নন্দন

নন্দন

বাবার ভালোবাসায়

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০

বিজরী বরকতউল্লাহ

বাবার ভালোবাসায়

'কোথাও কেউ নেই' নাটকের চিত্রায়ণে কলাকুশলীদের সঙ্গে বরকতউল্লাহ

বাবা এভাবে না ফেরার দেশে পাড়ি দেবেন, তা কিছুতেই ভাবনায় ছিল না। সবসময় মুখে হাসি লেগে থাকত তার। কখনও নিজের মনের কষ্ট কাউকে বুঝতে দিতেন না। পরিবারের সবার প্রতি তিনি সবসময় সচেতন থাকতেন। বাবা সবসময় তার মানিব্যাগে আমার একটা ছবি রাখতেন। তিনি যে আমাকে এতটা ভালোবাসতেন, তা বলে বোঝানো যাবে না। এখন বাবা নেই, সেই ভালোবাসা আর কোথায় খুঁজে পাব। সেই ছোটবেলা থেকে বাবার ধারালো যুক্তিনির্ভর কথা শুনে সবসময় অনুপ্রাণিত হয়েছি। তার মেধা-প্রজ্ঞা দেখে সবসময় বিস্মিত হয়েছি। বলা যেতে পারে, আমার বাবার হাত দিয়েই তৈরি হয়েছে এ দেশের টেলিভিশন নাটকের অন্যতম এক ইতিহাস। বিটিভির সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারাবাহিক 'সকাল সন্ধ্যা', 'ঢাকায় থাকি', 'কোথাও কেউ নেই'সহ কত অসাধারণ নাটক বাবা তৈরি করেছেন। এ ছাড়া বাবার প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে অনেক অনুষ্ঠান। বাবা অনেক মনোযোগ সহকারে প্রতিটি কাজ করতেন। মনে আছে বাবা সবসময় বলতেন, 'যখন যে কাজটি করবে, সেটাতে পরিপূর্ণ মনোযোগ দেবে। তাহলেই দেখবে সেটা তোমার যেমন মনের মতো হবে, ঠিক তেমনি অন্যজনেরও মনের মতো হবে।' ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাবার অভিষেক হয় একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে। এরপর ১৯৬৭ সালে ডিআইটি ভবনে ঢাকা টিভিতে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন। নির্মাণ করেন ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'বিচিত্রা'। মায়ের কাছে শুনেছি, পরে বাবাও বলেছেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন বাবা। কালো পতাকা হাতে 'বাংলার রূপে টেলিভিশন সাজো' স্লোগান নিয়ে রাজপথে নামেন। ১৯৭২ সালে টেলিভিশনের ওপর প্রশিক্ষণ নিতে বিবিসির টিভিতে যান। সেখান থেকে ফিরে এসে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিষয়ক ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেন। তিনি ৭০-এর দশকে কিছু সংখ্যক তথ্য ও প্রতিবেদনমূলক অনুষ্ঠান, নাটক, ম্যাগাজিন, নৃত্যানুষ্ঠান ও শিশুদের অনুষ্ঠান নির্মাণ করেন। ৮০-র দশকের শুরুতে প্রথম জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন ধারাবাহিক নাটক 'সকাল সন্ধ্যা' প্রযোজনা করে। শহুরে যৌথ পরিবার ও একক পরিবারের বিভিন্ন রকম মানুষের সাধারণ গল্প নিয়ে সাজানো সেই নাটক, দর্শকদের মাঝে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়। বলা যায় প্রথম সিরিজ নাটক, যা সব শ্রেণির দর্শকের মনে গেঁথে আছে।

বাবার আরেকটা উল্লেখযোগ্য কাজ হলো ১৯৮৭ সালে কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার ১০টি গান নিয়ে সাজানো ঈদের একক সংগীতানুষ্ঠান 'উপহার'। আজও দর্শকদের মনের মণিকোঠায় জেগে আছে সেই অনুষ্ঠানের গানগুলো। সেই অসাধারণ পরিচালনা বিটিভির ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। বাবার অন্যতম অনবদ্য সৃষ্টি নাটক 'ঢাকায় থাকি'। ঢাকা শহরে বসবাসকারী নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত- তিন শ্রেণির মানুষের জীবনের নানা টানাপোড়েন চমৎকারভাবে ফুটে উঠে সেই নাটকে। অল্পকিছু সাপ্তাহিক নাটক পরিচালনা করেছিলেন বাবা। বেশিরভাগই প্রশংসিত হয়েছে। যেমন, ১৯৮৫ সালে মোর্শেদ চৌধুরী রচিত 'এরা ছিলো এধারে'। এই নাটকে অভিনয় করেন হুমায়ুন ফরীদি, লুবনা আহমেদ, আরিফুল হক ও আলেয়া ফেরদৌসী। মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত এই নাটকের কথা আজও বহু দর্শক মনে রেখেছেন। মোর্শেদ চৌধুরীর আরও একটি স্মরণীয় নাটক 'সুখের ছাড়পত্রে'র পরিচালক ছিলেন বাবা। আফজাল হোসেন ও লুবনা আহমেদ অভিনীত সেই নাটকের একটা সংলাপ 'ওহ বয় ...' মানুষের মুখে মুখে ফিরত। মোর্শেদ চৌধুরী রচিত আরও দুটো নাটকের পরিচালনা করেছিলেন তিনি। 'দূরের বাঁশী' এবং 'ওহে পরবাসী' নামের সেই নাটক দুটো প্রশংসা পেয়েছে। আজিজ মিসির রচিত অল্পকিছু নাটক পরিচালনা করে সুখ্যাতি পেয়েছিলেন বাবা। ১৯৮৭ সালে বাবার প্রযোজনায় 'কয়েকদিনের ছুটি' সুধীমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। তার আরেকটি উলেল্গখযোগ্য কাজ কাজী মাহমুদুর রহমান রচিত, আফজাল হোসেন ও শান্তা ইসলাম অভিনীত বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে নির্মিত নাটক 'হারজিত'। মজাদার গল্পের সেই নাটকের স্মৃতি আজও অম্লান। সেই সদালাপী সরল সহজ হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল সৃজনশীল নাটকের করিগর চিরবিদায় নিয়েছেন। বাবা নেই, কিন্তু তার সঙ্গে থাকা অসংখ্য স্মৃতি জেগে আছে মনে। বাবার নির্দেশনায় 'কোথাও কেউ নেই' ও 'সুখের ছাড়পত্র' নাটকে অভিনয়ের সুযোগ হয়েছিল। তখন আমি ছোট ছিলাম। তবে তার সৃজনক্ষমতার তখন থেকেই আমি ছিলাম একনিষ্ঠ ভক্ত।