নন্দন

নন্দন

ঈদের টেলিভিশন যেমন

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০

ঈদ মানেই আনন্দ সময়। এই আনন্দময় সময়কে আরও আনন্দঘন করে তুলতে টিভি চ্যানেলগুলো নিয়ে আসে নানা স্বাদের অনুষ্ঠান। তবে এসব অনুষ্ঠান দর্শকের মন কতটা রাঙাতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আর এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন ইকবাল খন্দকার

গুণগত মানের চেয়ে সংখ্যার প্রাধান্য

অধিক সংখ্যক এমনকি রেকর্ড সংখ্যক নাটক টেলিছবি নির্মিত হবে ঈদকে কেন্দ্র করে- এটা দোষের কিছু নয়। বরং আনন্দের। কারণ যেখানে আমাদের চলচ্চিত্রাঙ্গনে সুনসান নীরবতা বিরাজমান, সংগীতেও যেখানে প্রায় নীরব; সেখানে যদি নাটকপাড়া সরব থেকে অধিক নির্মাণে মনোনিবেশ করে তাহলে সংশ্নিষ্টরা আশার আলো দেখেন নিঃসন্দেহে। তবে এ আলো ততটা বিকশিত হতে পারে না, যদি সংখ্যার সঙ্গে গুণগত মানের সংযোগ ঘটানো সম্ভব না হয়। এই ঈদে সংযোগ ঘটানোর ক্ষেত্রে আমরা কতটা সফল হয়েছি? যদি এক কথায় এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়ে তাহলে তিক্ত কথাটা চোখ বন্ধ করেই বলে দিতে হবে- আমরা খুব সামান্যই সফল হয়েছি। তার মানে ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী। আর এই ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। কিছু কারণ উল্লেখ করা যাক, ঈদের নাটক টেলিছবি দেখে মনে হয়েছে আমাদের নাট্যাঙ্গনে শিল্পী সংকট চলছে। এই কথা এই কারণেই বলা, প্রায় প্রতিটি চ্যানেলেই ঘুরেফিরে নির্দিস্ট কিছু মুখ দেখতে হয়েছে আমাদের। অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব'র কথাই ধরা যাক, তিনি নিজেও হয়তো জানেন না ঈদে তার কতগুলো নাটক-টেলিছবি প্রচার হয়েছে। হ্যাঁ, সব হয়তো ঈদের জন্য নির্মাণ করা হয়নি। পূর্বে নির্মিত নাটক-টেলিছবিও এ ঈদে প্রচার হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অভিনেতাকে ততটা দোষারোপ করা না গেলেও চ্যানেলগুলোকে অবশ্যই দোষারোপ করা যায়। কেন একই অভিনেতার এতগুলো নাটক-টেলিছবি প্রচার করতে হবে?

ঈদের সময় ৭ বা ১০ পর্বের ধারাবাহিক নাটকের প্রচলন খুব বেশিদিন আগে হয়নি। একট সময় ঈদ মানেই ছিল একক নাটক। আর এতে অন্যতম আকর্ষণের কারণও ছিল। তারপর যখন ধারাবাহিকের প্রচলন হলো দর্শক কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হলেও পুরোপুরি অসন্তুস্ট হননি, কারণ গল্পগুলো ভালো ছিল। এরপর শুরু হলো ছোট নাটককে টেনে লম্বা করার প্রবণতা, সেই প্রবণতা এবারের ঈদেও লক্ষ্য করা গেছে। আরও লক্ষ্য করা গেছে, অসঙ্গতিপূর্ণ গল্পের নাটক টেলিছবি নির্মাণের প্রবণতা। বাংলাভিশনে প্রচারিত 'এ বিটার লাভ স্টোরি' নাটকটির কথাই ধরা যাক, এটি দেখে মনে হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে রাখার জন্য নাট্যকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে চেষ্টা মতান্তরে অপচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এদিকে আরটিভি প্রচারিত 'ওস্তাদ আলীচাঁদ বকসী' নাটকটি দেখে মনে হয়েছে, গল্পে গতি না থাকলেও নাটক-টেলিছবি বলে চালিয়ে নেওয়া যায়। যেহেতু দর্শক তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিবাদ করতে পারছেন না। তবে কোনো কোনো নাটকের গল্প নিঃসন্দেহে দারুণ ছিল। যেমন জিটিভিতে প্রচারতি 'মুখোশ', এশিয়ান টিভিতে প্রচারিত 'সারপ্রাইজ', বাংলাভিশনে প্রচারিত 'অপরূপ' ইত্যাদি।

