শৈলী

শৈলী


জামদানির হাটে...

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০      

ফারুখ আহমেদ

মিহি জমিনে সূক্ষ্ণ নকশাদার কাজ- এই হলো জামদানির মূল বৈশিষ্ট্য। অনেকের মতে, বেনারসি শাড়ির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই এক সময় জামদানি শাড়ির প্রচলন হয়েছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জামদানির আবির্ভাব হয় মসলিন শাড়ির পাশাপাশি; মসলিন শাড়ির তাঁতিরাই শুরু করেন জামদানি শাড়ি বোনা। এভাবেই একদিন দেখা গেল বিয়ের অনুষ্ঠানে জামদানি শাড়ি বেনারসির পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে। মোট চার ধরনের জামদানি শাড়ি তৈরি হতে দেখা যায়। এগুলো হলো- ফুলসিল্ক্ক, হাফসিল্ক্ক, ফুলকটন ও নাইলন।

জামদানির হাট বা আড়ং বলতে এক সময় রূপগঞ্জকেই বোঝানো হতো

এক সময় রূপগঞ্জের নোয়াপাড়ায় বসত জামদানির হাট। কেউ কেউ বলেন মঙ্গলবার আবার কারও মতে বৃহস্পতিবার ছিল সেই হাটবার। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে হাটের বর্তমান অবস্থান ডেমরার শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের বিসিক শিল্পনগরীতে। বিসিক যেহেতু নির্দিষ্ট জায়গা করে দিয়েছে সেহেতু ভবিষ্যতে হাটের বর্তমান স্থল পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। হাট এলাকা ডেমরায় হলেও জামদানির তাঁতি ও তাঁতের অবস্থান রূপসী, ডেমরা, তারাবো, রূপগঞ্জ হয়ে একবারে নরসিংদী পর্যন্ত বিস্তৃত। ডেমরা সুলতানা কামাল সেতু পার হয়ে বাঁয়ে চলতে চলতে আপনার কানে মাকুসহ তাঁতের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে। তার পরের গল্প তাঁত, তাঁতি আর জামদানির। এখানে তাঁত চলে যে গতিতে তার চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে বিক্রি হয় জামদানি শাড়ি। হাট এলাকার পাশেই রয়েছে বেশ কিছু মার্কেট ও বিক্রয় কেন্দ্র। এসব মার্কেট বা বিক্রয় কেন্দ্রে জামদানি শাড়ির পাশাপাশি জামদানির নকশায় করা থ্রিপিস, টুপিস, ফতুয়া ও পাঞ্জাবির কাপড় বিক্রি হতে দেখা যায়। বিক্রয় কেন্দ্রে প্রতিদিন জামদানি বিক্রি হলেও জামদানির হাটে কিন্তু সপ্তাহের একদিন শুক্রবার শাড়ি বিক্রি করেন তাঁতিরা।

জামদানির হাটে একদিন

কয়েকজনের সঙ্গে প্ল্যান করলাম টাঙ্গাইল যাওয়ার। মাথায় চলছিল হাটের ছবি তোলার নেশা। সেই নেশাতেই ডুবে ডুবে একদিন জামদানি শাড়ি দেখতে ও ছবি তোলার জন্য ডেমরা চলে গেলাম। যেহেতু আগে পা পড়েনি হাটে সে জন্য পথ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নিলাম বিডিনিউজের সাংবাদিক বন্ধু ওবায়দুর মাসুমের কাছ থেকে, কথা হলো দৈনিক কালের কণ্ঠের সিনিয়র সাংবাদিক আপেল মাহমুদের সঙ্গে। তারপর সেই ভোর রাতে যখন পথে নামলাম সে সময়কার উপলব্ধি ছিল- আহা, প্রতিদিন যদি এমন সকাল আসত বা ঢাকা শহরটা যদি এমন জ্যাম আর যানজটমুক্ত থাকত! ভাবনার পালে হাওয়া তুলে ঠিক আধাঘণ্টায় ডেমরার সুলতানা কামাল সেতুর কাছে চলে আসি। তারপর ডান-বাম করে এবং হাটের পথের একআধটু খবর নিয়ে শীতলক্ষ্যার পাড় ধরে চলে আসি মূল হাট প্রাঙ্গণে। হাটের পরিসর খুব একটা বড় নয়, তবে বিকিকিনি জমজমাট।

