সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


মুক্ত গদ্য

দিনযাপনের গল্প

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২০      

বাসুদেব খাস্তগীর

চারদিকে সুনসান নীরবতা। আগের সেই কোলাহল এখন আর নেই। রাস্তায়ও লোক চলাচল কম। নিস্তব্ধতা যেন ঘিরে ধরেছে চারদিক। ভয় ও আতঙ্কের একটা সময়। এ রকম সময় জীবনে খুব একটা আসেনি। অদৃশ্য শক্তি যেন সবার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করছে। থেমে গেছে নদীর কলকল ধারা। থেমে গেছে সাগরের কলরোল। সাগরের উদ্দামতা যেন থুবড়ে পড়েছে। হৈচৈহীন আর নিস্তব্ধতায় ঘেরা চারপাশ। জীবনে এমন দৃশ্য কখনও দেখেনি ফজর আলী। কোনোমতে স্বাক্ষর জানা ফজর আলীর সবকিছু নতুন নতুন মনে হয়। কত হরতাল-অবরোধ দেখেছে; কিন্তু চারদিকে এ রকম স্থবিরতা তার আর চোখে পড়েনি। এই তো ক'দিন আগেও তার চারপাশটা মানুষে মানুষে গিজগিজ করা কেমন কোলাহলময় ছিল। এখন চারদিকে ভূতুড়ে নীরবতা। ফজর আলীর ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। শহরের বাসাবাড়ির একটি গলির মুখে। চায়ের দোকানে পাড়ার ছেলেপেলেদের আড্ডা বসত। কেমন জমজমাট ছিল পরিবেশটা। দেশের রাজনীতি, সিনেমা, নাটক কতকিছু নিয়ে পাড়ার অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিতদের আড্ডায় চায়ের কাপে ঝড় উঠত। মাঝে মাঝে পাড়ার ছেলে রবিন এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে মোবাইলে গান ছেড়ে দিত। আহা কত মধুর সেই গান। ফজর আলীর সে গান শুনে প্রাণ জুড়িয়ে যেত। বুঝত না মান্না কিংবা হেমন্তের গানের অর্থ। কিন্তু ভালো লাগাটা প্রকাশ করত অবলীলায়। ফজর আলী রবিনকে বলত, 'বাপজান আর চা খাওনের দরকার নাই, তুমি গান বাজাও, আমি শুনি ভালো লাগতেছে।' রবিন বসে গান বাজাত। কিন্তু এখন দৃশ্যপট ভিন্ন। ফজর আলীর দোকান বন্ধ। সেই জমজমাট আড্ডাও নেই। দেশে করোনার ফলে শুধু ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান ছাড়া সব দোকান বন্ধ। ফলে ফজর আলীর দোকানও খোলা রাখার সুযোগ নেই। ফজর আলীর নিজের বাসায় বসে দিন কাটছে। দিন যেন আর চলতে চায় না। হাতেপাতে যা ছিল তাও শেষ হওয়ার পথে।

সেই দিন মিজান, সাইফুল রবিনের সঙ্গে আড্ডা দিতে এসে করোনা সম্পর্কে কিছু ধারণা দিয়েছিল ফজর আলীকে। আলাপচারিতায় সাইফুল বলেছিল, 'ফজর আলী চাচা রোগটা ঠিক জ্বর, সর্দি, কাশির মতো। তবে এর আলাদা কিছু লক্ষণ আছে।' 'থাকগে ওসব শুনে আমার দরকার নেই, লও চা খাও।' সাইফুল বলে, 'এ রোগে বিদেশে হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে।' ফজর আলী ভয় পেয়ে এ কথাকে আর বেশিদূর এগোতে দেয়নি। আরও অনেকের আলোচনায় ফজর আলী জেনে গেছে মানুষের মাধ্যমেই একজন থেকে আরেকজনে এ রোগ ছড়ায়। আক্রান্ত মানুষের থেকে দূরে দূরে থাকলেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব কমে। সেজন্য বন্ধ হতে পারে সবকিছু। এসব কিছু দোকানে এসে অনেকেই আলাপ করে। এক অজানা আশঙ্কা পেয়ে বসে ফজর আলীকে। ফজর আলীর দোকান থেকে বাসা প্রায় দুই কিলোমিটার। টিনশেড আধাপাকা ঘরে স্ত্রী আর অষ্টম শ্রেণিপড়ুয়া এক ছেলেকে নিয়ে বসবাস। দোকানের আয়ই তার ভরসা। চারদিকে তখন ত্রাণের খবর। কিন্তু ফজর আলীর ত্রাণ নিতে আত্মসম্মানে লাগে। ছেলেকে বলে, 'বাপজান না খাইয়া থাকুম, তার পরও ত্রাণের জন্য দাঁড়াতে পারুম না।' ছেলে বলে, 'আব্বা দেখ ফোন করলেই ত্রাণ ঘরে এসে যাবে বলছে, ওই দেখ টিভিতে দেখায়।' যাকগে বাপজান ওসবের দরকার নেই। ফজর আলীর বাসায় ছোট্ট একটি টিভি। টিভিতে প্রতিদিনকার খবর দেখতে দেখতে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। চারদিকে মৃত্যুর খবর। এসব খবর শুনতে শুনতে সে যেন ক্রমশ অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আর বসে বসে ভাবছে বাসা ভাড়া, ডিশের বিল, প্রতিদিনকার খাওয়া-দাওয়ার খরচ আরও কত কী। ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফজর আলী। একমাত্র আয়ের পথ রুদ্ধ। এমনি উৎকণ্ঠায় বেশ কয়েকটা দিন পার হলো। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ফজর আলীর শরীরটা কেমন কেমন লাগছে। স্ত্রী শরীরে হাত দিয়ে দেখে গায়ে জ্বর। 'তোমার তো দেহি গায়ে জ্বর।' স্ত্রীর এমন কথায় ধপাস করে বুকটি কেঁপে ওঠে ফজর আলীর। একটু কাশিরও ভাব। গলাও ব্যথা করছে সামান্য। ডাক্তার দেখাবে তেমন পয়সা-কড়িও হাতে নেই এই মুহূর্তে। তার এ সময় মনে পড়ে গেল দোকানে সাইফুলের করোনা রোগ নিয়ে সেই কথা। এমন সময় ছেলে বাবার কাছে এসে বলে, 'আব্বা তোমার গায়ে জ্বর?' 'হ, তোমার কাশি আছে?' 'হ।' 'তোমার কি গলাব্যথা করছে?' 'একটু একটু।' 'তোমার কি শ্বাসকষ্ট হচ্ছে?' 'না।' 'তাহলে আব্বা তোমার কোনো চিন্তা নাই।' 'বলিস কী?' 'তাহলে আমার করোনা হয় নাই?' 'হ্যাঁ সত্যি।' 'তুই কি ডাক্তার?' 'না আব্বা টিভিতে শুনছি। তুমি তো ওসব দেখ না।' ছেলের কথা শুনে ফজর আলীর মানসিক শক্তি বাড়ে, জ্বরের আবহটা কমে।

চট্টগ্রাম