সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


করোনা প্রতিরোধে সমকাল

হাওরের ৪৫০ পরিবারে পৌঁছল এক মাসের খাবার

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২০     আপডেট: ০৪ মে ২০২০      
হাওরের ৪৫০ পরিবারে পৌঁছল এক মাসের খাবার

জকিগঞ্জে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে করোনাদুর্গতদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়- সমকাল

করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ। এ অবস্থা কত দিন চলবে তাও অজানা। বৈশ্বিক এ মহামারির মধ্যেই শুরু হয়েছে রোজা, সামনে ঈদ। তাই, কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের জন্য সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশন শুরু করেছে খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি। চলমান এ কর্মসূচির আওতায় ২৯, ৩০ এপ্রিল এবং ১ ও ২ মে সিলেটের জকিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর ও তাহিরপুরের সাড়ে চারশ' পরিবারে দেওয়া হয় এক মাসের খাদ্যসামগ্রী। প্রতি পরিবার পায় ২০ কেজি চাল, দুই কেজি করে ডাল, চিনি, আটা, আলু, এক কেজি করে খেজুর, লবণ, ছোলা, মুড়ি এবং দুই লিটার সয়াবিন তেল, আধা কেজি গুঁড়ো দুধ। সমকাল প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন

জকিগঞ্জ

করোনা সংক্রমণে গৃহবন্দি মানুষের দিন কাটছে চরম অর্থনৈতিক দৈন্যদশায়। বিশেষ করে দরিদ্র, হতদরিদ্র, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ পড়েছে চরম বিপর্যয়ের মুখে। রোজায় এসব করোনাদুর্গত মানুষের মধ্যে খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রেখেছে সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশন। এরই অংশ হিসেবে ২৯ এপ্রিল বুধবার সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজারে একশ' পরিবারের মধ্যে এক মাসের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়।

আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর তারেক মাহমুদ সজীব সবার ঘরে ঘরে গিয়ে এসব খাদ্যসামগ্রী দিয়ে আসেন। এলাকাবাসী জানান, উপজেলা সদর থেকে দূরে, প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় মুন্সিবাজারের দুর্গতি দেখার কেউ নেই।

গৃহবধূ আফরোজা বেগম এই খাদ্যসামগ্রী পেয়ে বলেন, 'করোনার কারণে কাজকামে যাইতে পারি না। সবাই ঘরে থাকি। খাইয়া না খাইয়া বাঁচিয়া আছি। এতকিছু পাইমু আশা করি নাই। এখন রমজান মাসটা কোনোমতে চালাই দিতে পারমু। যারা এসব দিছে তারারে আল্লায় যেন ভালো রাখে।'

৫৮ বছর বয়সী সোয়াদ মিয়া বলেন, 'রোজার মাসে পরিবারের কর্মক্ষম সবাই গৃহবন্দি। কাজকর্ম না থাকায় রমজান মাসটা কীভাবে কাটবে ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না। আপনাদের দেওয়া এসব খাবারে রোজার মাসটায় অন্তত চিন্তা করতে হবে না।'

জগন্নাথপুর

স্বামী পরিত্যক্ত আমেনা বেগম তিন সন্তান নিয়ে গৃহকর্মীর কাজ করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। এক মাস ধরে করোনাভাইরাসের কারণে ঘরবন্দি তিনি। কাজ না থাকায় তিন সন্তান আর নিজের খাবার জোগাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। এমন সংকটকালে সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশন উদ্যোগে খাদ্যসামগ্রী পেয়ে তিনি ভীষণ খুশি।

খাদ্য সহায়তা নিতে আসা সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পাটলী ইউনিয়নের মিনহাজপুর গ্রামের এই নারী জানান, সংসারে ৮ বছরের এক প্রতিবন্ধী শিশুসন্তানসহ তিন সন্তান তার। করোনা পরিস্থিতির কারণে এক মাস ধরে কর্মহীন। আমেনা বলেন, 'কোনোরকম খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। আজ খুবই ভালো লাগছে। যে পরিমাণ খাবার পেয়েছি, তাতে রোজার মাস চলে যাবে। যারা এই সহায়তা করলেন আল্লাহ যেন তাদের মঙ্গল করেন।'

