কালাইহাটা গ্রামে প্রবেশের মুখেই কতগুলো দোকান চোখে পড়ে। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বাঙালি নদী তীরবর্তী ওই এলাকা ওঠা বাজারটির নাম ‘আনন্দবাজার’। অন্যদিন সূর্যোদয়ের পর পরই সেখানকার চায়ের দোকানগুলোতে মানুষের আনা-গোনা শুরু হয়। নির্বাচনের পর দিন ওই দোকানগুলোতে মানুষের ভিড়ে ঠাসা থাকার কথা। কিন্তু বৃহস্পতিবার উল্টো চিত্র দেখা গেল। সকাল ৯টার পরেও ওই বাজারের দোকানগুলো খোলেনি। 

‘আনন্দবাজার’ থেকে উত্তর দিকে চলে যাওয়া গলির ভেতর দিয়ে একটু এগুতেই ২০০ হাতের ব্যবধানে থাকা দু’টি বাঁশ ঝাড় থেকে বাঁশ কাটার শব্দ কানে আসে। তার কিছুটা দূরেই চলছে কবর খোঁড়ার প্রস্তুতি। কথা বলে জানা গেল, কুলসুম বেগম আর আলমগীরের মরদেহ দাফনের জন্য বাঁশ কাটা আর কবর খোঁড়া হচ্ছে। বুধবার রাতে স্থানীয় কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট গণনাকালে সংঘর্ষে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) গুলিতে যে ৪জন নিহত হন তাদের মধ্যে রিকশা চালক  আলমগীর (৩৫) এবং গৃহবধু কুলসুম বেগমও (৪৮) ছিলেন। যে স্থানে তাদের কবর খোঁড়া হচ্ছে তা থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে ততক্ষণে নিহত অপর দু’জন যথাক্রমে সবজি বিক্রেতা খোরশেদ আকন্দের (৭০) এবং কৃষক আব্দুর রশিদের (৬০) কবর খোঁড়া সম্পন্ন হয়ে গেছে। 

স্বজনরা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে নারী-পুরুষরা দলে দলে আসছেন নিহত ৪ জনের বাড়িতে। শোকার্ত পরিবারের সদস্যদের শান্তনা জানাতে গিয়ে অনেকে নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না।

রিকশা চালক আলমগীরের স্ত্রী হোসনে আরার কিছুদিন আগে টিউমারের অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। স্বামীকে হারানোর কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তার কথাগুলো যেন আটকে আসছিল। তিনি বলছিলেন,  ‘ইশ্, যদি তার (স্বামী আলমগীরের) একটা পা কিংবা হাত ভাঙতো তবুও তো সে জীবিত থাকতো! আমাদের দেখতো। কিন্তু তাকে তো বাঁচতে দেওয়া হলো না। এখন আমাকে আর আমার মেয়েকে কে দেখবে?’

প্রতিবেশীরা জানান, আলমগীর বগুড়া শহরে রিকশা চালান। শহরের কৈপাড়া এলাকায় স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি। ভোট দিতেই গত ৪ জানুয়ারি বাড়ি এসেছিলেন তিনি।

ওদিকে মেয়ে কুলসুমকে হারিয়ে পাগলপ্রায় তার মা মনোয়ারা বেওয়া। গ্রামের পথে পথে উদভ্রান্তের মতো ঘুরছেন আর বলছেন, ‘আমি বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে আমার মেয়েকে বড় করেছি... আমার মেয়েও খুব কষ্ট করে সংসার করছিল। ওরা ক্যান আমার মেয়েকে গুলি করে মারলো?’ তার প্রশ্নে সবাই নিরুত্তর।

বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কালাইহাটা এলাকায় অবস্থানকালে কোন পুলিশের কোন উপস্থিতি চোখে পড়েনি।

