সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ

আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড চ্যালেঞ্জ ২০২০

প্রস্তুত টিম বাংলাদেশ

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২০

মার্চে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হলে বিডিবিও-সমকাল বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান উৎসবের আঞ্চলিক পর্ব স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে জাপানের নাগাসাকিতে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড (আইবিও) ২০২০ বন্ধ ঘোষণা করা হলে উৎসব নিয়ে একটি অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে অনলাইনে প্রতিযোগিতা করার সিদ্ধান্ত হলে আবারও পুরোদমে শুরু হয় উৎসব কার্যক্রম। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা শেষে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেয় হাজারো শিক্ষার্থী। জাতীয় পর্বে বিজয়ীদের নিয়ে তিন দিনের ভার্চুয়াল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। ক্যাম্প শেষে এসএফএক্স গ্রিনহেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের তাসনিম বিনতে জুলফিকার, দি আগা খান স্কুলের রাফসান রহমান রায়ান, রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের রাদ শারার এবং সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থী আবরার জামিল নির্বাচিত হয় চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে। আগামী ১১ ও ১২ আগস্ট জাপানের নাগাসাকিতে অনুষ্ঠিতব্য আইবিও চ্যালেঞ্জে ভার্চুয়ালি দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে 'টিম বাংলাদেশ'। উৎসব আয়োজনে সহযোগী হিসেবে রয়েছে কথাপ্রকাশ, ল্যাববাংলা ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি



এবার দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে

- রাফসান রহমান রায়ান

গত বছর হাঙ্গেরিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে দেশের জন্য একটি ব্রোঞ্জ পদক জয় করেছিলাম। সেই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই আবার এলো জীববিজ্ঞান উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগ। গত বছর থেকেই এ সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। ব্রোঞ্জ জয় আমাকে উৎসাহ জুগিয়েছে দেশের জন্য আরও ভালো কিছু করার। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারির ফলে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে দেশে শুরু হওয়া আঞ্চলিক উৎসব স্থগিত করা হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অনলাইনে সব কার্যক্রম করার সিদ্ধান্ত হলে আবার শুরু হয় উৎসব। আইবিও চ্যালেঞ্জে সশরীরে উপস্থিত না থাকতে পারলেও দেশে বসেই আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের সুযোগ অন্যরকম অভিজ্ঞতা দেবে। তাই আবার প্রস্তুতি শুরু করি। আঞ্চলিক পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়ে জাতীয় পর্যায়ে অবস্থান করে নিই। তখনও ক্যাম্পের জটিল পরীক্ষা বাকি। তাই মনের মধ্যে বরাবরের মতো ভয় ছিল কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় ততটা বেগ পেতে হয়নি। আবারও চারজনের কোর টিমে জায়গা করে নিই।

এবার দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। গতবারের চেয়ে ভালো কিছু যে করতে হবে। দেশকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করতে হবে। ছিনিয়ে আনতে হবে শত মেধাবীর কাছ থেকে বিজয়। এই স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলছি। বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে বসাতে আমাদের পরিশ্রম করে যেতে হবে নিরলসভাবে। এই স্বপ্ন নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই সবার দোয়ায়। ফলাফল যা-ই হোক না কেন, জীববিজ্ঞানের সঙ্গে সবসময় থাকতে চাই। জীববিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে কাজ করতে চাই। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও যাদের নিরলস পরিশ্রম ও মেধায় আয়োজনটি সম্পন্ন হতে চলেছে তাদের জন্য সবসময় শুভ কামনা। বিডিবিও-সমকাল যে প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি করেছে তা হাজারো শিক্ষার্থীকে জীববিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে। তাই যে কোনো পরিস্থিতিতে এই আয়োজন চলমান রাখার অনুরোধ থাকল। া





ভাবতে পারিনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করব

- তাসনিম বিনতে জুলফিকার

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা প্রতিযোগিতায় নিয়মিত চোখ রাখতাম। তবে উৎসব-অলিম্পিয়াড শব্দগুলো শুনলেই আমি কেমন যেন এক ভীতি অনুভব করতাম। ভাবতাম একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে আবার বাড়তি পড়াশোনা! নিছক কৌতূহলবশত ২০১৯ সালের বিডিবিও-বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান উৎসবে নিবন্ধন করেছিলাম। তখন থেকে প্রস্তুতি নিতে নিতে জীববিজ্ঞানের মতো একটা বিষয়ের প্রতি এতটা ভালো লাগা তৈরি হবে বুঝতে পারিনি। বায়োক্যাম্পে অংশগ্রহণ করে বুঝতে পেরেছি জীববিজ্ঞান মুখস্থ করার বিষয় নয়। বিষয়টা সামান্য জটিল হলেও আনন্দদায়ক। এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বুঝতে পেরেছি কোনো কিছুই আমাদের সীমার বাইরে নয়। আমরা চাইলেই যে কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারি। ইচ্ছা, আগ্রহ ও নিষ্ঠা দরকার। করোনার সময় এই প্রতিযোগিতা আমাদের অন্যরকম অভিজ্ঞতা দিয়েছে। সমকাল ও বিডিবিও মাধ্যমে যখন জানতে পারলাম অনলাইনে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে তখন কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম কিন্তু আঞ্চলিক পর্যায় পার করার পর সেই ভয় ভেঙেছে। এ বছর অনেকদিন অপেক্ষা করার পর এ উৎসবে অংশ নিতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে যখন নির্বাচিত হয়েছি তখন আগ্রহ ও প্রচেষ্টা আরও বেড়েছে। ক্যাম্পের দিনগুলোতে আমার জীবনের সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।