চাঁনপুর গ্রামের বৃদ্ধ আনা মিয়ার (৭০) স্ত্রী আর দুই ছেলে নিয়ে সংসার ছিল। দুই ছেলে বিয়ে করার পর থেকে আলাদা। মানুষের দান-দক্ষিণার ওপর চলে তাদের স্বামী-স্ত্রীর সংসার। আনা মিয়া বলেন, 'করোনা পরিস্থিতির কারণে অসহায় হয়ে পড়েছি। তবে এই রোজার মাসে যেসব খাবার পেলাম তা দিয়ে অনেকদিন চলে যাবে।'

রমজান মাসে করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে ঘরবন্দি দরিদ্র অসহায় দুর্গত মানুষের মধ্যে খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রেখেছে সমকাল সুহৃদ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশন।

৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলা চাঁনপুর এলাকায় জগন্নাথপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুল আলম ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর তারেক মাহমুদ সজীবের উপস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ইউনিয়নের একশ' পরিবারের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের সিনিয়র অফিসার এসএম ইশতিয়াক হোসেন খান, পাটলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল হক, সমকালের জগন্নাথপুর উপজেলা প্রতিনিধি তাজউদ্দিন আহমদ, দৈনিক আমাদের সময় উপজেলা প্রতিনিধি গোবিন্দ প্রমুখ। শুক্রবার জগন্নাথপুরে আরও একশ' পরিবারের মধ্যে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়।

স্থানীয় পাটলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল হক বলেন, রমজানের শুরুতেই করোনার প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় অসহায় এবং দরিদ্র পাশে দাঁড়ানোর জন্য সুহৃদ সমাবেশ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা পরিবারের কাছে

শনিবার জগন্নাথপুরের নয়াবন্দর এলাকায় হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকায় ১১ পরিবারসহ উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল মেঘারকান্দি, হরিণাকান্দি ও পৌরসভায় অসহায় দরিদ্র পরিবারের ১৪৯ পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন ইউএনও মাহফুজুল আলম মাসুম। যারা পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে ত্রাণের লাইনে দাঁড়াতে কুণ্ঠিত ছিলেন কিন্তু প্রয়োজন এমন পরিবারগুলোর কাছে এদিন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ কাজে সার্বিক সহযোহিগতা করে স্থানীয় রয়্যাল ডেভেলপার ফাউন্ডেশন।

তাহিরপুর

সুনামগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত তাহিরপুরের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানো হয় ১ মে শুক্রবার। রমজান ও ঈদ সামনে রেখে এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলোর যখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছিল তখন সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশন এই উপহার সামগ্রী তাদের মুখে হাসি ফোটায়।

শুক্রবার তাহিরপুর উপজেলার রাজধরপুর গ্রাম থেকে উপজেলার সাতটি গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত ১০০ পরিবারের মধ্যে ৩০ দিনের খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়। গ্রামগুলো হলো- রাজধরপুর, মারালা, সাহেবনগর, ঠাকুরহাটি, ভাটি তাহিরপুর, মধ্য তাহিরপুর ও উজান তাহিরপুর।

ত্রাণ বিতরণকালে উপস্থিত ছিলেন আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর তারেক মাহমুদ সজীব, সমকাল তাহিরপুর উপজেলা প্রতিনিধি আমিনুল ইসলাম, সমকাল সুহৃদ সমাবেশ তাহিরপুর উপজেলা সভাপতি আহমেদুল হাসান, সাধারণ সম্পাদক মনিরাজ শাহ, সদস্য ধীমান চন্দ, শাহরুখ হাসান, আছমাউল, সজিব চন্দ, শঙ্কর চন্দ, মোনায়েম শরীফ প্রমুখ।

রাজধরপুর গ্রামের মসজিদের ইমাম আজহারুল ইসলাম বলেন, 'রাজধরপুর গ্রামের লোকজন খুবই গরিব। তারা আমাকে নিয়মিত মাসিক বেতন দিতেও অক্ষম।' এ অবস্থায় একসঙ্গে এক মাসের খাবার পেয়ে তিনি আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

ভাটি তাহিরপুর গ্রামের বিধবা রত্না বেগম বলেন, 'আমার পরিবারের কর্মক্ষম যারা সবাই গৃহবন্দি। কাজকর্ম না থাকায় রমজান মাসটা কীভাবে কাটবে ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না। এত ত্রাণ একসঙ্গে পাওয়ার পর এখন আর রমজান ও পবিত্র ঈদ পালনে আর কোনো সমস্যা হবে না।' এ জন্য তিনি সমকাল সুহৃদ সমাবেশের সদস্য ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।