লক্ষ্য যখন অক্সফোর্ড

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০১৯      

শৈশবের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে হাসপাতালে। তীব্র হাঁপানি থাকায় হাসপাতাল আর বাসা ছাড়া কোথাও যাওয়ার তেমন সুযোগ হয়নি। ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাইনি। তবে একটি বিজ্ঞানের বইয়ে থাকা বিমান ও রকেটের ছবি দেখতাম আর ভাবতাম একদিন আমিও বানাব আমার রকেট। সেখান থেকেই আমার আজকের এই স্বপ্নের জন্ম। এত বাধা অতিক্রম করে আজকের এই অর্জনের গল্প বলেছিলেন হাসান সাদ ইফতি। লিখেছেন সানজিদা ইমু

ইফতি বলেন, 'ধীরে ধীরে পড়াশোনা আয়ত্তে আসতে থাকে। ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজ থেকে যথাক্রমে জিপিএ ৫ পেয়ে মাধ্যমিক এবং গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করি। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) প্রকৌশল ও স্থাপত্য উভয় বিষয়েই একটি করে স্থান পাই। ভর্তি হই যন্ত্রকৌশল বিভাগে। তবে স্বপ্ন ছিল উড়ন প্রকৌশল (Aerospace Engineering) পড়ার। তাই বুয়েটে ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই চলে যাই জার্মানির স্টুটগার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে আছে উড়ন প্রকৌশল বিষয়ে ইউরোপের বৃহত্তম অনুষদ। সেখানে আমার সম্পূর্ণ পড়াশোনা ছিল জার্মান ভাষায়। স্টুটগার্টে উড়ন প্রকৌশল পড়ার সময়ই পৃথিবীর বৃহত্তম যাত্রীবাহী বিমান, Airbus A380  নিয়ে গবেষণা করার জন্য নির্বাচিত হই। জার্মানির হামবুর্গ শহরে এক বছরের জন্য গবেষণা করি এই বিমানটির হাইড্রোলিক সিস্টেমের ওপর। আমার গবেষণার ফলাফল প্রতিটি নতুন Airbus A380 তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ সাশ্রয় করার সুযোগ হয়েছে। এরপর মাস্টার্স করতে আবার ফিরে আসি স্টুটগার্টে। এখানে বিমান ও রকেটের ইঞ্জিন এবং তীব্র গতিসম্পন্ন বিমান ও রকেট বিষয়ে বিশেষ ডিগ্রি লাভ করি। এই ডিগ্রির গবেষণার অংশটি করি আমেরিকার অ্যারিজনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার অর্জনগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। স্টুটগার্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে আমেরিকা পাঠানো হয় দুটি দেশের মধ্যে উড়ন প্রকৌশল বিষয়ে উন্নয়নের লক্ষ্যে। এর আওতায় আমেরিকায় জার্মানদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আমাকে অর্থাৎ প্রথমবারের মতো কোনো নন-জার্মানকে নির্বাচিত করা হয়।

বর্তমানে ইফতি অক্সফোর্ডে তীব্রগতির যাত্রীবাহী বিমান ও রকেট নিয়ে গবেষণা করছে পিএইচডি ডিগ্রির আওতায়। সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ইফতি বলেন, এই বিমান বা রকেটগুলো শব্দগতির চেয়ে পাঁচগুণ বা এরও অধিক গতিতে যাবে। আমার গবেষণার ক্ষেত্রটি হাইপারসোনিক্স (Hypersonics) হিসেবে পরিচিত। আমাদের গবেষণা সফল হলে মানুষ ২ ঘণ্টায় পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে পৌঁছে যাবে।

ইফতি বলেন, আমার অক্সফোর্ডে আসার গল্পটি বেশ মজার। গবেষণার জন্য আমেরিকা যাওয়ার আগে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডেও যাওয়ার ডাক পেয়েছিলাম। তা গ্রহণ না করলেও সেখানে পিএইচডি করার ইচ্ছা ছিল এক্সপেরিমেন্টাল হাইপারসোনিক্স বিষয়ে। আমার ভালো ধারণা ছিল, আমি কী বিষয়ে গবেষণা করতে চাই। একদিন দুপুরে ওদের ওয়েবসাইট ঘাঁটতে ঘাঁটতে ওদের সাবেক এক ছাত্রের পিএইচডি প্রবন্ধ চোখে পড়ে। পড়ে খুব ভালো লাগল। পুরোটা পড়লাম। খুব বেশি না ভেবে উনাকে ই-মেইল করে ফেললাম। বললাম, তার কাজ আমার ভালো লেগেছে। আমার কাজ নিয়ে কিছুটা তথ্য দিয়ে তার সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। এরপর আরও খোঁজ নিয়ে দেখলাম উনি অক্সফোর্ডে চলে গেছেন। এরই মধ্যে পরদিনই আমাকে লিখলেন উনি। বললেন, সামনে উনি জার্মানি আসবেন এবং সেখানেই আমার ইন্টারভিউ নেবেন। সাক্ষাৎ হওয়ার পর আমাদের ভালোই জমেছিল। অনেক ভালো গবেষণা করা যাবে- আমরা দু'জনেই একমত। তবে অক্সফোর্ডে কেন্দ্রীয়ভাবে চান্স পেতে হয় এবং স্কলারশিপ পাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত, যদি ইউরোপীয় না হয়ে থাকে ছাত্র বা ছাত্রীটি। তবুও কেবল অক্সফোর্ডের এই একটি পিএইচডিতেই আবেদন করি। অতঃপর অক্সফোর্ডের ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট থেকে ফুল স্কলারশিপসহ পিএইচডির সুযোগ হয় ২০১৬ সালে, আমার প্রিয় সেই গবেষকের সঙ্গে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ইফতি বলেন, অক্সফোর্ডে বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা খুব কম।

[বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়]

পরবর্তী খবর পড়ুন : চিঠি এলো

অন্যান্য