করোনাভাইরাসের ফলে সব বন্ধ থাকলেও আমাদের এ যাত্রা চলমান আছে এটা ভেবে অনেক ভালো লাগছে। শীর্ষ চার বিজয়ীর মধ্যে যখন নিজের নাম দেখলাম তখন খুশিতে আত্মহারা হয়েছি। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের হয়ে অংশ নিতে পারব এ কথা কখনও ভাবতে পারিনি। এটি এক অন্যরকম অনুভূতি। আমার পরিবার ও শিক্ষকদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি অনেক। ভার্চুয়াল প্রতিযোগিতা হলেও অনেকের সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়েছে। আয়োজক, সুহৃদ ও এনজাইমদের অনেক ধন্যবাদ। এখন শুধু চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার অপেক্ষায় আছি। া





একটা রোমাঞ্চ কাজ করছে

- রাদ শারার

জীববিজ্ঞান উৎসবে আমি প্রথম অংশ নিই ২০১৮ সালে দশম শ্রেণিতে থাকতে। এর আগেও জাতীয় পর্যায়ে কিছু অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা ছিল, তবে জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আমার কাছে ছিল একেবারে নতুন। বিশেষত আমি আগে যেভাবে জীববিজ্ঞান পড়ে এসেছি, তার তুলনায় নতুন সমস্যা সমাধানের ধাঁচটা ছিল আমার কাছে অনেক মজার। এই ভালো লাগাকে সঙ্গে করে খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই সেবার প্রথম ক্যাম্পে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলাম। ক্যাম্প পেরিয়ে সুযোগ আসে প্রথম এক্সটেনশন ক্যাম্পে অংশগ্রহণের। পরের দুই বছর ছিল জীববিজ্ঞানকে আরও গভীর থেকে জানার, নিজের নতুন সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে আরেকটু বাড়াবার, যার ধারাবাহিকতায় এবার আমি দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছি আন্তর্জাতিকভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আইবিও চ্যালেঞ্জে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচতে পুরো আয়োজনটিই হচ্ছে অনলাইনে। তারপরও আয়োজনটা একটুও অচেনা মনে হচ্ছে না কারণ এবারও অন্যবারের মতো কিছু পরিচিত মুখের দেখা মিলছে। অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার একটা রোমাঞ্চ কাজ করছে। তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে বিশ্ব অঙ্গনে অনেক মেধাবী মুখের দেখা পাওয়ার সুযোগ। এটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় পাওয়া।

আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা থেকে ক্যাম্প পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই জীববিজ্ঞানকে জানার চেষ্টা ও আগ্রহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আমার মতো আরও অনেক শিক্ষার্থীর জীববিজ্ঞানকে আরও গভীরভাবে জানার ও চর্চা করার আগ্রহের সূচনা জীববিজ্ঞান উৎসব থেকেই। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে গিয়ে বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা, নানা রিসোর্স ব্যবহার করা, ক্যাম্পের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। তাছাড়া প্রতিটি নতুন প্রশ্নের সমাধান করাই তো নতুন কিছু শেখার সুযোগ! আমার এই পথ পাড়ি দিতে অনেক বড় ভূমিকা ছিল আমার মা-বাবার এবং শিক্ষকদের। ধন্যবাদ জানাই সমকাল, বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, সুহৃদ, এনজাইম ও প্রশিক্ষকদের; যারা অনবরত উৎসাহ জাগানিয়া হয়ে ছিলেন! া





জাপানে না যাওয়ার  আফসোস রয়ে গেল

- আবরার জামিল

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি অন্য বিষয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ জন্মায়। বাবার চাকরির সুবাদে নিয়মিত বিভিন্ন দেশে বেড়াতে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। যেখানেই যাই সেখান থেকেই পছন্দমতো বই কিনে আনতাম। সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর নিজেকে মেলে ধরার নানা পথ খুলে গেছে। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারি। বছরব্যাপী এসব ক্লাবের সঙ্গে জড়িত থাকায় আমি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক আয়োজনে অংশগ্রহণের সুযোগ ও অনুপ্রেরণা পাই। এ বছর জাতীয় জীববিজ্ঞান উৎসবে অংশগ্রহণ এর অন্যতম। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় ছিলাম। তবে যখন জানতে পারলাম পুরো কার্যক্রমটি অনলাইনে হবে তখন পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু করি।

আঞ্চলিক পর্যায়ে আমি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে জাতীয় পর্বে উত্তীর্ণ হই এবং আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি শুরু করি। যার ফলে আমি 'ভার্চুয়াল বায়োক্যাম্প'-এর জন্য নির্বাচিত হই। তারপর ৩ দিনের প্রশিক্ষণের পর পরীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশ দলের চারজনের একজন নির্বাচিত হই। বায়োক্যাম্প ও জাপানে অনুষ্ঠিতব্য অলিম্পিয়াডে সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারার বিষয়ে জানতে পেরে মন খারাপ হয়। তবুও করোনার কথা ভেবে এবং প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ ও আমার এত দূরে আসা আমাকে অনেকটাই আনন্দিত করে, আগামীতে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি চলছে, আশা করছি ভালো কিছু করার। এত দূর আসার পেছনে আমার প্রিয় শিক্ষক অনিমেষ কুমার সাহার বিশেষ অবদান রয়েছে। স্যারের পাশাপাশি জীববিজ্ঞান উৎসবে অংশগ্রহণে আমার পিতামাতারও রয়েছে অসামান্য উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভালো ফল বয়ে আনার প্রত্যাশায় সবার দোয়া কামনা করছি। া