জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাদেশের সংবিধানের মূলমন্ত্র। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর খতিয়ে দেখা দরকার, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে এর প্রতিফলন কতটুকু?
চার রাষ্ট্রীয় নীতির প্রশ্নে রাজনৈতিক দল দ্বিধাবিভক্ত। আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে চার মূলনীতির স্পষ্টত উল্লেখ রয়েছে। আমাদের জানা যে, জিয়াউর রহমানের হাতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে চার রাষ্ট্রীয় নীতি ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল, আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা সংবিধানে পুনর্বহাল করেছে। তবে সেই আলোকে দেশ পরিচালনায় আওয়ামী লীগ সরকার সমধিক অনীহ। বাম দলগুলো যারা কখনও ক্ষমতায় যায়নি- তারা ও শিল্পী-সাহিত্যিক- বুদ্ধিজীবীদের একাংশ চার মূলনীতির আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার দাবিতে সোচ্চার। ইসলামপন্থি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীদের অবস্থান নেতিবাচক। তাদের বক্তব্য- এসব কংগ্রেসের নীতি; যা ভারত চাপিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের ওপর। বিএনপির কাছে দেশ পরিচালনার নীতি কেবলই গণতন্ত্র।
১৯৭২ সালের সংবিধানের দিকনির্দেশক চার মূলনীতি হঠাৎ করে নাজেল হয়নি, ভারত থেকেও আমদানি করা হয়নি। এই নীতিগুলো আমাদের দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের ফসল। ১৯৪৮-৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা হয়। পাকিস্তানি জাতীয়তার মূলে ছিল ধর্ম, যা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ কার্যত মুসলিম জাতীয়তাবাদ। পক্ষান্তরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ধর্ম নয়- ভাষা, বাংলা ভাষা। ভাষার কোনো ধর্মীয় পরিচয় নেই, তা ধর্মনিরপেক্ষ। বাংলা ভাষা হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার মাতৃভাষা।
ব্রিটিশ শাসনের অবসানকালে হিন্দু, মুসলমানের মধ্যে যে দূরত্ব ছিল, পঞ্চাশের ভাষা আন্দোলনে তা ঘুচে যায়। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়, পাকিস্তানি শাসকের চক্রান্ত ও রাজনীতিবিদদের আত্মঘাতী হানাহানিতে মিইয়ে যায়। তবে পথ হারায় না। ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার বেতারে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করলে ভাষা আন্দোলনে নতুন জোয়ার আসে। রবীন্দ্রনাথের গান-কবিতায় বাংলা জেগে ওঠে। ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, '৬৪-এর সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী প্রতিরোধ, '৬৬-এর স্বায়ত্ত শাসনের আন্দোলন, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশ লাভ করেছে, যা একাত্তরে পূর্ণ অবয়বে প্রস্টম্ফুটিত।
আমাদের জাতীয় উত্থানের সংগ্রাম কেবল জাতীয়তাবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এই সংগ্রাম সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায়ও উজ্জীবিত ছিল। পাকিস্তান আমলজুড়ে রাজপথে স্লোগান উঠেছে- ধর্মের নামে শাসন করা চলবে না, ধর্মের নামে শোষণ করা চলবে না। বাংলার জনগণ ধর্মের নামে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্মম শাসন-শোষণ দেখেছে, তা থেকে পরিত্রাণ ছিল তাদের আরাধ্য।
দীর্ঘ সংগ্রামে ছিল শোষণ মুক্তির আকুতি। সংগ্রাম ছিল পাকিস্তানের ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে। নিশ্চয়ই নতুন করে বাঙালি ২২ পরিবার সৃষ্টির জন্য নয়। পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে দুটি ধারা ছিল বাম ধারা ও জাতীয়তাবাদী ধারা। বামরা সমাজতন্ত্রের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ধরেছিল, স্লোগান দিয়েছিল- কেউ খাবে কেউ খাবে না তা হবে না তা হবে না। উনসত্তরের গণআন্দোলনে জাতীয়তাবাদী কর্মীদের মুখেও এই স্লোগান ধ্বনিত হয়। ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগও সমাজতন্ত্রকে অন্যতম নীতি ঘোষণা করে। ১৯৬৪ সালের খসড়া ঘোষণাপত্রে বলা হয়, 'আওয়ামী লীগের আদর্শ শোষণহীন সমাজ কায়েম করা। সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমেই বর্তমানের শোষণ, বৈষম্য ও দুর্দশার হাত হইতে মুক্তিলাভ করা সম্ভব বলিয়া আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে।' ১৯৭০-এর নির্বাচনী ঘোষণা, বক্তৃতা-বিবৃতিতেও সমাজতান্ত্রিক নীতি ও ব্যবস্থার কথা বলা হয়। আর সব আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল গণতন্ত্র।