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বালিয়াদীঘি ইউনিয়নের কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বুধবার বিকেলে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী ইউনুস আলী ফকিরের সমর্থকরা ‘যথাযথ গণনা’ নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন। তারা ওই কেন্দ্রের ভোট ইউনিয়নের অপর ৮টি কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার পর গণনার জন্য দাবি জানাতে থাকেন। কিন্তু নিয়ম না থাকায় নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ তা অগ্রাহ্য করে ওই বিদ্যালয়ের ২ নম্বর কক্ষে ভোট গণনা কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় তাদের সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। এ সময় খবর রটে যে, ওই কেন্দ্রের ভোট গণনার জন্য ব্যালট পেপারগুলো গাবতলী উপজেলা পরিষদে নিয়ে যাওয়া হাচ্ছে। এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নৌকা মার্কার সমর্থক কয়েক শ’ নারী-পুরুষ সন্ধ্যার দিকে কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ঘেরাও করেন। এতে সীমানা প্রাচীর বিহীন ওই বিদ্যালয়ের একটি কক্ষের ভেতরে নির্বাচনী  কর্মকর্তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। 

এক পর্যায়ে নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা অবরুদ্ধ নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কক্ষ লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল মারতে শুরু করেন। তাদের নিক্ষিপ্ত ইটের আঘাতে ওই কেন্দ্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনকারী শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আহমেদ এবং বিজিবির গাড়িসহ বেশ কয়েকটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে জানমাল রক্ষার্থে উপস্থিত বিজিবি সদস্যরা গুলি বর্ষণ করে। এতে এক নারীসহ ৭জন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে স্থানীয় এক নারী ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্ট কুলসুম বেগম, রিকশা চালক মামুন ও কৃষক আব্দুর রশিদ ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে খোরশেদ আলমের মৃত্যু হয়।

গুলিবিদ্ধ অপর তিনজন রাকিব (১৫), আব্দুল্লাহ্ (৪৫) ও ছহির উদ্দিনকে (৬০) বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এলাকাবাসী যা বলছেন

কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সৃষ্ট সংঘাতময় পরিস্থিতি এবং গুলিতে ৪টি প্রাণহানির জন্য এলাকাবাসী ওই কেন্দ্রে ম্যাজিস্ট্রেটের দাািয়ত্বপালনকারী বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আহমেদকে দায়ী করেছেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জামানের অভিযোগ, যেহেতু ২০১৬ সালের নির্বাচনে কালাইহাটা কেন্দ্রের ভোট গাবতলী উপজেলা পরিষদে গণনা করা হয়েছিল এবং ওই ভোটে এবারের বিজয়ী নৌকা প্রতীকের ইউনুস আলী ফকির সামান্য ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন সেহেতু এলাকাবাসী মনে করেন যে, সেবার কেন্দ্রের বাইরে ভোট গণনার মাধ্যমে নৌকার প্রার্থী ইউনুস আলীকে জালিয়াতির মাধ্যমে পরাজিত করা হয়েছিল। অতীতের ওই ঘটনার কারণে এবার কালাইহাটা কেন্দ্রের ভোট গণনা নিয়ে ভোটারদের মনে শুরু থেকেই সন্দেহ ছিল। এটা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আসিফ আহমেদকে জানতে হতো এবং জনগণের সেই সন্দেহ দূর করার জন্য তাকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নিতে হতো।

ইউনুস আলী বলেন, ‘কিন্তু আসিফ আহমেদ তা না করে এমনকি জনগণের আস্থা বাড়ানোর জন্য তিনি আমাকেসহ স্থানীয় পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধাকে ভোট কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকের মত রাখলেও শেষ মুহূর্তে জনগণের মনোভাব না বুঝে আমাদের কোন পরামর্শ না নিয়েই তিনি বিজিবিকে গুলি করতে নির্দেশ দেন।’

ওই কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের এজেন্ট রমিছা বেওয়া অভিযোগ করেন, আসিফ আহমেদ শুরু থেকেই নৌকা প্রতীকের এজেন্টদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছিলেন। তিনি বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেট আসিফ আমাকেসহ নৌকার অন্তত ৩জন এজেন্টকে কয়েকবার কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছেন। তিনি বার বার মেজাজ হারিয়ে ফেলছিলেন।’

চান মিয়া নামে এক অপর এক ব্যক্তির অভিযোগ, ‘শাজাহানপুর উপজেলার ইউএনও আসিফ আহমেদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়েছে তিনি স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী সাকিউল ইসলাম তিতুর পক্ষাবলম্বনের চেষ্টা করেছেন।’

