জগলুর বিদায় পিতিবি

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০১৯      

রবিউল ফিরোজ

সুন্দর এই পৃথিবী যদি এক নিমিষে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে কী হবে টাকা-পয়সা কামাই করে? কী হবে জীবনে এত সাজসজ্জা করে? মরে গেলে দুনিয়াদারি সব কিছু পড়ে থাকবে। মার্চের ৫ তারিখে দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে- এইটা কি গুজব নাকি সত্যি? ধন্দে পড়ে যায় জগলু মিয়া। ঘরে-বাইরে বাসে-ট্রেনে একই কথা, একই আলোচনা। জগলু মিয়া সত্যি-মিথ্যা জানার জন্য খবরের কাগজ কেনে। সেখানেও দেখতে পায় একই খবর- পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। জগলু বিয়েশাদি করেনি। মনটা ভীষণ খারাপ হয় তার। 'সুন্দর পিতিবিখান ছাড়ি পরপারেত চল্যা যাতি হবি'। গুমোট অন্ধকার কবরের কথা ভাবতেই শিউরে উঠে জগলু।

পেঁয়াজের বেপারী জগলু বাড়িতে ঢুকে মনমরা হয়ে। সন্ধ্যায় জাহাঙ্গীরের চা স্টলে ঢুকে এককাপ লাল চায়ের অর্ডার দেয়। ওমা একি কথা! 'এইখানেও সেই দুনিয়াদারি শ্যাষ হওনের খবর'। কান খাড়া করে জগলু। 'কেউ কেউ খবর লিয়া আসিচে। ঘটনা সত্যি'। আলোচনায় যোগ দেয় জগলু মিয়া। সেও সত্যি স্বীকার বলে, 'সত্যি কথাখানই কচু রে কুদ্দুস। আমিও পেপারেত দেকনু'।

বন্ধু হরা এসে আলোচনা তুঙ্গে তুলে দেয়। দু'জনেরই মনের অবস্থা খারাপ। বন্ধু হরা বড় করে শ্বাস ফেলে বলল, 'এত দৌড়াদৌড়ি করতে আর পারিচ্চি না রে জগলু'। বিষণ্ণ বন্ধুর দিকে তাকিয়ে জগলু বলে, 'কী হচে বন্দু?'

- কী আর হবি ক। বাঁচার জন্যি খালি পালাচ্চি। জানে বাঁচতে পারবু তো?

জগলু আবার জিজ্ঞেস করে, ক্যান- ক্যান?

- এই ধরেক পিতিবি শ্যাষ হবার ভয়ে পালাচ্চি। ডেঙ্গু জ্বরের ভয়ে পালাচ্চি আবার গুজবে গণপিটুনির ভয়ে পালাচ্চি। পুলিশের ভয়ে পালাচ্চি আবার সন্ত্রাসীর ভয়েও পালাচ্চি। সাধুর ভয়েও পালাচ্চি, শয়তানের ভয়েও পালাচ্চি। কিন্তু পলায়্যা যামু কই?

হরার কথা শুনে থ হয়ে যায় জগলু। মাথা চুলকিয়ে বলে, 'দুস্তো, চল আমরা ভালো হয়্যা যাই। নেমাজ-রোযা শুরু করি'। হরা প্রস্তাবে বলে, 'আমিও তাই ভাবতিছি'।

পরের দিন থেকে ওরা নামাজ পড়া শুরু করল। নিয়মিত মসজিদে যায়। মানুষকে ভালো হবার কথা বলে। 'দুনিয়াডা কয় দিনের? সামনেই তুমার কব্বর'। সাতসকালে বাজারে গিয়েই দেখা হয় এক মুরব্বির। জগলু বলে, চাচা মিয়া, দুনিয়াডা তো শ্যাষ। তা নেমাজ-টেমাজ পড়েন?

চাচামিয়া মৃদু হেসে বলেন, আরে বাজান, লাখ লাখ ট্যাকা খরচা করি বাড়ির কাছে মজ্জিদ বানাচি, নামাজ না পড়লে হোবে?

- তা চাচা আপনি? চাচামিয়া জগলুকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ছেলেপুলে পড়ে, বাড়ির মিয়্যা মানষে পড়ে, আর গার্জেন না পড়লে চলবে বাজান?

চাচামিয়ার প্যাঁচের কথাতে জগলু নিরাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয়। কিছু কিছু লোক আছে যাদেরকে কথা বোঝানো খুব কঠিন। পেট থেকে সত্যি কথা বের করা আরো কঠিন।

বিকেলে দেখা হয় বন্ধু হরার সঙ্গে। হরা বলে, দুস্তো, ভাইবা দেকনু ট্যাকা-পয়সা নষ্ট কইরা কোনো লাভ নাই। সে জন্যি আমার ছাতা মেরামতির সব পুঁজি দিয়্যা মাছ মাংস দুধ ডিম কিন্ন্যা লিয়াইছি। দুইডা দিন ঘরেত বস্যা বস্যা খালি খাবো। তারপরের দিন ৫ তারিখ শুক্কুরবার মজ্জিদে বস্যা হাসিমুখে মইরা যামু। যা শালা ট্যাকাও শ্যাষ, পিতিবিও শ্যাষ, আমাগের জীবনও শ্যাষ।

হরার কথা শুনে জগলু হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারে না। তবু শুকনো মুখে জিজ্ঞেস করে, ট্যাকা-পয়সা তো সব শ্যাষ কিন্তু পিতিবি যুদি ধ্বংস না হয় তকুন কি খায়্যা বাঁচপু?

- ধুর হ। এত বড় খবর মিছা হতি পারে? যা হোক, রাত্তিরে তুর দাওয়াত। চারডা গুস্তোভাত খায়্যা আসিস।

শুক্রবার সকাল থেকেই মসজিদে যাবার জন্যে প্রস্তুত হয় জগলু। অনেক দিন ধরে তুলে রাখা পাঞ্জাবিটা গায়ে দেয়। টুপি মাথায় দিয়ে সুগন্ধি আতর লাগিয়ে মসজিদের দিকে রওনা দেয়। আজ সেই ভয়াবহ আতঙ্কের ৫ তারিখ। আজই পৃথিবীর শেষ দিন। ধ্বংস হয়ে যাবে সুন্দর পৃথিবী। জগলুর বুকের মধ্যে ঢিব ঢিব শব্দ ক্রমাগত বেজে চলে। ঘনঘন দোয়া পড়তে থাকে- লা ইলাহা ইল্লা আনতা...।

মসজিদে ওর পাশে এসে গুটিসুটি মেরে বসে হরা। সময় যেতে থাকে। প্রতীক্ষা করে অন্তিম সময়ের। পৃথিবী ধ্বংসের। রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। পৃথিবী ধ্বংসের কোনো আলামতই তারা দেখতে পায় না। হরা কাঁদতে শুরু করে। নামাজ শেষ হয়ে যায়। হরা আরও জোরে কান্নাকাটি শুরু করে। সময় যত গড়ায় হরার কান্নার বেগ ততই বাড়ে।

জগলু হরার কাঁধে হাত রেখে বলে, আমি বুজিচি তুই কিসেক এতো কান্দুচ্চু। চিন্তা করিস না, পেঁজের বেপারি জগলু আছে না?



হআত্রাই, নওগাঁ

পরবর্তী খবর পড়ুন : সস্তার তিন অবস্থা

অন্যান্য