শৈলী

শৈলী


নিজেই নিন চুলের যত্ন

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২০      

ফ্লোরিডা এস রোজারিও

'চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।' কিংবা 'বড়লোকের বেটি লো লম্বা লম্বা চুল এমন মাথায় বেঁধে দেবো লাল গেন্দা ফুল'- নারীর চুলের বর্ণনা নানাভাবে দিয়ে গেছেন কবি-গীতিকাররা।

চুলের যত্ন কিংবা কেশচর্চা বাঙালি নারীর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্য। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, কেশচর্চা অতি প্রাচীন প্রচলনের মধ্যে একটি। প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় চুলের যত্নে হোম রেমিডি বা ঘরোয়া টোটকার কথা বলা হয়েছে।

যুগ যুগ ধরে কেশচর্চাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নারীমহলের অন্তঃপুরের নিজস্ব এক ভুবন। চুলের কথা উঠলেই মনে পড়ে, বড় একটা বেণির কথা, হাতির দাঁতের চিরুনির কথা, চুলের কাঁটার কথা কিংবা নারিকেল তেলের কথা। একটা সময় ছিল, দুই সখী মিলে বাড়ির উঠোনে পাটি পেতে বসত কেশচর্চার কাজে। বিলি কেটে কেটে চুলের গোড়ায় তেল লাগিয়ে দেওয়ার একধরনের রেওয়াজ ছিল। গ্রামীণ পরিসরে এমন আড্ডা এখনও চলে।

নারীর চুলকে কেন্দ্র করে কত গান, কবিতা কিংবা সিনেমা বানানো হয়েছে। মনে আছে রুপাঞ্জেলের কথা? সেই মেয়েটা,যার সুদীর্ঘ সোনালি চুল ছিল। চুল বেয়ে বেয়ে রাজপুত্তুর সেই উঁচু ঘরে উঠে এসে রাক্ষসীর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল তাকে।

চুল সত্যিকার অর্থেই নারীর শ্রী বৃদ্ধি করার শক্তিশালী হাতিয়ার। একেকজনের চুল একেকরকম। কারও কোঁকড়া, কারও একদম সোজা, কারও আবার হালকা ঢেউ খেলানো। তবে চুল যেমনই হোক, নারী এর পরিচর্যায় একটুও ছাড় দিতে নারাজ। বাঙালি নারীরা এই বিদ্যার চর্চা করে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

ঘরে বসেই কীভাবে চুলের যত্ন নিতে হবে এ ব্যাপারে কিছু টিপস এবং পরামর্শ দিয়েছেন রূপবিশেষজ্ঞ শারমিন কচি।

প্রথমেই প্রতিদিনের চুলের যত্নের রুটিনটি এভাবে সাজাতে হবে :

* সকালে ঘুম থেকে উঠেই চুল আঁচড়াতে হবে। না হলে চুলের জট থেকেই যাবে। আর এই জটবাঁধা চুল আঁচড়ালেই চুল কাটতে শুরু করে।

* বড় দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করতে হবে। তা না হলে চুল আঁচড়ানোর সময় টান পড়লে চুল কাটতে থাকে।

* নিয়মিত চুল ধুয়ে নিতে হবে। যাদের নর্মাল চুল তারা একদিন পর পর চুল ধুয়ে নিতে পারে। যাদের তৈলাক্ত চুল তাদের প্রতিদিন চুল ধুয়ে নিতে হবে।

* ভেজা চুল আঁচড়ানো যাবে না। ভেজা চুল নরম থাকে তাই নরম তোয়ালে দিয়ে চেপে চেপে মুছতে হবে।

* চুল নরম ও মসৃণ থাকে এমন শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হবে। শ্যাম্পু করার পর কন্ডিশনার ব্যবহার করতে হবে।

* অনেকেই চুলে তেল ব্যবহার করে না। শ্যাম্পুর পাশাপাশি চুলে তেল দিতে হবে। শুস্ক চুলে প্রাণ ফেরাতে, চুলের ঝরে পড়া রুখতে ও চুলকে রেশমি ও মসৃণ করতে তেলের বিকল্প নেই।

* অকারণে হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার না করাই ভালো। চুলে বারবার হিট নেওয়া, চুলে হেয়ার কালার করা, চুলের স্টাইল বা ফ্যাশনে অধিক কেমিক্যাল না ব্যবহার করাই ভালো।

* উষ্ণ তেল দিয়ে মালিশ করতে হবে। উষ্ণ তেল মালিশে যেমন চুলের পুষ্টি বৃদ্ধি পায় তেমনি চুলের গোড়াও শক্ত হয়।

* চুলের যত্ন নিতে নারিকেল তেল, আমন্ড তেল,অলিভ অয়েল, ক্যাস্টর অয়েল যেমন অনবদ্য তেমনি মেথির প্যাক, অ্যালোভেরা হেয়ারপ্যাক, টকদই হেয়ারপ্যাক এগুলো খুবই কার্যকরী।

প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে অতি সহজেই হেয়ারপ্যাক, হেয়ার অয়েল তৈরি করে ঘরোয়া উপায়ে চুলের যত্ন নিতে পারেন যেভাবে তা বিশদে উল্লিখিত হলো :

১. নারিকেল তেল :

নারিকেল তেল চুলকে খুব ভালো ময়শ্চারাইজার করে। নারিকেল তেলে কয়েকটি মেথি দিয়ে ফুটিয়ে ম্যাসাজ করে কিছুক্ষণ রেখে তারপর শ্যাম্পু করলে চুল নরম হয়। চুলের গোড়াও শক্ত হয়।