অবশ্য শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আহমেদ তার বিরুদ্ধে  উত্থাপিত অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তিনি ওই ঘটনার আগে ও পরে কয়েকটি ভিডিও এই প্রতিবেদকের হোয়াটস্ অ্যাপে দিয়ে বলেন, ‘আপনারা ভিডিওগুলো দেখুন। তাহলেই সত্যিটা বুঝতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমি নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীর উপস্থিতিতে জনগণকে এই বলে বার বার আশ্বস্ত করেছি যে, নির্বাচন যেমন সুষ্ঠু হয়েছে তেমনি ভোট গণনাও সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু তারা সেগুলো না শুনে হঠাৎ করেই আমাদের লক্ষ্য করে বৃষ্টির মত ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করেন।’

এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষালম্বনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ যে প্রার্থীর কথা বলা হচ্ছে তাকে আমি চিনি না। বরং ওই প্রার্থী সকাল ১০টার দিকে যখন দুই সাংবাদিকদের সঙ্গে মোটর সাইকেলে ভোট কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিলেন তখন আমি একজন প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় দুই সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ কার্ড বাতিল করতে গাবতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেছিলাম।’

কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের রিটার্নিং কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানিয়েছেন, ভোট গণনার ক্ষেত্রে সেখানকার কিছু ভোটাররাই বার বার সমস্যা সৃষ্টি করেছিল।

তিনি বলেন, বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার মধ্যে কালাইহাটা কেন্দ্রের প্রায় সিংহভাগ ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। তারপরেও যাদের ভোট দেওয়া বাকি ছিল স্থানীয় লোকজন তাদের বাাড়ি থেকে ডেকে এনে ভোট কেন্দ্রে এনেছেন। তিনি বলেন, আমরা বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ করি। এরপর যখন ভোট গণনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখন স্থানীয় একদল মানুষ এসে বলে যে, এই কেন্দ্রের ভোট অন্য ৮টি কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার পর গণনা করতে হবে। কিন্তু এটা করা সম্ভব নয় বলে নির্বাহী ম্যাািজস্ট্রেট হিসেবে শাজাহানপুরের ইউএনও আসিফ আহমেদ স্যার তাদের জানিয়ে দেয়। এরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে।’

গুলি করেছে বিজিবি

বগুড়ার জেলা প্রশাসক মোঃ জিয়াউল হক বৃহস্পতিবার সমকালকে বলেছেন, ‘জানমাল রক্ষার্থে কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিজিবি ফায়ার ওপেন করেছে।’ ওই ঘটনা নিয়ে কোন তদন্ত হবে কি’না তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী আগে বিজিবির রিপোর্ট আসতে হবে। এরপর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

এদিকে নিহত ৪জনের সুরতহাল করার সময় উপস্থিত জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিপন বিশ্বাস জানান, সুরতহাল করার সময় এটা জানা গেছে যে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণেই ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আরও বিস্তারিত জানতে হলে আমাদেরকে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

বিদ্যালয় বন্ধ

বুধবার রাতে বৃষ্টির মত নিক্ষিপ্ত ইট-পাটকেলের আঘাতে কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং তার পাশের কক্ষের দরজা ও জানা ভেঙ্গে গেছে। ভেতরের আসবাবপত্রগুলোও নষ্ট হয়েছে।

প্রধান শিক্ষক ইউসুফ আলী জানান, দরজা-জানালা ভাঙ্গা ছাড়াও। পুরো মাঠ জুড়ে ইটের বড় বড় টুকরো পড়ে আছে। পুরো ঘটনায় এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ। যে কারণে কারণে আমরা মাঠের ইটগুলো পরিস্কারও করতে পারছি না। আমরা শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে এলেও ২৮০জন শিক্ষার্থীর কেউ আসেনি।

কবে নাগাদ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হবে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। কর্তৃপক্ষ যেভাবে বলবেন আমরা সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিব।’

মামলা হয়নি এখনও

বুধবার রাতে কালাইহাটা কেন্দ্রে সৃষ্ট সহিংস ঘটনায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কোন মামলা হয়নি। গাবতলী থানার সাব ইন্সপেক্টর সুব্রত সাহা জানান, ওই কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার গাবতলী উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জাকির হোসেন মামলা করার জন্য থানায় এসেছেন। এখনও মামলা হয়নি।’