আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি আমরা। স্বাধীন দেশের স্বাধীন জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য অন্যরকম এক ভালো লাগা, আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের সেরা মুহূর্ত। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীন মানচিত্র পেয়েছি, সেখানে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন বুনে যাব, মেতে উঠব সৃষ্টি সুখের উল্লাসে- এটাই ছিল চাওয়া। তাই স্বাধীনতা-উত্তর শিল্প-সাহিত্য চর্চায় নিরলস কাজ করে গেছি একদল নাট্যপ্রেমী। আজ যারা খ্যাতিমান শিল্পী, নাট্যকার, নির্দেশক- তাদের অনেকেই ছিলেন সে দলে। তাই শুরু থেকে আমাদের প্রত্যয় ছিল, মঞ্চ নাটকে স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলা। কারণ বাহাত্তরে আমরা যারা মঞ্চ নাটকের সংস্কার সাধনে কাজ করেছি, তাদের বেশিরভাগই উঠে এসেছিল একাত্তরের যুদ্ধের ময়দান থেকে। যে কারণে বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় গ্রুপ থিয়েটার গঠনেও খুব একটা সময় লাগেনি। কারণ ধীরে ধীরে একের পর এক নাট্যদলের জন্ম আমাদের যাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছিল। তাই ঢাকার মঞ্চে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের জোয়ার বইতেও খুব একটা সময় লাগেনি। কিন্তু এতকিছুর পরও যে লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করে গেছি, সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছি কি? একসময় এ প্রশ্নই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই প্রশ্ন প্রথম মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সামরিক সরকারের হাতে দেশের শাসন ন্যস্ত হওয়ার পর।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যখন একবুক স্বপ্ন নিয়ে আমরা মঞ্চে কাজ করে যাচ্ছিলাম, সেই স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সামরিক শাসনের যুগ শুরু হওয়ার পর। তারপরও আমরা দমে যাইনি। কোনো এক সময় গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হবে এবং শিল্প-সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা শুরু হবে- এই আশায় দিন গুনে গেছি। এরপর যখন কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি, তখন আমরা মাঠে নেমেছি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। দশ বছর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর আমরা স্ব্বৈর সরকারের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর এটা ছিল আমাদের দ্বিতীয় বিজয়। যা আমাদের নাট্যাঙ্গনের মানুষদের আরও একবার আশায় বুক বাধতে প্রেরণা জুগিয়েছে।
নব্বই দশকে স্বৈর শাসকের পতন আর গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের পর আরও একবার আশার পালে হাওয়া লেগেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ছাড়া নাট্যাঙ্গনে উন্নয়ন মোটেও চোখে পড়ার মতো ছিল না। স্বাধীনতার এই সুবর্ণ সময়ে এসেও আমরা দেখি, একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে পড়ে আছি। দুই কোটির অধিক মানুষের যে শহরে বসবাস, তাদের নাটক দেখার জন্য একই জায়গায় ঘুরেফিরে যেতে হচ্ছে। গুলশান, মিরপুর, উত্তরার মতো জায়গায় নেই কোনো নাট্যমঞ্চ। রাজধানীর বাইরে যদি নজর দিই, সেখানকার চিত্র আরও করুণ হয়ে ধরা দেয়। একসময় ব্যক্তি উদ্যোগে জেলা ও বিভিন্ন থানায় যত মঞ্চ নাটকের আয়োজন চোখে পড়ত, এখন তা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এর জন্য আমি জেলা শিল্পকলা একাডেমিকে দায়ী করতে চাই। বলা যায়, জেলা শিল্পকলা একাডেমিই ব্যক্তি উদ্যোগের মঞ্চের আয়োজনগুলোকে গ্রাস করেছে। তাই এখনই যদি এর সমাধান না হয়, তাহলে জেলা পর্যায়ে মঞ্চের সব আয়োজন মুখ থুবড়ে পড়বে। তারপরও আমি মনে করি, সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাবে। সেই আশা আছে বলেই এখনও নতুন দিনের স্বপ্ন রচনা করতে পারি।