ছোট পর্দাই যখন বড় পর্দা

গত ঈদের মতো এবারও বন্ধ ছিল সারাদেশের সিনেমা হল। যে কারণে স্বাভাবিকভাবে মুক্তি পায়নি নতুন সিনেমা। তাই বলে সিনেমাপ্রেমীরা সিনেমা দেখা থেকে বঞ্চিত হবেন, তা হতে পারে না। এ বিষয়টিকে মাথায় রেখেই টিভি চ্যানেলগুলো অন্য যে কোনো বছরের ঈদের তুলনায় এবার প্রচার করেছে অধিক সংখ্যক বাংলা সিনেমা। তবে এখানেও সেই একই সমস্যা অর্থাৎ ঘুরেফিরে একই মুখ।

এক নাগরিক টিভিতেই প্রচার হয়েছে শাকিব খানের ২২ সিনেমা। কোনো কোনো চ্যানেল তার সিনেমা প্রচার করেছে সপ্তাহব্যাপী। আর দিনে শাকিব খানের একটি সিনেমাও প্রচার করেনি, এমন টিভি চ্যানেল খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু কেন? অন্যান্য অভিনেতার সিনেমা কি সমপরিমাণে প্রচার করা যেত না? সবাই তো একই অভিনেতার সিনেমা পছন্দ নাও করতে পারেন। চ্যানেলগুলো চাইলেই কি সবার পছন্দের কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন যুগের সিনেমা প্রচার করতে পারত না? অনেকে টিভি খুলে বসেন পুরোনো দিনের জনপ্রিয় সিনেমাগুলো দেখে স্মৃতিকাতর হওয়ার আশায়। টিভি চ্যানেলগুলো তাদের সেই আশা পূরণের প্রতি বিন্দুমাত্র মনোযোগী ছিল না। এমনিতে অসহনীয় চাপ না থাকলেও ঈদে চাপ বেড়ে যায় বিজ্ঞাপনের। যেহেতু একেকটি সিনেমার দৈর্ঘ্য কয়েকটি নাটক-টেলিছবির সমান, তাই বিজ্ঞাপনের বাড়তি চাপটা পুরোপুরি দৃশ্যমান হয় সিনেমার ক্ষেত্রে। দেখা যায় সিনেমার অনেক গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য কেটে ফেলা হয় শুধু বিজ্ঞাপনের জায়গা করে দেওয়ার জন্য। এতে একটি সিনেমা সম্পর্কে বাজে ধারণা তৈরি হয় দর্শকমনে। আরেকটি বিষয় যে সিনেমাগুলো টিভিতে দেখে দেখে দর্শক বিরক্ত হয়ে গেছেন, সেসব সিনেমাও দেখানো হয়েছে ঈদে। ঈদ উপলক্ষে নতুন সিনেমা দেখানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়নি চ্যানেলগুলোর মধ্যে। নতুন সিনেমা বলতে যেগুলো আগে দেখানো হয়নি। তবে আগে দেখানা হয়নি, এমন সিনেমা কোনো চ্যানেলই দেখায়নি তা বলা যাবে না। এনটিভি দেখিয়েছে 'নবাব' ও 'ধ্যাৎতেরেকি'। চ্যানেল আইয়ের সিনেমা নির্বাচনেও নতুনত্ব ও রুচির ছাপ ছিল। রুচির ছাপ ছিল আরটিভির সিনেমা নির্বাচনেও। বিশেষ করে তাদের নির্বাচিত 'যদি একদিন' সিনেমাটি ছিল দর্শকদের জন্য অন্যতম সেরা ঈদ উপহার। ঈদে দলবেঁধে দর্শক সিনেমা হলে যান, এটি দেশের ঐতিহ্য। সময়ের পরিবর্তনে এই ঐত্যিহ্যের পরিবর্তন হলেও একেবারে ভাটা পড়েনি। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে গত ঈদ এবং এই ঈদে যেহেতু দর্শক হলে যেতে পারেননি, তাই টিভি চ্যানেলগুলোর পক্ষে অত্যন্ত সহজসাধ্য ছিল সিনেমাপ্রেমীদের আটকে রাখা। কিন্তু টিভি চ্যানেলগুলো এ সহজসাধ্য কাজটিও করতে চায়নি। যদি চাইত, তাহলে সিনেমা প্রচারের বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে পরিকল্পনা করতে পারত। জোর দিতে পারত এমন সব সিনেমার প্রচারের ওপর, যেগুলো আগে কখনও টিভিতে প্রচার হয়নি। যেহেতু টিভি চ্যানেলগুলো এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা করেনি। অতএব দর্শক যদি সেভাবে আগ্রহ না দেখান, এর জন্য দর্শককে দোষ দেওয়া যায় না।

