নন্দন

নন্দন


যেমন ছিল টিভির ঈদ অনুষ্ঠান

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০১৯      

ঈদের আনন্দে বাড়তি মাত্রা যোগ করতে প্রতিটি টিভি চ্যানেল দর্শকের সামনে উপস্থাপন করে নানারকম আয়োজন। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু যাদের জন্য এই আয়োজন, তারা কতটা বিনোদিত হয়েছেন কিংবা আয়োজনগুলো কতটা মানসম্পন্ন ছিল- এসব প্রশ্ন থেকেই যায়। বরাবরের মতো এবারও এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন  ইকবাল খন্দকার

নাটকীয়তাবিহীন নাটক ও টেলিছবি

নাটকের মূল ভিত্তি হচ্ছে- নাটকীয়তা। যার প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহূত হতে পারে 'চমক' শব্দটি। তার মানে নাটকের জন্য নাটকীয়তা বা চমক অপরিহার্য। অথচ ঈদের নাটকে এই অপরিহার্য বিষয়টির ঘাটতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ঘাটতিটা তৈরি হতে দেখা গেছে গল্পের কারণে। অর্থাৎ, নির্মাণ ভালো কিংবা চলনসই হলেও গল্প ছিল দুর্বল। ১০০ নাটক থেকে বাছাই করে এমন ১০টা নাটকও বের করা যায়নি, যেগুলোর গল্পে নাটকীয়তা বা চমক ছিল। যেগুলো দেখে দর্শক মনের অজান্তেই বলে উঠেছেন- 'বাহ!' অথচ এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, সাধারণ দর্শক নির্মাণ বোঝেন না। বোঝেন গল্প। নির্মাণ যদি মাঝারি মানেরও হয়, গল্পের শক্তির কারণে একটা নাটক স্থায়ী আসন গেড়ে নিতে পারে দর্শক-মনে। দুঃখজনক হলেও সত্য, খুব কম নাটক দেখেই মনে হয়েছে- শেষটা দেখা দরকার। তার মানে গল্পের শুরুটা দেখেই দর্শক বুঝে নিয়েছেন শেষে কী হবে। অথচ নাটকগুলোতে যারা অভিনয় করেছেন, তারা দেশের প্রথম সারির অভিনেতা-অভিনেত্রী।

অভিনয়ে যতটা দক্ষ আর জনপ্রিয় হওয়া দরকার, তারা ততটাই জনপ্রিয় ও দক্ষ। সুতরাং এটা পরিস্কার যে, শিল্পী নিয়ে কোনো কথা বা আপত্তি নেই। নির্মাণও ঠিক আছে। তাহলে আপত্তিটা কোন জায়গায়? কেন দর্শকের মনে হয়নি শেষটা দেখা দরকার? জি, সব প্রশ্নের একটাই জবাব- নাটকীয়তাবিহীন গল্প। এখন ফিরে তাকানো যাক পেছনে। একটা ভালো গল্প বাছাইয়ের দায়িত্ব কার- পরিচালকের। কিন্তু এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি কতটা সততার পরিচয় দিচ্ছেন? তার মনোযোগ দেওয়া দরকার নির্মাণে। কেন তাকে পাণ্ডুলিপি রচনা করতে হবে? হ্যাঁ, যদি তিনি যথেষ্ট মেধাবী আর দক্ষ হন, তাহলে একসঙ্গে রচয়িতা এবং পরিচালক হিসেবে আবির্ভূত হতেই পারেন। কিন্তু এর ব্যতিক্রম হয়েও একাধিক কাজ একসঙ্গে করে যাবেন, তা তো হয় না। প্রায়ই শোনা যায়, যারা রচনা-পরিচালনা দুটোই করেন, তারা নাকি আগে থেকে পাণ্ডুলিপি লেখেন না। শুটিং স্পটে গিয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের 'সিচুয়েশন' বুঝিয়ে দেন, তারা নিজের মতো করে ডায়ালগ ডেলিভারি দিয়ে দেন। আবার এই সিস্টেমটা অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীরও নাকি খুব পছন্দ। বিশেষ করে যারা বাসা থেকে স্ট্ক্রিপ্ট পড়ে আসাটাকে বিরক্তি বা বাড়তি পরিশ্রমের কাজ মনে করেন। তো এই যে 'শুটিং সিস্টেম', এর অশুভ ছাপ ছিল এবারের নাটকে। বলছি না শুটিংগুলো এই সিস্টেমেই হয়েছে; শুধু বললাম, 'ছাপ ছিল'। তা না হলে প্রতিটি গল্পেই নাটকীয়তা থাকার কথা ছিল, চমক থাকার কথা ছিল। আর গল্পে চমক রাখার দায়িত্বটি মূলত গল্পকার তথা নাট্যকারের। তার দায়িত্বটা তাকে পালন করতে না দিয়ে পরিচালক যদি নিজে পালন করতে চান, তাহলে নাটকের চমকহীনতা দিন দিন বাড়বে আর দর্শকের সংখ্যা কমে চলে যাবে শূন্যের ঘরে। এবার বাংলাভিশনের মতো প্রথম সারির চ্যানেলও পুরনো নাটক 'রিপিট' করার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল।


