শৈলী

শৈলী


সুগন্ধির মোহনীয়তায়

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯      
মোগল আমলে সুগন্ধি চর্চার বিস্তার বেশ ব্যাপকভাবে ঘটে। বিশেষ করে মোগল সম্রাটরা সাধারণত পারস্য সম্রাটদের আদব-কায়দা-কেতা, স্বভাব ও ফ্যাশন অনুসরণ করার চেষ্টা করতেন। সে কারণে গোলাপ ও সৌরভের দেশ পারস্য থেকে আসত তাদের জন্য উৎকৃষ্ট আতর ও সুগন্ধি প্রসাধন।

বাংলার যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলার ছিল পারস্য গোলাপের প্রতি প্রবল আসক্তি। এ জন্য পারস্য থেকে তার জন্য আসত সহস্র বোতলভর্তি হরেক রকমের গোলাপ ফুলের নির্যাস। যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলা পারস্য থেকে উৎকৃষ্ট প্রজাতির গোলাপ গাছ এনেছিলেন তার হীরাঝিল প্রাসাদের বাগানকে মোহনীয় করতে। তিনি প্রতিদিন তাজা ফলের রসের পানীয়র সঙ্গে সুগন্ধি মিশিয়ে পান করতে পছন্দ করতেন।

মোগল যুগে সুগন্ধি চর্চার সবচেয়ে বেশি বিস্তৃতি ঘটে নবাব আলিবর্দী খানের সময়ে। ঈদ, শবেবরাত, নওরোজ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বিয়েশাদি বা এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে লুৎফুননেসা যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলার পোশাকে মেখে দিতেন নানারকম সুগন্ধি, যাতে করে যুবরাজ সিরাজের চলার পথে বাংলার আকাশ-বাতাস-জনপদ ছেয়ে যায় পারস্যের ফুলেল সৌরভে। সেসব দিনে যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলার প্রিয় হীরাঝিল প্রাসাদে কলস ভর্তি ঐতিহ্যবাহী সব সুগন্ধি মজুদ থাকত। পুরো হীরাঝিল প্রাসাদ, প্রাসাদের দেয়াল, মেঝে সব ধোয়া-মোছা হতো পারস্যের সুগন্ধি দিয়ে। এ ছাড়াও হীরাঝিল প্রাসাদে কীটপতঙ্গ, হিংস্র জন্তু-জানোয়ার, প্রভৃতি বিতাড়িত করতে ব্যবহার হতো গাছগাছড়া, ফল ও ফুলের নির্যাসের ধোঁয়া। সিরাজউদ্দৌলা ও লুৎফুননেসার শাদিতে নানা নবাব আলিবর্দী খানের নির্দেশে মুর্শিদাবাদের গুরুত্বপূর্ণ সব পথে গোলাপের পাপড়ি ও গোলাপজল ছড়ানো হয়েছিল, শোভাযাত্রা যাতে খুশবুময় হয়। নবাব পরিবারের ঐতিহ্য বজায় রাখতে সুগন্ধের বড় একটি ভূমিকা ছিল। সে সময় নবাব মহলে অতিথি আপ্যায়ন করা হতো গোলাপজল ছিটিয়ে। এ ছাড়া আসরে সাজিয়ে রাখা হতো পারস্যের সুগন্ধির আতরদানি। তুলায় মোড়া ছোট্ট ছোট্ট কাঠি। অতিথিরা আতরদানি থেকে তুলায় মাখিয়ে তুলে নিতেন মনপছন্দ পারস্যের সৌরভ। সিরাজের সহধর্মিণী বেগম লুৎফুননেসা ছিলেন অতি রূপবতী নারী। আতর-চন্দনের সুগন্ধ লেগে থাকত তার গয়নায়। সব সময় তার উপস্থিতিতে খুশবু ভুর ভুর করত, নবাব বেগমের সাতনরী হারের সঙ্গে যেন মিশে আছে পারস্য ও বাংলার সুগন্ধির অজানা সব ইতিহাস।

প্রতি দিন প্রভাতে স্বহস্তে পতির সমাধিভবন সদ্য প্রস্ম্ফুটিত ফুলে সুসজ্জিত এবং প্রতি সন্ধ্যায় সুরভিত দীপমালায় উজ্জ্বল করতেন। এই তাহার নিত্যকার্য ছিল।' লুৎফুননেসা পারস্যের প্রকৃতি থেকে নির্যাসিত বিশেষ সৌরভ গায়ে মেখে নিজেকেও সুরভিত করতেন। বাংলার বীর নবাব আলিবর্দী খান যুদ্ধে যেতেন পারস্যের বিভিন্ন সুগন্ধি নিয়ে। এটা নাকি তার ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলত আর যুদ্ধে উৎসাহ জোগাত। নবাব আলিবর্দী খানের আমলে ফ্রান্স থেকে আগত সেনাপতি সিনফ্রেঁ দুধে গোলাপের পাপড়ি ফেলে আর পারস্যের সুগন্ধি মিশিয়ে তাতে গোসল করতেন এবং প্রচুর পারস্যের সুগন্ধি গায়ে মাখতেন।

সোনাঝরা চাঁদনী রাতে প্রায়ই ভেসে যেত লুৎফার সোনার তরী। সেই দৃশ্য সিরাজউদ্দৌলাকে ভ্রান্তি জাগাত- একি স্বপ্ন, না মায়া? কিন্তু প্রায় এক মাইলব্যাপী ভাগীরথী নদীর সমীরণই বলে দিত সুরভিত অনেক না বলা কথা। ঋতুভেদে বিভিন্ন উৎসবে পারস্যের ফুল ও চন্দন ছিল লুৎফার প্রিয় প্রসাধন। সুগন্ধি অলঙ্কার পরা ছিল সে সময়ের ফ্যাশন। লুৎফার সাতনরী হার হাতে নিয়ে শুঁকে দেখতেন সিরাজউদ্দৌলা। আতর-চন্দনের গন্ধ লেগে থাকত সেই গহনায়। সুগন্ধে ভুরভুর করত চারধার। গ্রীষ্মের দহন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য লুৎফুননেসা স্নান করতেন পারস্যের সুগন্ধি জলে। তারপর চন্দনচর্চিত দেহে নানাবিধ দ্রব্যে প্রসাধন সেরে নিজেকে সজ্জিত করতেন কুসুম আভরণে। লুৎফার নিজের ব্যবহূত নানা সুগন্ধির মধ্যে চন্দন ও কস্তূরির নিজস্ব গন্ধ তো ছিলই। তা ছাড়া তিনি জটামাংসী নামে একপ্রকার গাছের শেকড় দিয়ে তার পোশাককে সুগন্ধি করে নিতেন। জানা যায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার তৎকালীন পরিষদবর্গকে চন্দন কাঠের নির্যাস মিশ্রিত সুগন্ধি দিয়ে সিক্ত করা হতো এবং যোদ্ধাদের সুগন্ধিযুক্ত গুঁড়া দিয়ে আচ্ছন্ন করা হতো, যা ছিল যুদ্ধযাত্রা শুরুর একটি ধাপ। এবং ঘোড়ার লেজেও লাগানো হতো দামি আতর। তৎকালে সুগন্ধি শিল্পের বিস্তারে বেগম লুৎফুননেসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়। অতীতে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের পক্ষ থেকে খাদেমরা প্রাসাদে আগত অতিথিদের পায়ে সুগন্ধি তেল মাখিয়ে প্রাসাদে স্বাগত জানাতেন।



লেখা : নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা