ঘুরতে খুব ভালোবাসি

মেধাবী মুখ

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০১৯      

সানজিদা ইমু

'খুব সাধারণ এবং সহজ-সরল সৎ এক কৃষক বাবার সন্তান আমি। মা গৃহিণী। পরিবারে পড়াশোনা বলতে বড় আপু এসএসসি দিয়ে সংসারে পা রাখে এবং ইতি টানে পড়াশোনায়। আমাকেও ওই স্কুল বা সর্বোচ্চ টেনেটুনে এসএসসি পর্যন্ত নেওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু আমার আব্বার সাপোর্টে আজ আমি আপনাদের সামনে কথা বলতে পারছি।' নিজের ছোটবেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথাগুলো বলেছিলেন শিলান্যাস হাফসা। হাফসা বলেন, 'আব্বা ভালোবেসে আমার জন্মের পর থেকেই আমাকে সবসময় 'মা' বলে ডাকেন এবং আমাকে সব কাজে সাপোর্ট এবং অনুপ্রেরণা জোগান। সমাজের সবাই যখন বলছিল মেয়ে মানুষ অত পড়াশোনা করানোর দরকার নেই, বিয়ে দিয়ে দাও- তখন আব্বা এর প্রতিবাদ করেন এবং বলেন, আমার মেয়ে যতদূর পড়তে চায় পড়ুক। ক্লাস ওয়ান থেকে আজ পর্যন্ত আমার পড়াশোনার খরচ দিচ্ছেন, এমনকি শেষ পর্যন্ত নিজের আবাদি জমি বিক্রি করে আমার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। তিনি বলেন, 'মাধ্যমিক পাস করেছি ২০১০ সালে। গ্রামের বাড়িতে মানুষ। ইচ্ছা ছিল গাজীপুরের সবচেয়ে স্বনামধন্য সরকারি কোনো স্কুলে পড়ব, কিন্তু স্কুল বাসা থেকে দূরে হওয়ায় মেয়ে মানুষ অত দূরে যাওয়া ঠিক হবে না। এই ভাবনা থেকে আমাকে কোনো স্কুলে অ্যাডমিশন টেস্ট দেওয়ানো হয়নি। বাড়ির পাশের একটি স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হলো। এসএসসির রেজাল্ট ভালো হওয়ায় গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানেও প্রথম সেমিস্টার ছাড়া প্রতি সেমিস্টারে প্রথম (ব্যবসায় শিক্ষা শাখায়) হওয়ার পাশাপাশি এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হই, পেয়েছিলাম বোর্ড বৃত্তিও। নিজে জোর করে বাবার সাপোর্টে এক বান্ধবীর সহায়তায় ফার্মগেট অ্যাডমিশন কোচিংয়ে ভর্তি হই। সেটাই ছিল আমার প্রথম ঢাকা যাওয়া। প্রতিদিন জয়দেবপুর থেকে ঢাকা গিয়ে কোচিং করতাম। ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডমিশন টেস্ট দেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে, আমার কলেজ শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় এবং সবার দোয়ায় আমার ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়েই চান্স হয়। তারপর সবদিক বিবেচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয় আমার নতুন ঠিকানা। হাফসা বলেন, 'একাডেমিক পড়াশোনা ছাড়াও গল্প, উপন্যাসের বই পড়তে ভালোবাসি। হুমায়ূন আহমেদ, জহির রায়হান, শরৎচন্দ্রের লেখা আমার প্রিয়। আমি ঘুরতে খুব ভালোবাসি। নতুন জিনিস জানতে ভালোলাগে, তাই আদিবাসীদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে তাদের সঙ্গে মিশেছি, ঘুরে বেড়িয়েছি। যেহেতু ঘুরতে ভালোবাসি এবং পর্যটন নিয়ে আমার পড়াশোনা তাই অনেক ঘুরে বেড়ানো, নতুন পর্যটন স্থান পরিদর্শন এবং বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে বিস্তর জানার চেষ্টা করছি প্রতিনিয়ত।'

হাফসা ২০১৮ সালে তার নিজ ডিপার্টমেন্ট 'ট্যুরিজম এবং হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট'তে সর্বোচ্চ সিজিপিএ 'এ' অর্জন করায় পেয়েছেন ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের 'ডিনস অ্যাওয়ার্ড ২০১৮'। এ ছাড়া তার আবাসিক হল বাংলাদেশ কুয়েত-মৈত্রী হলের 'মৈত্রী হল ফাউন্ডেশন' থেকে পেয়েছেন মৈত্রী হল স্বর্ণপদক-২০১৭। তিনি আরও বলেন, 'আমার স্বপ্ন একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সর্বদা তাদের পাশে থাকা এবং আমার শিক্ষকদের স্বপ্ন পূরণ করা।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে অবদান রাখার মতো দক্ষ করে নিজেকে গড়ে তোলা। আমি দেশ, মানুষ এবং সমাজসেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই আজীবন, পাশে দাঁড়াতে চাই অসহায়, এতিম শিশুদের, হতে চাই তাদের সুখ-দুঃখের সাথী। সর্বোপরি একজন প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে চাই, মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে চাই। বোঝা নয়, সম্পদ হতে চাই দেশের।'

পরবর্তী খবর পড়ুন : একুশ পেরিয়ে বাইশ

অন্যান্য