অথচ ঈদের অনুষ্ঠান যতদিন চলে, ততদিন নতুন নাটক দেখানো হবে- এমন একটা রেওয়াজ ছিল আগে থেকেই। এখন সেই রেওয়াজের ব্যত্যয় ঘটার মানে হচ্ছে- আমরা আগে ভালো নাটক দেখাতে পেরেছিলাম। এখন আর পারি না। তাই 'স্টক' থেকে বের করে পুরনো নাটকগুলো দেখিয়েই দর্শক ধরে রাখার চেষ্টা করি। বিজ্ঞাপনের দোহাই দিয়ে যারা টিভির সামনে বসা থেকে বিরত থাকতেন, তাদের কথা ভেবে এখন প্রচলন করা হয়েছে 'ব্রেক ফ্রি', 'স্বল্প বিরতির নাটক', 'এক বিরতির নাটক' কথাগুলো। নিঃসন্দেহে ভালো কথা, ভালো উদ্যোগ। এবার তাহলে গল্পে চমক বা নাটকীয়তা রাখার চূড়ান্ত উদ্যোগটাও নিয়ে নেওয়া হোক। মনে রাখা জরুরি, গল্পে যদি 'টান' না থাকে, তাহলে এই সেই অফার দিয়ে দর্শক টানা যাবে না।

গড়পড়তা ম্যাগাজিন ও তারকা আড্ডা

এবারের ঈদে বিটিভির ঐতিহ্যবাহী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'আনন্দ মেলা' হাজির হয়েছিল বিশেষ চমক নিয়ে। আর এই চমকের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল চিত্রনায়িকা পপির উপস্থাপনা। প্রথমবারের মতো উপস্থাপনায় এসে আলোচিত হন তিনি। সঙ্গে ফেরদৌসের উপস্থাপনা তো ছিলই। আর অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল চমকপ্রদ কিছু সেগমেন্ট। বিশেষ করে শিশু যন্ত্রশিল্পীদের দলীয় পরিবেশনা। সব মিলিয়ে 'আনন্দ মেলা' তার ঐতিহ্য ও মান বজায় রাখতে পেরেছে- এ কথা বলাই যায়। 'আনন্দ মেলা' ছাড়াও বিটিভি এবং অন্যান্য চ্যানেলে আরও কিছু ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল। যেগুলোর মান গড়পড়তা। আর সব ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানেই কোথায় যেন, কীভাবে যেন 'ইত্যাদি'র একটা প্রভাব থেকেই যায়, যা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। এবার আসা যাক তারকাদের নিয়ে বিভিন্ন চ্যানেলে যেসব আড্ডার অনুষ্ঠান হয়েছে, সেগুলো প্রসঙ্গে। ঈদের আড্ডা মানেই ছোটবেলার ঈদ বনাম বড়বেলার ঈদ, সেলামি, মজার ঘটনা ইত্যাদি, যা বিরক্তির পর্যায়ে চলে গেছে। না, এখানে তারকাদের কোনো দোষ নেই। তাদের যেমন প্রশ্ন করা হয়, তারা তো তেমন উত্তরই দেবেন। এখন কথা হচ্ছে, উপস্থাপকরা বছরের পর বছর ধরে একই প্রশ্ন কেন করবেন? ছোটবেলার ঈদ আর বড়বেলার ঈদের পার্থক্য খোঁজা ছাড়া আর কিছু কি তাদের জানার নেই?