দূর-দূরান্তের ও স্থানীয় ব্যাপারীসহ জামদানি ব্যবসায়ীরা রাত ৩টার পর থেকেই হাটে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন, জানলাম। ফজরের নামাজের পরপরই রূপগঞ্জ, ডেমরা ও তারাবোর জামদানি তাঁতিরা সারা সপ্তাহের তৈরি করা একটা-দুটো শাড়ি নিয়ে হাটে আসা শুরু করেন। ব্যাপারীদের পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতারাও চলে এসেছেন সেই সাতসকালে। বিকিকিনির ধুম পড়েছে, একদিনের জন্য আমরাও সেই কেনাবেচায় শরিক হলাম কিন্তু সমস্যা হলো স্থানীয় এক দালাল। শেষ পর্যন্ত বুকের পাঁজরের মতোই সেই দালালকে আর আলাদা করতে পারিনি। তাকে সঙ্গে নিয়েই একটা শাড়ি কিনে মনে করি বিশাল কাজ শেষ করলাম। তারপরের সময়টুকু ছিল খালি দেখার। অবশ্য সেই দেখা সকাল ৭টা বাজতেই শেষ। কারণ ফজরের সময় হাট শুরু হয়ে ৭টার মধ্যে ফাঁকা হয়ে যায়। তখন আর দেখে বোঝার উপায় থাকে না একটু আগে জায়গাটি কেমন সরগরম ছিল।

হাটের বিকিকিনি

দোকান খোলোরে, সাজানো পসরা নিয়ে বসোরে- জামদানির হাট ঠিক তেমনটা নয়। দু'পাশে শক্ত ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি করা যে জায়গা তার ওপর চট-মাদুরে বসার ব্যবস্থা। সেখানে আবার বিক্রেতাদের বসার ব্যবস্থা নেই। শুধু ব্যাপারীরা বসে বসে কাপড় কিনে বাড়ি ফেরেন। অন্যান্য হাটের মতোই বিক্রেতারা এই হাটে চলে আসেন সরাসরি। শাড়ি সবার হাতেই, কেউ নিয়ে এসেছেন একটা-দুটো, কেউবা চটের ব্যাগ ভরে শাড়ি নিয়ে এসেছেন। তারপর দু'হাত উঁচিয়ে শাড়ি ধরেন, যার পছন্দ বা যে ব্যাপারী আগে ছোঁ মারতে পারেন তিনি আগে শাড়িটির মালিকানা পেয়ে বসেন। তারপরও কথা থাকে, দরদাম ঠিক না হলে ব্যাপারীকে পিছু হটতে হয়। জামদানি তাঁতিদের পুরো স্বাধীনতাই রয়েছে এ ক্ষেত্রে। স্থানীয়, জামদানি ব্যাপারী ও তাঁতিদের মুখে শোনা কথা- প্রতি হাটবারে এখানে ৬ থেকে ৮ হাজার শাড়ি বিক্রি হয়।

শেষ কথা

হাটে যাবেন, কম দামে শাড়ি কিনবেন- এমনটা ভাববার অবকাশ নেই। এ ধরনের হাটে দালাল বা এক শ্রেণির ফড়িয়ার পদচারণা বেশি বলা চলে। সুতরাং সাবধান! আরেকটা বিষয়ে খুব সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, জামদানির শাড়ি কিনতে হলে যথেষ্ট না হলেও কিছুটা অভিজ্ঞ হতেই হবে। আর অবশ্যই ফড়িয়াদের সঙ্গে না নিয়েই শাড়ি কেনার সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তা না হলে দীর্ঘদিনের পুরোনো শাড়ি হাতে ধরিয়ে দিতে পারেন তাঁতি, সে ক্ষেত্রে আপনি ঠকে গেলেন। আর জামদানি শাড়িতে ঠকলে সমস্যা!

প্রয়োজনীয় তথ্য

জামদানির হাট বসে ঢাকার খুব কাছে- ডেমরার জামদানি শিল্পনগরীতে। ঠিকানা ঠিক এ রকম- নোয়াপাড়া- তারাবো পৌরসভা, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ। আপনি যেখান থেকেই আসেন না কেন, ডেমরা পার হয়ে সুলতানা কামাল সেতুর পাশ দিয়ে নোয়াপাড়ার দিকে যেতে যেতে যে কাউকে জামদানি হাটের কথা বললেই সে আপনাকে নিয়ে যাবে বা দেখিয়ে দেবে। হাট বসে ভোররাত থেকে। ফজরের নামাজ শেষে শুরু হয় হাট। জামদানির হাট বা আড়ং দেখতে চাইলে বা সেখান থেকে শাড়ি কিনতে চাইলে ঠিক সে সময়ের মধ্যে আপনাকে হাটে পৌঁছাতে হবে। সে জন্য একমাত্র ভরসা সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা নিজস্ব বাহন। ১২০০ থেকে ২০ বা ৩০ হাজার টাকা দামের শাড়িও কিনতে পারবেন জামদানি হাটে। হাট থেকে সরাসরি শাড়ি কিনতে না পারলে মনে কষ্ট পাওয়ার মতো কিছু হয়েছে বলে মনে করবেন না। কারণ, পাশেই রয়েছে জামদানির ছোট ছোট দোকান বা বিক্রয় কেন্দ্র। শাড়ি কিনুন আর ফেরার পথে শীতলক্ষ্যা নদীতে এক দফা নৌকা ভ্রমণ শেষে সুলতানা কামাল সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে সকালের শীতল পরশ নিয়ে গন্তব্যে রওনা দিন!



ছবি :লেখক