প্যাচআল

প্যাচআল


প্রাক্তন

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০১৯      

রায়ান মুনতাসির

সেদিন মধ্য দুপুরে নাঈমের প্রাক্তন অনু কোনোরকমের ভূমিকা ছাড়াই নাঈমকে মেসেজে সরাসরি জানাল যে, সে তার লাইফে ব্যাক করতে চায়। অবাক হয়ে মেসেজটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকল নাঈম। মিনিট খানেক ভাবল, কী করা যায়। তারপর সিদ্ধান্ত নিল, সরাসরিই উপসংহারে গিয়ে সে জানিয়ে দেবে যে, তাদের মধ্যে কোনো কিছুই আর সম্ভব না।

কিন্তু পরক্ষণেই নাঈম তার সিদ্ধান্ত পাল্টাল। তার মাথায় অন্য একটা বুদ্ধি এসেছে। সে ভাবল, এই সুযোগে প্রাক্তনকে একটা শিক্ষা দিতে পারলে মন্দ হয় না। প্রতিটি সম্পর্ক ভাঙার পর ছেলেমেয়ে দু'জনেই অপর পক্ষকে দোষারোপ করে। তারা ভাবে, সম্পর্ক ভাঙার পুরোটা দায় ওপাশের মানুষটার। নাঈমেরও তাই ধারণা। তাই সে ভাবল, আগেরবার যেভাবে তার প্রাক্তন তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবার ঠিক সেভাবেই শুরুতে সে ভালো মানুষের অভিনয় করে পরে সেই প্রতারণা ফিরিয়ে দেবে। ন্যাড়া যখন স্বেচ্ছায় দ্বিতীয়বার বেলতলায় আসতে চাইছে, তো আসুক।

নাঈম অনুকে মেসেজের রিপ্লাইয়ে জানাল যে, সে বিষয়টা ভেবে দেখে পরে জানাবে। এটাও নাঈমের একটা চাল। কারণ সে সঙ্গে সঙ্গেই হ্যাঁ বলে দিলে অনু হয়তো সন্দেহ করত। ভাবত, তাতে তার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য হয়তো আছে। কিন্তু অনু নাঈমকে পরে ভাবার সুযোগ দিল না। অনু জানাল সে এখনই একবার নাঈমের সঙ্গে দেখা করতে চায়। সামনাসামনি কথা বলে একটা সমাধানে পৌঁছতে চায়। নাঈম মনে মনে দ্বিধায় ভুগলেও শেষ পর্যন্ত দেখা করতে রাজি হয়ে গেল। কারণ তাকে প্রতিশোধ নিতে হলে শুরুতে ভালোমানুষ সেজে থাকতে হবে। প্রাক্তনের মন রেখে চলতে হবে। না হলে কখন আবার শিকার হাতছাড়া হয়ে যায়!

সম্পর্কে থাকাকালীন নাঈম আর অনু প্রায়ই একটা রেস্টুরেন্টে দেখা করত। আজও সেখানে দেখা করার কথা হলো। নাঈম এসে দেখে আগে থেকেই অনু রেস্টুরেন্টের একটা টেবিলে বসে আছে। আহা, সেই টেবিলটা! যে টেবিলে একসঙ্গে তারা দু'জনে অনেক সন্ধ্যা পার করেছে! কত স্মৃতি জমে আছে। অনেক দিন পর অনুকে দেখে বুকে ছোট্ট একটা ধাক্কা খেল নাঈম। অনেক স্মৃতি একের পর এক হৃদয়পটে ভাসতে থাকল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল নাঈম। তাকে ইমোশনাল হলে চলবে না। সে এসেছে প্রতিশোধ নিতে।

ধীর পায়ে অনুর কাছে এগিয়ে এলো নাঈম। পাশে দাঁড়িয়ে অনুর দিকে তাকিয়ে মুগ্ধকণ্ঠে বলল, তুমি অনেক সুন্দর হয়ে গেছ।

অনু মুখে কিছু বলল না, মিষ্টি একটা হাসি দিল শুধু। তারপর বলল, বসো।

অনুর সামনের সোফায় বসল নাঈম। কে কেমন আছে-নেই- এই বিষয়ক ফর্মালিটি সারার পর অনু বলল, ক্ষিদে পেয়েছে, আগে খেয়ে নিই, বাকি কথা খাওয়ার পর হবে।

নাঈমের নিজেরও ক্ষিদে পেয়েছে, তাই সে সম্মতি দিল। প্রতিশোধ যখন নেবেই, তাড়াহুড়া করার দরকার নেই। ওয়েটার এসে খাবারের অর্ডার নিয়ে গেল।

অনু নিজে পছন্দ করে অনেক খাবার অর্ডার করেছে। আর এখন এমনভাবে খাচ্ছে যেন সে অনেক দিনের অভুক্ত। নাঈম খেতে খেতে বার কয়েক বাঁকা চোখে তাকাল অনুর দিকে, কিন্তু মুখে কিছু বলল না। খাওয়া শেষে ওয়েটার বিল দিয়ে গেল। একবার বিলের দিকে তাকিয়ে অনু আর নাঈম দু'জনেই একে অপরের দিকে তাকাল। নাঈম একবার ভাবল, প্রতিশোধের প্রথম ধাপ হিসেবে পুরো বিলটাই অনুর ঘাড়ে উঠিয়ে দেবে। কিন্তু পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত পাল্টাল সে। শুরুতেই সে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। এখন তাকে শতভাগ ভালোমানুষের অভিনয় করতে হবে। প্রাক্তনের সব কিছু রয়ে সয়ে নিতে হবে। প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে খাবারের বিল পরিশোধ করে দিল নাঈম। ওয়েটার বিল নিয়ে চলে গেল। এখন অনু আর নাঈমের তাদের নিজেদের ব্যাপারে আলোচনা করার সময়।

দু'জনের খানিকক্ষণের নীরবতা ভেঙে প্রথম কথা বলে উঠল অনু। অনু বলল, নাঈম, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।

অনুর দিকে চোখ তুলে তাকাল নাঈম। নাঈম জানে, অনু কী বলতে চায়। অনু এখন ইনিয়ে বিনিয়ে আগের সবকিছুর জন্য ক্ষমা চেয়ে নাঈমের লাইফে ব্যাক করতে চাইবে।

সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে একটা ভাব নিয়ে নাঈম বলল, বলো।

একটু সময় নিল অনু। তারপর বলল, আসলে আজ হোস্টেলে ভালো রান্না হয়নি। এদিকে মাসের শেষ হওয়ায় হাতেও টাকা নেই। কিন্তু হঠাৎ করে খুব ইচ্ছা হলো বিরিয়ানি খাওয়ার। তাই ভাবলাম বিষয়টা তোমার ওপর চাপিয়ে দিই। আমার রুমমেট বান্ধবী বাজি ধরেছিল আমি তোমাকে ম্যানেজ করতে পারব না। বাজিতে জিতে এখন রাতে আবার বিরিয়ানি খাব বান্ধবীর টাকায়। তুমি কী করে ভাবলে তোমার মতো একটা প্রতারকের লাইফে আমি আবার ব্যাক করব?

তারপর অতি চালাক নাঈমকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বিজয়ীর হাসি হেসে অনু রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল। আর প্রতিশোধ নিতে এসে উল্টো নিজেই ফাঁদে পড়ে বেচারা নাঈম প্যান্টের পেছনের পকেটে মানিব্যাগের ওপর হাত রেখে চোখ উল্টে রেস্টুরেন্টের সোফায় পড়ে রইল!



হকক্সবাজার মেডিকেল কলেজ