একবাক্যে বলা যায় যে, আমাদের মুক্তি সংগ্রামের মধ্যেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র মূর্তমান ছিল; কোনোক্রমে তা আরোপিত নয়। প্রসঙ্গক্রমে, বাংলাদেশই উপমহাদেশের প্রথম, ১৯৭২ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। ভারতে ১৯৭৬ সালে এবং নেপালে ২০১৫ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়।
চার মূলনীতি আমাদের জাতীয় চেতনার স্মারক। তবে সংবিধানে জাতি ও নাগরিক পরিচয় বাঙালি উপস্থাপন নিয়ে ১৯৭২ সালের গণপরিষদেই বিতর্কের সূত্রপাত। তবে সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো বিতর্ক ছিল না।


১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামের অগ্রভাগে ছিল বাঙালি জনগোষ্ঠী। তারাই নেতৃত্ব দিয়েছিল। তবে মুক্তিসংগ্রাম থেকে সাঁওতাল, মুন্ডা. খাসিয়া, মণিপুরি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ সংখ্যালঘু জাতিসমূহ দূরে ছিল না। তারা একসঙ্গে মিলেছিল, একইভাবে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে সচেতন ছিল। সভা-সমাবেশ, বক্তৃতা-বিবৃতিতে বাংলার মানুষ বা বাংলার জনগণ উল্লেখ করা হতো। ১৯৭০ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্পষ্টতই বলেন, আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়। তিনি 'বাঙালি' বলেননি। তিনি এ-ও বলেছিলেন, 'এই বাংলায় হিন্দ-মুসলমান, বাঙালি-নন বাঙালি যারা আছেন, তারা আমাদের ভাই।' ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে 'বাংলাদেশের জনগণ' উল্লেখ করা হয়। নবগঠিত রাষ্ট্রের নামকরণ করা হয়- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ (দ্য পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ)। মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ সবার বক্তৃতা-বিবৃতিতে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার উল্লেখ করা হয়। ১৯৭০ সালের ২২ ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকারের প্রত্যাবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ঘোষণা দেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসমাবেশে সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করেন।
১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নকালেও অনেকেরই ধারণা ছিল যে, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা হবে সংবিধানের মূলভিত্তি। হয়েছিলও তাই। তবে সেই সঙ্গে 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ' জুড়ে দেওয়া হয়। নাগরিক পরিচয়ও বাঙালি করা হয়। আওয়ামী লীগের সকল সদস্য ও ন্যাপ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এটি সমর্থন করেন। প্রতিবাদ করেন কেবল মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সদস্য। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে আমরা জড়িত। সব দিক দিয়েই আমরা একসঙ্গে একযোগে বাস করে আসছি। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা, চৌদ্দ পুরুষ- কেউ বলেন নাই, আমি বাঙালি।' বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্তেজনায় বিভোর সদস্যদের কণ্ঠভোটে লারমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। এ প্রত্যাখ্যান পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে বিক্ষুব্ধ করে। এ ক্ষোভ প্রশমনের কোনো চেষ্টা হয় না। উপরন্তু বাঙালি হওয়ার পরামর্শ দেওয়ায় তাদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।
জাতীয়তাবাদ অমোঘ শক্তি। মুক্তিসংগ্রামে নিপীড়ক শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াই তা কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সেই জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতাসীন হয়ে নিপীড়ক শ্রেণিতেই পরিণত হয়। ব্যতিক্রম নয় বাঙালি জাতীয়তাবাদীরাও। সরকারি বাহিনীর সঙ্গে পাহাড়িদের সংগঠন জনসংহতি সমিতির ক্যাডারদের মধ্যে যে দীর্ঘদিন ধরে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলেছিল, তার মূলে ছিল বাঙালি শাসকের প্রভুসুলভ নীতি।
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনা সরকার দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে এক ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ শাসনসহ যৌক্তিক দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া হয়। একদিকে অনেক সেনা ক্যাম্প গুটিয়ে নেওয়া হয়, অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হয়। এতে আত্মঘাতী সংঘাত বন্ধ হয়। তবে এখনও অনেক সমস্যা ঝুলে আছে।
