আদালতের নির্দেশনা অমান্য

সেন্টমার্টিনে নির্মাণ হচ্ছে নতুন দালানকোঠা

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০১৮   

আবদুর রহমান, টেকনাফ

সেন্টমার্টিনে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা আবাসিক হোটেল ভাঙার নির্দেশনার মধ্যেই নতুন করে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তবে প্রশাসন জেনেও না জানার ভান করে রয়েছে। গত বছর সেন্টমার্টিন নিয়ে সমকালে চার পর্বের সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দ্বীপে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ১০৪টি আবাসিক হোটেলের মধ্যে তিনতলা, দোতলা ও এক তলার ৩৮টি আবাসিক হোটেল ভাঙার নির্দেশ দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু ভাঙা দূরের কথা, সেখানে নতুন করে দালানকোঠা নির্মাণের কাজ চলছে।

সরেজমিন দেখা যায়, দ্বীপের জেটিঘাট থেকে দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে কোনাপাড়া সৈকতে দোতলা একটি বিশাল হোটেল 'লাবিবা বিলাস' অবস্থিত। ওই হোটেলের তৃতীয় তলায় প্রায় ২০ শ্রমিক নির্মাণ কাজ করছেন। সেখানে তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছে প্রকাশ্যে। ওই হোটেলের পাশে রয়েছে পান্না রিসোর্ট ও হোটেল ডায়মন্ড। এ ছাড়া কিছু দিন আগে দ্বীপের পূর্বপাড়ায় ১৪ কক্ষের সি-সাইন নামে একটি কটেজ নির্মাণ হয়েছে। এ ভবন ছাড়া আরও ৫-১০টি ছোট-বড় স্থাপনার নির্মাণ কাজ চলছে। দ্বীপ ঘুরে দেখা যায়, দ্বীপের উত্তর অংশের এক বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে গড়ে উঠেছে ৮৪টিরও বেশি হোটেল-মোটেল ও ৩০টি রেস্টুরেন্ট। স্থানীয় সূত্রমতে, গত পাঁচ বছরে ৫৬টির মতো বহুতল হোটেল তৈরি হয়েছে।

নতুন করে হোটেলে কাজ করার সময় কেউ বাধা প্রদান করেনি বলে জানিয়েছেন হোটেল লাবিবা বিলাসের পরিচালক আবদুস সালাম। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে ভেঙে যাওয়া ভবনের মেরামত করছি। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। আগে এ ভবনে তৃতীয় তলা ছিল কি-না জানতে চাইলে বলেন, আমি এত কিছু জানি না, এখানে নতুন করে কোনো ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে না। হোটেল মালিক নজরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি ঢাকায় অবস্থান করেন। বিস্তারিত তার কাছে জেনে নিন।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে সেন্টমার্টিনে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া গড়ে ওঠা আরও ৪টি হোটেল চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আগে গত বছর মে মাসে ১০৪টি আবাসিক হোটেল চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনতলা ও দোতলাসহ ৩৮টি আবাসিক হোটেল ভেঙে তা সরিয়ে নিতে মালিকপক্ষকে লিখিতভাবে নোটিশ দেওয়া হয় গত বছর। নোটিশে গত ২০ মের মধ্যে নিজ দায়িত্বে এসব হোটেল সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ওই নোটিশের বিপক্ষে আদালতে আপিল করে হোটেল মালিকপক্ষ। তাই আদালতের মাধ্যমে আইনি লড়াই করে হোটেল ভেঙে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। হোটেলগুলোর মধ্যে রয়েছে- ব্লু মেরিন, ফ্যান্টাসি, অবকাশ পর্যটন লিমিটেড, লাবিবা বিলাস, সেন্ডশোর, প্রসাদ প্যারাডাইস, প্রিন্স হেভেন, স্বপ্ন বিলাস, সেভেন স্টার, ব্লু-সি ইস্টার্ন রিসোর্ট, সি ইন, ডাক বাংলা, ওশান ব্লু, সি ভিউ, সি প্রবাল, সি টি বি ও এস কে ডিস প্রভৃতি।

স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সেন্টমার্টিন দ্বীপে স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলেই রাজনৈতিক নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কিছু কর্মকর্তার একটি চক্রকে ম্যানেজ করতে হয়। তাদের যোগসাজশে প্রকাশ্যে টেকনাফ থেকে প্রায় ৩৪ কিলোমিটারের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইট, লোহা, সিমেন্ট, বালুসহ যাবতীয় নির্মাণ সামগ্রী পৌঁছে যায় সেন্টমার্টিন দ্বীপে। সংশ্নিষ্ট দপ্তর ম্যানেজ থাকায় এসব নির্মাণসামগ্রী নির্বিঘ্নে নির্মাণস্থলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কোনো বাধা ছাড়াই গড়ে উঠছে হোটেল, কটেজ ও রেস্তোরাঁ। আবার অনেক সময় দ্বীপের তিন দিকে ছড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক পাথর ব্যবহূত হচ্ছে অবকাঠামো তৈরিতে। এদিকে সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দায়ের করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে দ্বীপে পাকা স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ এবং নির্মিত সব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একে 'পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা' ঘোষণা করা হয়। নির্দেশনা মতে, সেন্টমার্টিনে ছোট কিংবা বড় কোনো স্থাপনাই নির্মাণের সুযোগ নেই। কিন্তু তার পরও সেখানে গড়ে উঠছে একের পর এক স্থাপনা।

কক্সবাজারের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) প্রধান নির্বাহী এম ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, গত বছর ফেব্রুয়ারিতে সেন্টমার্টিন নিয়ে সমকালে চার পর্বের সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সরকার সেন্টমার্টিন রক্ষার উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে সেন্টমার্টিনে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৩৮টি আবাসিক হোটেল ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা এখানও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে দ্বীপে আবারও নতুন করে দালানকোঠা নির্মাণ চলছে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশ্রাব বলেন, নতুন বছরে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া গড়ে ওঠা আরও ৪টি হোটেল চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ১০৪টির মধ্যে ৩৮টি আবাসিক হোটেল ভাঙার নির্দেশনার বিরুদ্ধে আপিল করেছে হোটেল মালিকপক্ষ। সেটি আইনিভাবে লড়াই করে হোটেল ভাঙার নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হবে।

সেন্টমার্টিন দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, সেন্টমার্টিনে নতুন করে আবারও ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করেছি। প্রশাসন জানলেও হোটেল মালিক কর্তৃপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক বলেন, সেন্টমার্টিনে নতুন করে ভবন নির্মাণের খবর পেয়ে দ্বীপে সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়েছে। দ্বীপের পশ্চিম সৈকতে লাবিবা বিলাস নামে একটি নতুন ভবনের নির্মাণ কাজের সত্যতা পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মো. মকবুল হোসেন বলেন, প্রবাল দ্বীপে নতুন করে লাবিবা বিলাস হোটেল নির্মাণ করায় তাদের আবারও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দ্বীপকে বাঁচাতে আমরা কাজ করছি। কোনোভাবে নতুন করে ভবন নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না। বরং যেসব ভবন ভাঙার নির্দেশনা ছিল তা দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।