়ে ৮টায় অফিসে হাজির হয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ছিলেন। অর্থাৎ, ওইদিন তিনি ১১ ঘণ্টা অফিসে ছিলেন এবং অফিস সময় ছাড়াও ২ ঘণ্টা ওভারটাইম করেন। পরবর্তীতে নির্ধারিত অফিস ও ওভারটাইমের আর্থিক সুবিধা নেন তিনি। শুধু এটাই নয়, বিভিন্ন সময় নানা জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এদিকে কর্মকর্তাদের তোয়াক্কা করেন না শরিফুল ইসলাম। ওভারটাইম জালিয়াতিতে বাধা দেওয়ায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি যমুনা অয়েলের খুলনা সেলস অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইকরাম হোসেনকে হুমকি-ধমকি দেওয়ার পাশাপাশি অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। এমনকি তার দিকে মারমুখী হয়ে তেড়ে যান। এ নিয়ে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি কোম্পানির সহকারী মহাব্যবস্থাপকের (সেলস) কাছে লিখিত অভিযোগও করেন ওই কর্মকর্তা। অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়।

ওভারটাইম জালিয়াতির আরেক হোতা যমুনা অয়েলের পতেঙ্গা গুপ্তখালের মূল টার্মিনালের ফিটার খোরশেদ আলম। হাজিরা খাতায় অনুযায়ী, খোরশেদ আলম গত বছরের ১ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় অফিসে ঢোকেন এবং বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে অফিস থেকে বের হন। কিন্তু তার ওভারটাইম বিল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সকাল সাড়ে ৯টায় অফিসে ঢুকলেও দেখানো হয়েছে সাড়ে ৮টা। আর বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে বের হয়ে গেলেও দেখানো হয়েছে সাড়ে ৬টা। ১৩ ডিসেম্বর তিনি সকাল সোয়া ৯টায় অফিসে ঢুকে সোয়া ৫টায় বেরিয়ে যান। কিন্তু তিনি ওইদিন অতিরিক্ত ২ ঘণ্টা ওভারটাইম দেখান। ১৪ ডিসেম্বর শুক্রবার সরকারি ছুটির দিনে সকাল সাড়ে ১১টায় অফিসে ঢুকে দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে বেরিয়ে যান। অথচ তিনি হাজিরা খাতায় উপস্থিত দেখান সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত। অর্থাৎ, ৩ ঘণ্টা ১০ মিনিট অফিস করে তিনি ওভারটাইম দেখান ৮ ঘণ্টা। এভাবে হাজিরা খাতায় নয়ছয় করে কোম্পানি থেকে অবৈধভাবে বাড়তি সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের অপদস্থ পর্যন্ত করতে দ্বিধা করছেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খোরশেদ আলম সমকালকে বলেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এখন তদন্ত করছে। তদন্তে যা হওয়ার তাই হবে।

তবে আরেক অভিযুক্ত শরীফুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

বিষয় : যমুনা অয়েল কোম্পানি