সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


এক মাসের খাদ্য পেল ভাটির ৬শ' পরিবার

প্রকাশ: ১২ মে ২০২০      

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ

হাওরের ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। ধানের বাম্পার ফলন হলেও দাম না থাকায় হাওরের প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের এবার ঈদের আনন্দ নেই। তারা উৎপাদিত ধান ভাগ-বাটোয়ারার পর যেটুকু ভাগে পেয়েছেন, সেই ধানের ন্যায্যমূল্যও বাজারে নেই। তাই এই সামান্য ধানে তাদের বছরের চাহিদা তো পূরণ হবেই না, উপরন্তু ধান বিক্রি করে পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনও মেটাতে পারবেন না। আবার প্রাপ্ত ধান সংসারে আগাম ব্যয় হয়ে গেলে সারাবছর উপোস থাকতে হবে। করোনার কারণে সারা হাওরে ধান উঠলেও সমস্যা বেড়েই চলেছে। কারণ কিছু ধান কর্জ ও সুদ পরিশোধে চলে হবে। বিশেষ করে আত্মীয়-স্বজন যারা কিছু পাওয়ার আশায় ফাল্কগ্দুন মাসে কর্জ দিয়েছিলেন, তা কিছু দিয়ে শেষ করতে হবে। এমন দোটানা পরিবেশে এবারের রমজানে ইফতার ও সেহরিতে ছিল ভাত। কিন্তু ভাতের সঙ্গে তো একটা কিছু লাগে। তাই রমজানে বাড়তি খাদ্য আয়োজনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে রমজানের রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে করোনায় কর্মহীন দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের এক স্মরণীয় আয়োজন করা হয় গভীর হাওরের মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়।

সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশন যৌথ উদ্যোগে গত ৫ মে হাওরের কর্মহীন ও গরিব জনগোষ্ঠীর মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কর্মসূচি হাওরের নর-নারীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। হাওরের তিন উপজেলায় কর্মহীন সুবিধাবঞ্চিত ও অতিদরিদ্র ছয় শতাধিক পশ্চাৎপদ নারী-পুরুষের মধ্যে চাল, আলু, পেঁয়াজ, ডাল, তেল, লবণ বিতরণের মধ্য দিয়ে রমজান ও ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার এক অন্যরকম আনন্দঘন অনুষ্ঠানে সর্বস্তরের মানুষ যোগদান করে এই মহতী অনুষ্ঠানকে স্বাগত জানান। পবিত্র রমজানের নবম দিবসে মিঠামইন উপজেলার কামালপুর গ্রামে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বাড়ির মসজিদের সামনের মাঠে সমকাল ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশন এই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

রমজানে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের ওই আনন্দঘন আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতির বড় ছেলে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী রেজওয়ান আহম্মদ তৌফিক, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যথাক্রমে মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রভাংশু সোম মহান, সমকালের সহকারী সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ, আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার তারেক মাহমুদ সজীব, সমকালের কিশোরগঞ্জের নিজস্ব প্রতিবেদক সাইফুল হক মোল্লা দুলু, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকির রব্বানী, সাংবাদিক টিটু দাস, সুহৃদের সিনিয়র সদস্য মো. জহিরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আসলামুল হক আসলাম প্রমুখ।