তারকানির্ভর অনুষ্ঠান ও অন্যান্য

দেশীয় টিভি চ্যানেলে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের খরা শুরু হয়েছে আরও অনেক বছর আগে থেকেই। আর এই খরার চূড়ান্ত রূপ দেখা গেছে গত ঈদ এবং এই ঈদে। কারণ ইত্যাদির মতো দর্শকনন্দিত ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানেরও ধারণ সম্ভব হয়নি মহামারির কারণে। ফলে দর্শক বঞ্চিত হয়েছে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের নানামুখী স্বাদ থেকে। তবে ইত্যাদি প্রচার হয়েছে সংকলিত অনুষ্ঠান হিসেবে, যা দর্শককে ভিন্নরকম স্বাদ দিয়েছে। দেশীয় টিভি চ্যানেল প্রতি ঈদেই মুখর হতো তারকাদের পদচারণায়। ফলে দেখা যেত কালেভদ্রে যেসব তারকাকে টিভি পর্দায় দেখা যায় না, তাদেরও দেখা যেত ঈদে। এবারে ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটেছে। জমজমাট তারকানির্ভর অনুষ্ঠান বলতে যা বোঝায় এবার সেগুলো চোখে পড়েনি। তবে চ্যানেলগুলোর চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। তারা চেষ্টা করেছে ভিডিও কলের মাধ্যমে সংযুক্ত হতে তারকাদের সঙ্গে। এতে দর্শকদের আগ্রহ অনেকাংশে পূরণ হয়েছে। তবে এসব অনুষ্ঠানের চিরাচরিত যে আদল, সেই আদলের অনুপস্থিতি অসন্তুষ্টিতে ভুগিয়েছে দর্শকদের। করোনার কারণে ক্রিকেট তারকারা অনেক দিন ধরেই অবস্থান করছেন আলোচনার বাইরে। এ অবস্থায় তাদের নিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী ঈদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই উদ্যোগের জন্য চ্যানেল টোয়েন্টিফোরও প্রশংসার দাবিদার।

সদ্য প্রয়াত সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোরকে নিয়ে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের আয়োজনটিও চমৎকার ছিল। আর বিটিভির ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান 'আনন্দমেলা' নির্মাণে এবার ছিল বৈচিত্র্যের ছাপ। সংগীতবিষয়ক সরাসরি অনুষ্ঠানগুলোতে বিশেষ কোনো বৈচিত্র্য ছিল না। বরাবর যা হয়, এবারও তা-ই হয়েছে। বরাবর যারা সংগীত পরিবেশন করেন এবারও বলতে গেলে তারাই করেছেন। সবমিলিয়ে এবারের ঈদের আয়োজন ছিল মাঝারি মানের। এই মান ঊর্ধ্বমুখী না হলে টিভি দর্শকের সংখ্য দিন দিন বাড়ানোর স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। া