ভিয়েতনামের বড়শি

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০১৯      

সাদিকুল নিয়োগী পন্নী

এক.

ভিয়েতনামে নাকি অনেক ভালো বড়শি পাওয়া যায়। তুই আমার জন্য ভালো দেখে একটা বড়শি নিয়ে আসবি। আর সঙ্গে এক রিম সুতা।

দু'বছর আগে ভিয়েতনাম যাওয়ার সময় বাবা আমাকে বললেন।

আমি বললাম, বাবা, ভিয়েতনামে বড়শি পাব কোথায়?

আরে, যাচ্ছিস হ্যানয় শহরে। ওই শহরে শুনেছি অনেক লেক আছে। সেখানে অনেক মাছ শিকারিও আছে। খুঁজলেই পেয়ে যাবি।

বাবা, ভিয়েতনামের লোকজন তো বাংলা-ইংরেজি কিছুই বোঝে না। কিনব কীভাবে?

আরে, তুই আকার-ইঙ্গিতে বড়শির কথা বলবি। না পারলে আমাকে ফোনে ধরিয়ে দিস আমি বুঝিয়ে দেব।

দুই.

ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় এক আজব শহর। নিজ দেশের ভাষা ছাড়া শিক্ষিতরাও তেমন ইংরেজি বোঝেন না। তাই বড়শি কেনা নিয়ে মহাবিপদে পড়ে গেলাম। সপ্তাহখানেক বিভিন্ন দোকানে ঘুরে বড়শির কোনো সন্ধান পেলাম না। ভিয়েতনাম থেকে ফেরার কয়েকদিন আগে পরিচয় হলো কলকাতার মান্নান নামে একজনের সঙ্গে। তিনি আমার কথা শুনে বললেন, এখানের লোকজন তো বেশিরভাগ ইলেকট্রিক্যাল বড়শি ব্যবহার করে।

আমি বললাম, আমার তো ভাই অ্যানালগ বড়শি লাগবে।

তাহলে আপনি জং ডুয়াং মার্কেটে যান। সেখানে পেতে পারেন। তবে দোকানে অবশ্যই ভিয়েতনামের ভাষায় বড়শি চাইতে হবে।

ভিয়েতনামের ভাষায় বড়শিকে কী বলে? আমি জানতে চাইলাম।

মান্নান ভাই বললেন, 'কু কা'।

আমি শুনলাম 'গু' খা। তাই রেগে গিয়ে বললাম, আপনি আবেগ নিয়ে মজা করছেন। আমাকে 'গু' খেতে বললেন? দেশের মাটিতে হলে আপনাকে কিল-ঘুষি দিয়ে বসতাম।

মান্নান ভাই হাসতে হাসতে বলেলেন, আরে 'গু' খা বলিনি। 'কু কা' বলছি। এই কথার মানে বড়শি।

আমি কিছুটা লজ্জা পেলাম। বিদেশের মাটিতে এসে 'গু' নিয়ে কথা বলাটা বেশ বেমানান।

তিন.

হ্যানয় শহরের জং ডুয়াং মার্কেটে পাইকারি-খুচরায় প্রায় সব ধরনের জিনিস পাওয়া যায়। এই মার্কেটে হাতে গোনা দুয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই নারী দোকানদার। আমি মার্কেটে ঢুকলাম। এখানে কেনাবেচা হয় স্থানীয় মুদ্রা ডং দিয়ে। আমাদের গুলিস্তান বা বঙ্গ মার্কেটের মতো সব কিছুতে চলে দামাদামি। বলতে গেলে প্রতিটি দোকানে ডং নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ঢং করতে হয়। আমি মার্কেটে কয়েক ঘণ্টা ঘুরে বিভিন্ন জিনিস কিনলাম। কিন্তু বড়শির দোকান কোথাও চোখে পড়ল না। মান্নান ভাইকে ফোন দিলাম। ওনার পরামর্শ মতো মার্কেটের সামনের গলির দোকানগুলোতে গেলাম। সেখানে মাছ ধরার সরঞ্জাম সংবলিত বেশ কিছু দোকান দেখতে পেলাম। আমি দোকানে গিয়ে বললাম, হেভ এনি ফিশিং রিং?

দোকানদার উত্তর দিলেন, নো ইংলিশ।

আমি বলাম, বড়শি আছে?

তাতেও দোকানদার চুপ।

মান্নান ভাই যে কী বলে দিয়েছিলেন তা আমার কিছুতেই মনে হচ্ছিল না। আমার মাথায় ঘুরছে কেবল 'গু' খা। কিন্তু এই কথা বলারও সাহস পাচ্ছি না। যদি বুঝে ফেলে তবে বিদেশের মাটিতেই মার খেতে হবে।

আমি রিস্ক নিয়ে ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে বললাম, হেভ এনি গু খা?

ওহ নো।

অনেকে বলছে দেশের বাইরের লোকজন বড় বাক্যের ইংরেজি বোঝে না। বিশেষ করে দোকানদার ও সাধারণ মানুষ।

এবার আমি গলার জোর বাড়িয়ে বললাম, গু খা, গু খা, গু খা...

আমার কথা শুনে ভদ্রলোক হাসি দিয়ে এক বক্স বড়শি দিলেন। আমি আনন্দিত হলাম। এই আনন্দের কারণ অবশ্য দুটি। প্রথমত বাবার সেই কাঙ্ক্ষিত বড়শি। আর দ্বিতীয়ত, এমন একটা বাজে জিনিস খেতে বললাম, আর সে খুশিতে গদগদ হয়ে গেল।

দোকান থেকে আমি বিভিন্ন সাইজের বেশ কয়েকটি বড়শি নিলাম। সুতা কিনতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। কারণ দোকানের একটি শেলফে সুতার রিম সাজানো ছিল।

চার.

ভিয়েতনাম থেকে দেশে ফেরার পর সবার জিনিসপত্র বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম। বাবাকে একটা পারফিউম দিয়ে বললাম, এটা তোমার জন্য।

বাবা বললেন, আমার বড়শি কই?

আমি বড়শির একটা বক্স এবং সুতার রিম তার হাতে দিয়ে বললাম, এই নাও।

বাবা বেশ খুশি হলেন। তারপর আগ্রহ নিয়ে বললেন, ওখানে বড়শিকে কী বলে?

আমি আবার ভুলে গেছি সেই ভাষা। বারবার চেষ্টা করেও মনে করতে পারছি না।

বাবা আবার বললেন, আরে ভিয়েতনামিরা বড়শিকে কী বলে?

বাবা রাগী মানুষ। না বললে ক্ষেপে যাবেন। তাই যা মনে এলো তাই বলে ফেললাম, 'গু' খা।

বাবা বড়শির বক্স ও সুতার রিম আমার মুখের ওপর ছুড়ে মেরে বললেন, কী বললি তুই আমারে?

বাবা, তোমারে না। ওই দেশে বড়শিকে এটাই বলে।

বাবা শান্ত হলেন। বড়শির বক্স ও সুতার রিম কুড়িয়ে হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, কী আজব দেশরে বাবা! এমন সুন্দর একটা বড়শিকে ওরা কী বাজে নামেই ডাকে! অন্য কিছু দিলেই পারত।

আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানালাম।

পরবর্তী খবর পড়ুন : মোকাবেলায়ও চাই মাইলফলক

অন্যান্য