রাইশর্ষের খেত সকালে উজ্জ্বল হলো- 'দুপুরে বিবর্ণ হ'য়ে গেল/তারি পাশে নদী;/নদী, তুমি কোন কথা কও?/অশ্বত্থের ডালাপালা তোমার বুকের 'পরে পড়েছে যে,/জামের ছায়ায় তুমি নীল হ'লে,/আরো দূরে চলে যাই/সেই শব্দ সেই শব্দ পিছে-পিছে আসে; নদী না কি?/নদী, তুমি কোন কথা কও?' জীবনানন্দ দাশের এই পঙক্তিমালার মতো নদী নিয়ে কত কবিতা, কত গান রচিত হয়েছে। নদী প্রকৃতির একটি প্রধান উপাদান। কবি-সাহিত্যিকরা নদী নিয়ে লিখতেই বেশি পছন্দ করেন। আর নদী ভালোবাসে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর। কিন্তু নদীর রুদ্ররূপ অনেকেরই দুঃখের কারণ হয়ে ওঠে। যেমন এ সময়টাতে রাজবাড়ীতে নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতঘর, জমি-জিরেত। ভাঙনে মানুষের দীর্ঘশ্বাস শুধুই বাড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে রাজবাড়ী সুহৃদ সমাবেশ আয়োজন করেছিল নৌযাত্রার। আনন্দ আয়োজনের সঙ্গে দাবি ছিল নদী রক্ষারও। যে কোনোভাবে যেন পদ্মার ভাঙনরোধ করে মানুষের দীর্ঘশ্বাস নামিয়ে আনা হয়। বিকেল সাড়ে ৪টায় সদর উপজেলার সোনাকান্দার মৌলভীঘাট থেকে শুরু হয় নৌযাত্রা।

নদীর ওপারে গ্রামটির নাম চরমৌকুড়ি। নৌকায় যেতে সময় লেগেছে ২৫ মিনিট। নদীতীরে ফসলি জমি। এরপরেই মেঠোপথ, রয়েছে ছোট ছোট দোকান ও বসতঘর। সেখানে নৌকা থামতেই নেমে পড়ে সবাই। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ছুটে বেড়ানো। যেন আজ আমাদের ছুটিও ভাই আজ আমাদের ছুটি। কারও হাতে ডিএসএলআর, কারও সাইবার শট। আর অ্যান্ড্রয়েট তো আছেই। ছবি তুলে কারও যেন তৃপ্তি মেটে না। গ্রামের মানুষ কত সহজ-সরল। সেইসব মানুষের সঙ্গে মিশে যায় সবাই। নদীতীরে সমানে গান গেয়ে বিনোদন দিয়ে চলেছেন শিল্পী সুমন আহমেদ, আব্দুল জব্বার ও সোমা কর্মকার। তাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আনন্দিত অনেকেই। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে, তবুও ফিরতে কারও মন চায় না। মাইকিং করে সবাইকে তুলে নিতে হয় নৌকায়। নৌকার এবারের গন্তব্যহীন যাত্রা। নৌকা ছুটে চলে গোধূলিবেলা পার হয়। ঢেউয়ের তালে নৌকায় চলছে আনন্দ, আড্ডা, গান-বাজনা। সময় পেরিয়ে গেছে অনেকটা।

ক্লান্ত অবসন্ন সবার একটু বিরতি প্রয়োজন। খিচুড়ি ভোজন পর্ব চলছে। নৌকা কিন্তু থেমে নেই। চলতে চলতে অনেক দূর গেছে সুহৃদদের নৌকা। ভোজনপর্ব শেষে আবার মান্না দের বিখ্যাত গান 'কফি হাউসের আড্ডা'। শিল্পী সুমন আহমেদের সঙ্গে গলা মেলায় সবাই। শেষে গিয়ে সবাই খেই হারালেও ছোট্ট অর্ণব পুরোপুরি গেয়ে যায় গানটি। এবার সত্যিকার অর্থেই ফেরার পালা। কিন্তু এভাবে ফিরলে হবে? আছে ভাগ্য পরীক্ষা। নৌযাত্রার শুরুতে নদী রক্ষার দাবিতে যে লিফলেটটি সবার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেটির নম্বরের ভিত্তিতেই চলছে ভাগ্য পরীক্ষা। নাম্বার তুলছে ছোট্ট ঐতিহ্য। একেক করে ১৯টি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ আকর্ষণীয় পুরস্কারটি পেলেন কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু। এই পর্ব পরিচালনা করেন রাজবাড়ী সুহৃদ সমাবেশের সভাপতি আহসান হাবীব। যাদের পুরস্কার মিলল তারা তো খুশিই, এর সঙ্গে এ আনন্দ আয়োজনে খুশি সবাই।

আয়োজনে অংশ নেন- রাজবাড়ীর সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও রাজবাড়ী সুহৃদ সমাবেশের উপদেষ্টা সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান, সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান, উপদেষ্টা মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ, রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আব্দুল হামিদ, ফরিদপুর চিনিকলের অবসরপ্রাপ্ত এমডি কমল কান্তি সরকার, কবি খোকন মাহমুদ, কবি নেহাল আহমেদ, কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু, রাজবাড়ী সুহৃদ সমাবেশের সভাপতি আহসান হাবীব, সাধারণ সম্পাদক কাজী তামান্না, যুগ্ম সম্পাদক সৌরভ বিশ্বাস, সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল রবি, সাংস্কৃতিক ও বিনোদন সম্পাদক খাদিজা খাতুন, সহ-সাংস্কৃতিক ও বিনোদন সম্পাদক এবি সিদ্দিক, অর্থ ও দপ্তর সম্পাদক পরিমল বিশ্বাস, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক রিমন হোসেন, সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিলন শেখ, বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক প্রদীপ বিশ্বাস, সমাজকল্যাণ সম্পাদক আরিফুর রহমান আলিম ও তার পরিবার, সহ-সমাজকল্যাণ সম্পাদক মোবারক হোসেন, আপ্যায়ন ও ক্রীড়া সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নয়ন, সহ-নারীবিষয়ক সম্পাদক শ্রাবণী খান, কার্যনির্বাহী সদস্য নাজমুল হোসেন, সুমনা আক্তার, রায়হান, টুশি বিশ্বাস ও প্রান্ত। অতিথি হিসেবে ছিলেন অ্যাক্রোবেট প্রশিক্ষক সঞ্জয় ভৌমিক, তানজিলা আক্তার, স্মৃতি ইসলাম, আফরোজা হাসান তুলি, রাজবাড়ী জেলা রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি লিটন চক্রবর্তী, সাংবাদিক শামীমা রেজা, সুকান্ত, শুভ প্রমুখ।

রাজবাড়ী প্রতিনিধি

মন্তব্য করুন