২. আমন্ড তেল :

অলিভ অয়েলের সঙ্গে আমন্ড তেল মিশিয়ে সপ্তাহে ২-৩ বার চুলে ম্যাসাজ করলে চুল দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

৩. অলিভ অয়েল :

অলিভ অয়েলে থাকা এসেনশিয়াল ফ্যাটি অ্যাসিড চুলের পুষ্টি জোগায়। এছাড়া এতে ভরপুর ভিটামিন ই চুলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তাই সপ্তাহে অন্তত একবার অলিভ অয়েল মাথার স্ক্যাল্পে ব্যবহার করা উচিত।

৪. ক্যাস্টর অয়েল :

এতে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট আছে, যা চুল পড়া কমাতে সাহায্য করে। সারারাত ক্যাস্টর অয়েল মেখে পরের দিন শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নিলে খুব ভালো হয়। এছাড়া ক্যাস্টর অয়েলের সঙ্গে ভিটামিন ই বা অলিভ অয়েল মিশিয়ে সপ্তাহে অন্তত ৩-৪ বার মাখলে ভালো ফল হয়।

৫. তিলের তেল :

তিলের তেল চুলের কন্ডিশনিং করতে ও চুলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এছাড়া খুশকি কমাতে হট অয়েল ট্রিটমেন্টে তিলের তেল ব্যবহার করা হয়।

চুলের যত্ন নিতে তেল ম্যাসাজের সঙ্গে সঙ্গে হেয়ারপ্যাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সপ্তাহে ২-৩ বার হেয়ারপ্যাক ব্যবহার করে নিম্নলিখিত ঘরোয়া উপায়ে চুলের যত্ন নেওয়া যায় :

১. অ্যালোভেরা হেয়ারপ্যাক :

অ্যালোভেরাতে থাকা প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, প্রোটিন আর মিনারেলস চুলের পুষ্টি জুগিয়ে চুলকে ঘন ও ঝলমলে করে তোলে। চুলের যত্ন নিতে অ্যালোভেরার হেয়ারপ্যাক খুবই কার্যকরী।

পদ্ধতি : একটি পাত্রে ১ কাপ ফ্রেশ অ্যালোভেরা জেল, ক্যাস্টর অয়েল ২ চামচ, মেথি গুঁড়ো ২ চামচ নিয়ে ভালো করে মিশিয়ে একটা প্যাক তৈরি করে স্ক্যাল্পে আর চুলের গোড়ায় ভালো করে ম্যাসাজ করে সারারাত রেখে দিতে হবে। পরদিন সকালে শ্যাম্পু করে কন্ডিশনিং করতে হবে। এই হেয়ারপ্যাকটি সপ্তাহে ১-২ বার করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

২. ডিম দিয়ে হেয়ারপ্যাক :

ডিমের কুসুমে থাকা প্রচুর পরিমাণে ফ্যাট চুলের কন্ডিশনিং করতে সাহায্য করে।

পদ্ধতি :ডিমের কুসুম ১টা, অ্যালোভেরার জেল ৪ চামচ, অলিভ অয়েল ৩ চামচ একসঙ্গে মিশিয়ে একটা প্যাক তৈরি করে স্ক্যাল্প আর চুলের গোড়ায় ভালো করে ম্যাসাজ করে এরপর একটা শাওয়ার ক্যাপ দিয়ে ঢেকে ২৫ মিনিট রেখে শ্যাম্পু করে ধুয়ে ফেলতে হবে। ডিমের গন্ধ অনেকে সহ্য করতে পারে না তাই এটি সপ্তাহে একদিন করা যেতে পারে।

৩. দইয়ের হেয়ারপ্যাক :

দইয়ের সঙ্গে লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে একটা ঘন প্যাক তৈরি করে স্ক্যাল্প ও চুলে লাগিয়ে আধঘণ্টা রেখে ধুয়ে ফেলতে হবে। সপ্তাহে ২ বার করলে দ্রুত ফল পাওয়া যাবে।

৪. পেঁপের হেয়ারপ্যাক :

পাকা পেঁপের জুস ৪-৫ চামচ, অলিভ অয়েল ৩ চামচ, এক কাপ অ্যালোভেরা জেল একসঙ্গে মিশিয়ে একটা প্যাক তৈরি করে স্ক্যাল্প আর চুলের গোড়ায় ভালো করে ম্যাসাজ করে ১ ঘণ্টা রাখতে হবে।

তারপর ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে নিয়ে শ্যাম্পু করতে হবে। এই হেয়ারপ্যাকটি সপ্তাহে একবার করে দেখুন, খুব উপকারী।

৫. আমলকী হেয়ারপ্যাক :

কিছু আমলকী সারারাত ভিজিয়ে রেখে পরেরদিন একটা পেস্ট তৈরি করে নিতে হবে। এর সঙ্গে ২ চামচ শিকাকাই পেস্ট, এক চামচ মেথি পেস্ট নিয়ে ভালো করে মিশিয়ে একটা প্যাক তৈরি করে নিতে হবে। এই প্যাকটির সঙ্গে নারিকেল তেল বা তিলের তেল মিশিয়ে উষ্ণ গরম করে স্ক্যাল্পে লাগিয়ে এক ঘণ্টা রেখে ধুয়ে নিতে হবে। া