শৈলী

শৈলী


উইন্ড ব্লোজ

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯      
প্রধানত কন্টিনেন্টাল ফুড তৈরি হয় এখানে। সঙ্গে রয়েছে ইতালিয়ান ও মেক্সিকান। কন্টিনেন্টালের দুর্দান্ত স্বাদ নিতে স্টেক অর্ডার করলাম। অল্প সময়েই চলে এলো তাজা মাংসের স্টেক। সঙ্গে সস আর ম্যাশড পটেটো। লিখেছেন সারাহ্‌ দীনা; ছবি তুলেছেন ইফতেখার ওয়াহিদ ইফতি

শহরের মানুষ ভীষণ ব্যস্ত। দিবস রজনী কাজেই কেটে যায়। হঠাৎ বাড়ি ফিরতি পথে মন হাহাকার করে একটুখানি নিজের মতো সময়ের জন্য। নগরে ঘরের বাইরে তেমনভাবে সময় কাটাতে রেস্তোরাঁই পছন্দের তালিকায় প্রথম দিকে। আর কোথায়ই বা দু'দণ্ড ভাবনা কিংবা গল্পের অবকাশ রয়েছে?

উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ২৬ নম্বর বাসায় শহুরেদের প্রিয় সময়ের আকাঙ্ক্ষায় 'উইন্ড ব্লোজ' নামের রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। রেস্তোরাঁর পরিবেশটা বেশ ভিন্ন। দরজা খুলতেই এক টুকরো শিল্পজগৎ। বিশাল ক্যানভাসে যাপিত জীবনের নানা চিত্র। হালকা চালের সুমধুর লয়। উষ্ণ অভ্যর্থনায় মন ভরে গেল টেবিলে বসতেই। এক গ্লাস ঠাণ্ডা শরবত হাজির হয়ে গেল না চাইতেই। প্রথমেই উইন্ড ব্লোজের ওয়েলকাম ড্রিঙ্ক। প্রধানত কন্টিনেন্টাল ফুড তৈরি হয় এখানে। সঙ্গে রয়েছে ইতালিয়ান ও মেক্সিকান। কন্টিনেন্টালের দুর্দান্ত স্বাদ নিতে স্টেক অর্ডার করলাম। অল্প সময়েই চলে এলো তাজা মাংসের স্টেক। সঙ্গে সস আর ম্যাশড পটেটো। খাবারের তালিকায় দেখে নিলাম দরদাম। কেননা, মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে যেদিন ক্লান্তি ভর করে, সেদিন শুধু খাবারের নাম দেখেই পছন্দ করে নেওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে বেশিরভাগ মানুষ চোখ বুলিয়ে যায় খাবারের নাম আর দামের দিকে। বেশ আয়ত্তেই রয়েছে। খাবারের দামের শুরু তিনশ' টাকা দিয়ে।

উইন্ড ব্লোজ শুধু যেন খাবার পরিবেশনে আয়ের পথ তৈরির চেষ্টা নয়। রয়েছে বিস্তৃত অভিপ্রায়। উদ্যোক্তা লিটন করের সঙ্গে গল্পে বসে তেমনটাই জানলাম। তিনি বলেন, 'শুধু খাবার পরিবেশনেই তৃপ্ত নই। একই সঙ্গে শিল্পচর্চাতেও রাখতে চেয়েছি অবদান। তৈরি করতে চেয়েছি এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষ খাবারের স্বাদ নিতে নিতে সময় কাটাবে প্রিয় মানুষের সঙ্গে। চলবে গল্প। হবে আড্ডা আর যুক্তিতর্কের দারুণ ক্ষণ। আমরা মানুষের খাওয়ার সঙ্গে মনের খাওয়া তৈরিতে মনোযোগী।'

প্রশ্ন করলাম, যদি কেউ একা সময় কাটাতে চায়, নিজের মনে হারিয়ে গিয়ে কিংবা প্রিয়জনের অপেক্ষায়, সেটি নিয়ে কী পরিকল্পনা? লিটন কর বললেন, 'একান্ত ভাবনায় একলা হতে চাওয়া মানুষের জন্য তাই বই রেখেছি। প্রতিটি টেবিলের পাশেই সাজানো আছে বই। লাইব্রেরি মনের জানালা খুলে দেয়। বইয়ের পাতার চরিত্র অনায়াসেই হয়ে উঠতে পারে সঙ্গী। মোবাইল ফোনে ঘাড় গুঁজে এখানে খাবার মুখে দিতে হবে না। বরং সাদা পাতার কালো অক্ষরে হারানো যাবে।' তিনি জানালেন আরও একটি চমৎকার তথ্য। বললেন, 'চাইলে বই নিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু রয়েছে বিনিময় প্রথা। বইয়ের বদলে বই দিলে তবেই পাওয়া যাবে।'

উইন্ড ব্লোজের উদ্যোগ গ্রহণ সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ছে। ব্যক্তিগত হয়ে পড়েছি আমরা। কমে গেছে গল্প। জানতে, জানাতে দু'ক্ষেত্রেই আমরা সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছি। এর থেকে বেরিয়ে আসার কথা ভেবেছি বহু বছর। তারপর শুরু করেছি উইন্ড ব্লোজ। সামাজিক জীবনে সাংস্কৃতিক প্রভাব ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখতে চাই। সবখানে দরকার মনের আহারের ব্যবস্থা। তবেই মানুষ মানুষের জন্য ভাববে। ভালোবাসবে।'

খাওয়া শেষে মূল্য পরিশোধ। এভাবেই তো রেস্তোরাঁ আর খাদ্য রসিকের সম্পর্ক শেষ হওয়ার কথা। এটাই তো চল। কিন্তু উইন্ড ব্লোজ সম্পর্কের লেনদেন চুকাতে চায় না। বরং গড়তে চায়। তাই তো শেষের পরও কথা থাকে। অরিগ্যামি পাখি তাই টেবিলে। এটি উপহার। ক্রেতা আর বিক্রেতার মধ্যে সম্পর্কের গল্পের ইতি না টানার আয়োজন। এ প্রসঙ্গে লিটন কর বলেন, সম্পর্ক তৈরিতে বিশ্বাসী আমরা। তাই নিজেরাই তৈরি করি এ উপহার। রেস্তোরাঁর স্টাফরা তাদের সৃজনী ক্ষমতায় এ কাজে মনোনিবেশ করেছেন। তবে আমাদের সঙ্গে গ্রাহকরাও আমাদের পরিবার। তাই তো অরিগ্যামি পাখি তৈরি করে নিয়ে আসেন একজন। এভাবেই তৈরি হয় উইন্ড ব্লোজের পরিবার। আত্মীয়তার বাঁধনে বাঁধা পড়ে বারবার দেখা হওয়ার প্রত্যয়ে অপেক্ষায় থাকে উইন্ড ব্লোজ।