কেনিয়া-তানজানিয়াতে যাত্রা শুরু নাইরোবি থেকে। এখান থেকেই কেনিয়ার মাসাই মারা হয়ে তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটি আর গরংগোরো। লিখেছেন রেজাউল বাহার
পূর্ব আফ্রিকার কেনিয়া-তানজানিয়াতে আমাদের যাত্রা শুরু নাইরোবি থেকে। এখন থেকেই কেনিয়ার মাসাই মারা হয়ে তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটি আর গরংগোরো। ফিরে আসা তানজানিয়ার কিলিমাঞ্জারো থেকে। অনেক দিনের প্ল্যান, ৯ দিনের এই ট্রিপটা ঠিক হলো সেন্সটুয়ারি রিট্রাইটসের সঙ্গে। ওদেরই বাংলো আর টেন্টে কাটবে আমাদের দিনগুলো।
কেনিয়ার নাইরোবিতে নেমে এক রাত হোটেল, পরদিনই অভ্যন্তরীণ উইলসন এয়ারপোর্ট থেকে খুব ছোট এক প্লেনে আমাদের যেতে হবে মাসাই মারার কিচওয়া টাম্বো এয়ারস্ট্রিপে। এরপর বাকি ট্রাভেলটা হবে ছোট ছোট প্লেনে। কিচওয়া টাম্বো এয়ারস্ট্রিপে আমাদের জন্য অপেক্ষায় আছে নেলসন, সেই ড্রাইভার এবং ট্যুর গাইড। আগামী চার দিন আমরা থাকব মারা নদীর পাশে বাংলোতে। বাংলোর গা ঘেঁষে বয়ে গেছে মারা নদী। কুমির আর জলহস্তীর আনাগোনা এখানে। তবে এই এলাকায় জলহস্তীর সংখ্যাটাই বেশি। প্রতিদিন সকালে এখানে ঘুম ভাঙে জলহস্তীর ডাকে। এরা রাতে খাবার সন্ধানে বের হয়, ফিরে আসে সকাল হওয়ার আগেই। সারাদিন পানিতেই এদের অবস্থান। মারা ন্যাশনাল রিজার্ভ ১ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার। এখানকার আদিবাসীরা মাসাই নামে পরিচিত। বন্যপ্রাণী রক্ষায় তাদের সরে যেতে হয়েছে মারা রিজার্ভের বাইরে। একসময় তারাও শিকার করত বন্যপ্রাণী, এখন তা বন্ধ হয়েছে। মারা এলাকা হলো বিস্তীর্ণ খোলা অভয়ারণ্য, মাঝেমধ্যে কিছু হিলি জায়গা, ছড়ানো-ছিটানো কিছু বড় গাছ। অনেক বেশি বড় গাছ না থাকার মূল কারণ হাতি, এরা গাছ উপড়ে ফেলে। জিরাফ গাছের নিচ থেকে পাতা খেয়ে খেয়ে গাছের আকৃতি তৈরি করে ফেলে ছাতার মতো। বেশ আগে মানুষ খেলার নামে শিকার করত পাঁচটি প্রাণী। সিংহ, লেপার্ড, হাতি, গন্ডার আর বন মহিষ। অনেকটা ট্রফি জেতার খেলা, নাম বিগ ফাইভ গেম ড্রাইভ। এখনও ট্যুরিজমের জন্য সাফারিতে বের হলে বলা হয় গেম ড্রাইভ, খুঁজে খুঁজে বের করা হয় বিগ ফাইভ অ্যানিম্যালস। প্রায় ৯০টির বেশি ল্যান্ড অ্যানিম্যাল আছে মাসাই আর সেরেঙ্গেটিতে। মাসাই আর সেরেঙ্গেটি মূলত একই বিস্তীর্ণ ভূমি, দুটো দেশের সীমানার কারণে কেনিয়ার অংশটুকু মাসাই মারা, তানজানিয়ার অংশের নাম সেরেঙ্গেটি। সেরেঙ্গেটি শব্দের মূল অর্থ সীমাহীন বিস্তীর্ণ ভূমি। এখানে না এলে বোঝার উপায় নেই সেই বিশালতার মূল অর্থ। যতদূর চোখ যায় শুধু ঘাস আর ঘাস, মাঝেমধ্যে দু-একটা বড় গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। সেরেঙ্গেটি মূলত মাসাই মারার ২০ গুণ। পৃথিবীতে কিছু বন্য প্রাণী এখন বিলুপ্তির পথে। কিছু প্রাণী যার থাকার জন্য প্রয়োজন সীমাহীন এলাকা। চিতা এমনই একটি প্রাণী, প্রতিটা চিতার জন্য প্রয়োজন প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার জায়গা। এতটা জায়গা কি মানুষ করে দেবে? মারা-সেরেঙ্গেটিতে ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটারে এখন চিতা বাকি আছে মাত্র ৩০০টি। এদের দেখা যেমন বিরল, এদের শিকার করতে বের হওয়া স্বচক্ষে দেখা লটারি জেতার মতো ভাগ্যের ব্যাপার। এমন বিরল ঘটনা ঘটে গেছে আমাদেরই চোখের সামনে। চিতার হরিণ (গ্যাজেল যার নাম) শিকার ক্যামেরায় বন্দি করার বিরল সৌভাগ্য আমাদের এই ট্রিপে। বিগ ফাইভসহ অগণিত প্রাণী ঘুরে ঘুরে দেখাই ছিল ট্রিপের মূল উদ্দেশ্য। খোলা গাড়িতে আমি, শারমিন (আমার স্ত্রী), সঙ্গে নেলসন (গাইড/ড্রাইভার) সারাদিন মাসাই মারা ঘুরে বেড়ানো, কোথায় খালি জায়গা দেখে কোনো এক গাছের নিচে দুপুরের লাঞ্চ অথবা ব্রেকে এক কাপ কফি মারার সেই সময় আর অনুভূতি থাকুক সেখানেই। শব্দে বা ছবিতে তাকে ঘরের বসার রুমে নিয়ে আসা অসম্ভব। এ মাসাই মারাতেই চার দিনের গেম ড্রাইভে আমরা। পুরো ভ্রমণে অগণিত পশুপাখির সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছে আমাদের। খুব কাছ থেকে হয়তো ১০ ফুটের মধ্যে বসে থেকেই দেখা গেছে সিংহের দল, হাতি, জিরাফ, জেব্রা, জলহস্তী। চিতা আর লেপার্ড- এ দুই প্রাণী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। লুকিয়ে থাকে, বের হয় শুধু খাবারের সন্ধানে। মাসাই মারা থেকে আবারও প্লেনে করে চলে গেলাম তানজানিয়ার বর্ডারের কাছাকাছি। বন্যপ্রাণীদের নিজস্ব ভূমিতে কিছুদিন থেকে খুব কাছ থেকে দেখা তাদের, মাসাইদের গ্রামে মানুষের জীবন ছুঁয়ে আসা, ক্ষুধার্ত চিতার বুলেটের মতো ছুটে বেড়ানো, অসহায় হরিণের প্রাণে বাঁচার শেষ চেষ্টা- এসবই অনেকটা কল্পনার মতো মনে হয়। মনে হয়, স্বপ্নে ঘুরে আসা এক জগৎ। া ছবি :লেখক