সুখনিদ্রা ও মশা মশাই

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০১৯      

মো. মাহমুদুল হাসান

জ্বলন্ত কয়েলের ওপর একটা মশা বসে আছে। এই 'অষ্টম আশ্চর্য' দেখানোর জন্য গিন্নিকে ডাক দিতেই একটা ঝাড়ি খেলাম।

নাহ্‌, আপনারা যা ভাবছেন ঠিক তা না। গিন্নি আমাকে ঝাড়ি দেয়নি। ঝাড়িটা দিয়েছে মশা! তাও গুনগুন সুরে না, এক্কেবারে হাইড্রোলিক হর্নের সুরে।

আমি চমকে উঠলাম। কিছু বলতে যাব ভেবে হা... করলাম। কিন্তু আমাকে থামিয়ে দেওয়া হলো। কামড়ের ভয়ে থেমে গেলাম। মানুষের কামড়ের ভয়ে থামতে থামতে এখন মশাদের কামড়ের ভয়েও থেমে যাই; থামতে হয়।

কিন্তু থামিয়ে দিয়েই সে ক্ষান্ত হয়নি; 'বুদ্ুব্দ' বলে একটা গালিও দিয়েছে, যেটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আরও অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম যখন সে নাকের ডগায় বসে জবানবন্দি নেওয়া শুরু করল...

-বল, মশা নিধনে বছরে ৫০ কোটি টাকা কীভাবে ব্যয় করেছিস?

-মশাই, টেনেটুনে ফ্লোরিডাতে একটা বাড়ি কেনার পর যা ছিল, তা দিয়ে হালকা-পাতলা পানিফুর্তি করেছিলাম। আমারে ছাইড়া দেন। আমি আপনাদের বংশবিস্তারে কোনো প্রকার ব্যাঘাত ঘটাইনি। ছাইড়া দেন...।

-ফগার না ঠগার মেশিন দিয়ে কী যেন ছিটাইলি? ওসব কী?

-হে-হে-হে... ওসব তো বস্‌ ডেটলেস ওষুধ। পাবলিক টয়লেটের পানিও বলতে পারেন। দেখেন নাই, আপনার গুলুগুলু বাবুরা সেসবের মাঝে কেমন ডিগবাজি খাচ্ছিল। উত্তর সিটি থেকে দক্ষিণ সিটি আবার দক্ষিণ থেকে উত্তর সিটিতে কত কিউট করে ম্যারাথন দৌড় দিছিল? পুরো দেশেই তো এখন আপনাদের জয়জয়কার। যদি সত্যি সত্যি ওষুধ হতো, তাহলে কি আপনাদের এই জয়রথ এতদিন অব্যাহত থাকত?

-হুম, সাব্বাস বেটা! তো, পরের বাজেটে প্ল্যান কী?

-বিশ্বাস করুন মশাই, আপনাদের কোনো ক্ষতি করার প্ল্যান আমার নাই। আপনারা নিশ্চিন্তে এখানে বসবাস করুন, বংশবিস্তার করুন। আপনাদের যা যা সাপোর্ট লাগে, আমি দেব। প্রয়োজনে বিশেষ টিম গঠন করে পথে-ঘাটে, রাস্তার ধারে অগুনতি ড্রাম সাজিয়ে রাখব। আপনারা অত্যন্ত সুস্থ পরিবেশে বংশবিস্তার করবেন, সন্তানাদি লালন-পালন করবেন। এর পর যা বাঁচবে তা সুইস ব্যাংকে... হে-হে-হে।

প্ল্যানটা মশা মশাইয়ের পছন্দ হলো না। নাকের ডগা থেকে গালের তুলতুলে জায়গায় এসে কষে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। 'হারামজাদা, চুরি ছাড়া কিচ্ছুই তো শিখসনাই' বলে একটা হুল ফুটাতে গিয়েও ফুটাল না।

আমি হলাম মশাদের ঘরের লক্ষ্মী। ঘরের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে নেই! তাই মশা মশাই আমাকে কামড়াল না, পায়ে ঠেলল না।

বরং আমাকে একটা প্ল্যান বাতলে দিল- পরের বাজেটে আমাদের জন্য একটা ব্লাড ব্যাংক খুলবি। সকাল-দুপুর-বিকেলে বউ-বাচ্চা নিয়ে আমরা সেখানে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও ডিনার করব। আমাদের গুলুগুলু বেবিরা সেখানে গিয়ে গ্লাসে গ্লাসে স্ট্রবেরি ফ্লেভারের ব্লাড খাবে। আজকাল তোদের জাত ভাইয়েরা কেমন যেন সচেতন হয়ে গেছে! দিনের বেলায়ও মশারি টাঙিয়ে ঘুমায়। আমাদের অনেকে রক্ত না পেয়ে কলা আর কলাগাছের পানি খেয়ে দিন যাপন করছে। কেউ কেউ সেটাও পাচ্ছে না। তাদেরকে নিয়েও আমাদের ভাবতে হয়। তোদের তো শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবলেই চলে; আমাদের চলে না।

আর শোন্‌, ফ্লোরিডা না কী যেন? নামটাতে কেমন একটা ভিআইপি ফ্লেভার আছে। জায়গাটা আমি চিনি না। আমাকে চিনিয়ে দিস। যদি ভিসা-পাসপোর্ট লাগে, করে নিস। এখানেও আবার দু'নম্বরি করিস না। গলাকাটা পাসপোর্ট না, পিওর পাসপোর্ট করবি। না হলে কিন্তু হুল ফুটিয়ে দেব।

আমি ভিসা-পাসপোর্টে অহেতুক টাকা খরচ করার পক্ষে না। মশা মশাইকে ফ্যামিলিসহ আমার ব্যাগে করে ফ্লোরিডা নেওয়ার প্রস্তাব দিলাম। কিন্তু মশা মশাই এবার আর আমার চুরির প্ল্যান সহ্য করল না। কুট্টুস করে ঠিক নাকের ডগাতেই হুল ফুটিয়ে দিল। অমনি আমার সুখনিদ্রাখানা ভেঙে গেল!

হরাজ ফুলবাড়িয়া, সাভার, ঢাকা

পরবর্তী খবর পড়ুন : চোখ টিপের পরিণতি

অন্যান্য