চার মূলনীতিকে ক্ষতবিক্ষত করেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। তার শাসনামলে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রতিস্থাপিত হয়। ধর্মনিরপেক্ষতা নির্বাসিত করে সেখানে প্রতিস্থাপন করা হয় 'সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস'। সমাজতন্ত্রের নতুন ব্যাখ্যা দান করা হয়। শুধু তাই নয়, সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন করার ক্ষেত্রে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল- তা তুলে দেওয়া হয়। ফলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দ্বার খুলে যায়।
একাত্তরের গণহত্যার সহযোগী মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি দল রাজনীতি করার সুযোগ লাভ করে। রাজাকার শাহ আজিজুর রহমান জিয়ার ক্যাবিনেটে প্রধান হন। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশ যেন 'মিনি পাকিস্তানে' পরিণত হয়। আওয়ামী লীগ ও বাম দলগুলো প্রতিবাদ করলেও কার্যকর আন্দোলন গড়ে ওঠে না। জামায়াত, বিএনপির অনুকরণে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার শুরু করে। জামায়াতের স্লোগান 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌- দাঁড়িপাল্লা দাঁড়িপাল্লা' এবং বিএনপির স্লোগান 'ধানের শীষে বিসমিল্লাহ্‌'র পাশাপাশি আওয়ামী লীগ স্লোগান দেয়- নৌকার মালিক তুই আল্লাহ। আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতি, পোশাকে-আশাকে পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়।
জিয়ার মৃত্যুর পর অপর সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আজ্ঞাবহ পার্লামেন্টে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংযোজিত হয়। তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাত দল ও বাম পাঁচ দলের স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম ছিল। সেদিন তিন জোট একযোগে এর বিরোধিতা করে।
১৯৯০ গণঅভ্যুত্থানের আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছে। আওয়ামী লীগ একনাগাড়ে এক যুগের অধিক ক্ষমতায় আছে। রাষ্ট্রধর্মের প্রশ্নে তারা এখন নির্বিকার। বিএনপির নীরবতা বোধগম্য। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগের নীরবতা পীড়াদায়ক।
আশার আলো জ্বেলে দেয় ২০১০ সালে সর্বোচ্চ আদালতের একটি রায়। এই রায়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল ঘোষিত হয়। এর ফলে ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনরুজ্জীবনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সেই রায়ের আলোকে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃস্থাপিত হলেও সংবিধান ধর্মীয় ছাপমুক্ত হয় না। তবে সংবিধানে থেকে যায় রাষ্ট্রধর্ম বিধানও। স্বাধীনতার ৫০ বছরে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে নির্বাসিত ও বিকৃত করা হয়েছে। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম সংযোজিত হওয়ার পর বাংলাদেশকে কি আর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র দাবি করা যায়? আবার ধর্মনিরপেক্ষতা প্রত্যাবর্তনের পর আর ধর্মরাষ্ট্রও বলা যায় না।
সমাজতন্ত্র এখন সংবিধানের 'অলংকার' মাত্র। খোলাবাজার নীতির কাছে সমাজতন্ত্র দূরের কথা, পরিকল্পিত অর্থনীতির ভাবনাও পরিত্যাজ্য। সংবিধানে ১৩ অনুচ্ছেদে সম্পদের তিন ধরনের মালিকানার কথা রয়েছে। প্রথমত রাষ্ট্রীয় মালিকানা, দ্বিতীয়ত সমবায় এবং তৃতীয়ত ব্যক্তিগত মালিকানা। ধনীকে আরও ধনী করার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় মালিকানা বিলুপ্তপ্রায়, সমবায় মালিকানাও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত।
একমাত্র রাষ্ট্রীয় মূলনীতি 'গণতন্ত্র'কে কখনও নির্বাসনে পাঠানো হয়নি বা গণতন্ত্রের আগে বা পরে কোনো বিশেষণ বসিয়ে দেওয়া হয়নি। এর মানে এই নয়, সংবিধানে গণতন্ত্র অক্ষত রয়েছে। সংবিধানে কাঁচিতে সংবিধানের গণতান্ত্রিক বিধিবিধানসমূহ ক্ষতবিক্ষত-রক্তাক্ত। বিভিন্ন সংশোধনী হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থের রক্ষাকবচ।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়েছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটেছে। স্বল্পোন্নত দেশের চৌহদ্দি পেরিয়েছে। নানা সামাজিক সূচকে সাফল্য রয়েছে। কিন্তু যে চার স্তম্ভের ওপর রাষ্ট্র দণ্ডায়মান, তা অকার্যকর রেখে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো কতটুকু সম্ভব, সে প্রশ্ন আজ সংগত।
লেখক
মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও লেখক