এ সময় স্বাগত বক্তব্যে সিরাজুল ইসলাম আবেদ বলেন, সমকাল তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আর্ত মানবতার সেবায় কাজ করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের এই মহতী ও মানবিক উদ্যোগ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহম্মদ তৌফিক বলেন, দেশের সবচেয়ে অবহেলিত ও বঞ্চিত এলাকা হাওর। হাওরের বোরো ফসল বা ধান লটারির মতো। কোনো বছর গোলায় তুলতে পারে, আবার কোনো বছর সব ফসল মার খেয়ে কৃষক সর্বস্বান্ত হন। এবার করোনাকাল অতিক্রম করছেন হাওরের কৃষক। তাদের এবার বেঁচে থাকাই ছিল চ্যালেঞ্জ। কারণ ধান আছে দাম নেই। কিন্তু কর্মহীন বেকার দুস্থদের তো দাম নিয়ে মাথাব্যথা নেই। দাম বেশি-কম হলে তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। তারা চান আজকের খাবার। করোনার কারণে তাদের রমজানের সেহরি ও ইফতারের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই আজ তারা তেল, লবণ, আলু, ডাল, চালসহ অন্যান্য পণ্য পেয়ে অন্তত রান্না করে দু'বেলা পেট ভরে খেয়ে রোজার মাস পার করতে পারবেন। প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে ভালো খাওয়ার শিক্ষা আমাদের ধর্মে নেই। সমকাল এবং আল-খায়ের ফাউন্ডেশন ধর্মের সেই স্পিরিট নিয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে দরিদ্র নারী-পুরুষের মধ্যে আনন্দ বিলিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করায় তাদের কাছে হাওরের সংসদ সদস্য হিসেবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রভাংশু সোম মহান বলেন, আজকের এই খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কর্মসূচির মাধ্যমে হাওরের তৃণমূলের কর্মহীনদের অন্তত কয়েক দিনের খাদ্য সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। এ জন্য আমি আনন্দিত।

সভাপতি চৌধুরী কামরুল হাসান বলেন, দৈনিক সমকাল ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশন দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য দায়িত্ব পালন করছে বলে আমি মনে করি। আজকের এই আয়োজনেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার তারেক মাহমুদ সজীব বলেন, বাংলাদেশসহ ৫৪টি দেশে আল-খায়ের ফাউন্ডেশন আর্ত-মানবতায় কাজ করে আসছে। ২০১৬ সালের চৈত্রের বন্যায় কিশোরঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরা ধান তলিয়ে যাওয়ায় সুহৃদকে সঙ্গে নিয়ে আমরা হাওরের ইটনা উপজেলার বাদলা গ্রামের কোরবানিবঞ্চিত দুস্থদের গরু জবাই করে রান্না করে কোরবানির গোস্ত খাইয়েছি। তিনি বলেন, সমকালকে সঙ্গে নিয়ে আগামীতে কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর অঞ্চলসহ গ্রামীণ পর্যায়ে মানবিক কাজ করে দেশের তৃণমূল জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আজকের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মানবিক সচেতনতা ও মূল্যবোধ জাগ্রত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

পরে ট্রাকে করে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয় হাওরের ইটনা উপজেলায়। ইটনা উপজেলার ডাকবাংলো সংলগ্ন মাঠে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আগত কর্মহীন দরিদ্র ২০০ পরিবারের নারী পুরুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। আর্থিক সংকটে থাকা অসহায় হতদরিদ্র পরিবারের সদস্যদের হাতে এসব খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। এ সময় এমপি তৌফিকসহ উপস্থিত ছিলেন ইটনা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান চৌধুরী কামরুল হাসান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাফিসা আক্তার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. ইসমাইল হোসেন প্রমুখ।

এরপর দুপুর ২টায় হাওরের রানীখ্যাত অষ্টগ্রাম উপজেলার ডাকবাংলো মাঠে অষ্টগ্রামের সাতটি ইউনিয়ন থেকে আগত ২০০ কর্মহীন দরিদ্রকে খাদ্যসামগ্রী উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অষ্টগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম জেমস, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রফিকুর ইসলামসহ উপজেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।

ঈদ খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ করে মিঠামইন উপজেলা সদরের আফসারা বেগম (৪৫), কামালপুর গ্রামের মালেক চাঁন, কালীপুর গ্রামের সেলিনা বেগমসহ অসহায় মানুষেরা বলেন, 'ফাল্কগ্দুন থেকে বৈশাখ মাস বোরো ধান থাকে জমিতে। করোনার কথা হুনতে হুনতে আর বালা লাগে না। পেডে বাত নাই। খিদা নিয়া চিন্তা করা যায় না। অভাবে থাইক্যা থাইক্যা রমজানের রোজা রাখা কঠিন হইয়্যা পড়ে। নুন নাই তো তেল নাই। এই খারাপ অবস্থার মধ্যে এই প্যাকেট পাইয়্যা আমরা খুশি। বেবাক জিনিস আছে। কিছু না থাকলেও সমস্যা নাই।