মঞ্চ নিয়ে যেমন কিছুটা হতাশা আছে, তেমনি টিভি নাটকের মানোন্নয়ন নিয়ে হতাশা কাজ করে। প্যাকেজ যুগ শুরু হওয়ার পর যেমন নাটকের সংখ্যা বেড়েছে, তেমনি মানের অবনমন ঘটেছে ব্যাপকভাবে। খ্যাতির মোহ এর বড় কারণ। অভিনয় তো শুধু খ্যাতির জন্য নয়, আত্মার খোরাক জোটাতেই এর সঙ্গে বহু মানুষ নিবেদিত থাকেন। তাই অভিনয়কে নিয়ে যেতে হয় সাধনার পর্যায়ে। কিন্তু এই সত্যটা ক'জন মানছে, সেটাও দেখার বিষয়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন কিছু আমরা করব, কিন্তু তা করতে গিয়ে কী করছে, সেটা যাচাই করে দেখা হচ্ছে না। তাই বেশিরভাগ টিভি নাটকেই দেখি স্থূল চিন্তার ছড়াছড়ি। মিডিয়া প্রসারিত হচ্ছে, অথচ মনে দাগ কাটার মতো কাজ ক'টি সেটাই বড় প্রশ্ন। এর বাইরেও টিভি নাটকে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ ছিল বিভিন্ন সময়। তা নিয়ে শোরগোলও হয়েছে অনেক। এখন কথা হলো, আমাদের কাজ যদি এত প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে মানের উন্নয়নের আশা অলীক স্বপ্নের মতো। তাই ভালো কিছু করে দেখানোর মানসিকতা যদি থাকে, তাহলে সবার আগে সরে আসতে হবে বাণিজ্যিক চিন্তাধারা থেকে। শিল্পের উৎকর্ষ তুলে ধরতে এর বিকল্প নেই।
আমরা কেন হতাশ হবো? যখন দেখছি, স্বাধীন দেশে পাঁচ দশকের পরিক্রমায় উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে- তখন তো বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই নিজেদের চেনাতে হবে। সেই কবে বেগম রোকেয়া বলেছিলেন, অবগুণ্ঠনে ঢাকা নারীদের বেরিয়ে আসতে হবে। তাহলেই আসবে তাদের প্রকৃত স্বাধীনতা। এই প্রমাণ মিলতেও সময় লাগেনি। নারী পর্দা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে, নিজের সক্ষমতা প্রমাণও করেছে। আজ গার্মেন্টসহ নানা মাধ্যমে তারা কাজের সাফল্য দিয়ে নিয়ে গেছে পুরুষের সমতায়। নারী শক্তির হাত ধরে দেশের রেমিট্যান্স বেড়েছে। এতে প্রমাণ হয়, কোনো শক্তিকে দমিয়ে রাখতে চাইলে নিজেদেরই পিছিয়ে পড়তে হয়। এ কথা নাট্যাঙ্গনেও প্রযোজ্য। নাটকের মানুষদেরও অবগুণ্ঠন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। মেধার বিকাশ, সৃষ্টির উৎকর্ষ তুলে ধরার মধ্য দিয়ে শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে। বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেওয়া যাবে, আমরাও কোনোভাবে পিছিয়ে নেই। নইলে একদল ধর্মান্ধ যেমন নারী শক্তিকে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চাইছে, সেভাবেই ঢাকা পড়ে থাকবে আমাদের শিল্পের সম্ভাবনা। কিন্তু কষ্টের বিষয় এটাই যে, প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে যারা আওয়াজ তুলবে বলে আমাদের ধারণা, তাদের অনেকেই নীরব।
সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে- এ কথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার কেউ যে নেই, তা কিন্তু নয়। যাদের কণ্ঠে প্রতিবাদী স্বর উঠে আসবে বলে আমরা আশা করি, তাদের অনেকে নীরব থাকলেও তরুণ প্রজন্ম চুপচাপ বসে থাকার পাত্র নয়। আমি বেশ কিছুদিন ধরেই দেখছি, তরুণদের হাতে আশার মশাল উঠে এসেছে। যারা নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে এতটুকু দ্বিধা করছে না। এই তরুণের দল মেধা-মননে সময়কে যেমন জয় করেছে, তেমনি বিশ্বজুড়ে নিজেদের সংযোগ তৈরি করে যাচ্ছে। একইভাবে জরাজীর্ণ সমাজকে নতুন করে গড়ার প্রত্যয় দেখা যাচ্ছে তাদের মাঝে। এরাই আমাদের আলোর পথ দেখাবে, যদি না তাদের আমরা ভিনদেশে স্থায়ী হতে দিই। আসুন স্বাধীনতার এই সুবর্ণ সময়ে আমরা তরুণ প্রজন্মের পাশে দাঁড়াই, তাদের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে এই দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাই।
লেখক
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
প্রাবন্ধিক