আপনি উপস্থাপক, আপনার এসবের বাইরে কিছু জানার না থাকতে পারে, কিন্তু অনুষ্ঠানটা যাদের জন্য, সেই দর্শকশ্রেণি তো বসে আছেন নতুন কিছু শোনার জন্য। তাহলে কেন আপনি আটকে থাকবেন সেই প্রাচীন আমলের প্রশ্নে? আপনি একজন তারকার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। আপনার কি উচিত না এমন একটা প্রস্তুতি নিয়ে আসা, যাতে গতানুগতিক প্রশ্ন করতে না হয়? তারকা আড্ডা নিয়ে শত হতাশার মাঝে এবার কিছু আশাজাগানিয়া কথা। আর কথাগুলো 'এখানে সবাই আছে' নামক অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে। হারুন রশীদের ভাবনা-পরিকল্পনা এবং মাহবুবা ফেরদৌসের প্রযোজনা ও নির্দেশনায় নির্মিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিজস্ব অনুষ্ঠান এটি। অভিনেতা আফজাল হোসেনের উপস্থাপনায় এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাড়া জাগানো নাটক 'কোথাও কেউ নেই' এর প্রায় সব অভিনেতা-অভিনেত্রী। আসাদুজ্জামান নূর, সুবর্ণা মুস্তাফা, মাসুদ আলী খান, আবদুল কাদের, লুৎফর রহমান জর্জ, আফসানা মিমি প্রমুখ। তাদের স্মৃতিচারণে দর্শক যেন এক ঘণ্টার জন্য ফিরে গিয়েছিলেন 'কোথাও কেউ নেই' এর সোনালি দিনগুলোতে। আহা! ঈদ তারকা আড্ডা কেমন হওয়া উচিত- এই প্রশ্নের এক দারুণ উত্তর 'এখানে সবাই আছে' অনুষ্ঠানটি। আর আড্ডা মানেই যে শুধু তারকাদের উপস্থিতি নয়, প্রতিটি আড্ডারই যে একটা বিশেষ 'থিম' থাকা উচিত, তারও পরামর্শক এবং পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে এই অনুষ্ঠানটি।

টেলিভিশন বনাম ইউটিউব

দিন যত যাচ্ছে ততই টেলিভিশনের বিকল্প মাধ্যম হয়ে উঠছে ইউটিউব। আর এর কারণ, দর্শকের সময় স্বল্পতা। অর্থাৎ, এক নাটক বা অনুষ্ঠান দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করবে, এই ইচ্ছাটা এখন মানুষের নেই। তাই অনেকদিন ধরেই চলে আসছে এই কথাটা- 'পরে ইউটিউবে দেখে নেব নে'। তবে এই কথাটার প্রচলন প্রথম যখন হয়, তখন দর্শক কেবল টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বা নাটকগুলোই পরে ইউটিউবে দেখত। এখন আর সেই সময় নেই। এখন টেলিভিশনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইউটিউবাররাও নির্মাণ করছে নানা স্বাদের অনুষ্ঠান। এসব অনুষ্ঠানের কোনো কোনোটির মান টিভি-অনুষ্ঠানের মানের চেয়েও উন্নত, যা টিভি প্রযোজকদের কপালে ভাঁজ ফেলার মতোই ব্যাপার। দিন যত যাবে, ততই বাড়বে ঈদ উপলক্ষে ইউটিউবারদের নির্মাণ। অতএব, এখনই সময় গুণগত মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান দিয়ে দর্শক ধরে রাখায় সচেষ্ট হওয়া। নইলে এমন সময় আসবে, যখন টেলিভিশন নয়, বরং ইউটিউবারদের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসবে তিন দিন, সাত দিন কিংবা ১০ দিনব্যাপী ঈদ অনুষ্ঠানমালার। তবে একটা বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই, যে বিজ্ঞাপনের কারণে দর্শক টিভি ছেড়ে ইউটিউবমুখী হয়েছে, সেই বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণা এখন ইউটিউবেও। হ্যাঁ, এখন হয়তো বিজ্ঞাপনটা টেনে টেনে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কিছুদিন পর যখন বিজ্ঞাপনদাতারা বুঝে ফেলবে মানুষ টেনে টেনে কেবল অনুষ্ঠানই দেখছে, টানার কারণে তাদের বিজ্ঞাপন কেউ দেখছে না, তখন যে তারা সতর্ক হয়ে যাবে না, বিজ্ঞাপন যাতে টেনে দেখা না যায়, সেই ব্যবস্থা করবে না- এই নিশ্চয়তা কিন্তু নেই। সুতরাং বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণা কমবেশি সবখানেই আছে, থাকতে পারে। যদি বিশেষ কিছু দেওয়া যায়, যদি নাটকীয়তা আর চমক দিয়ে ধরে রাখা যায় দর্শককে, তাহলে বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণা উপেক্ষা করেই তারা মনোযোগ দেবে নাটক কিংবা অনুষ্ঠান দেখায়। আর এতে ঈদ আয়োজন তো বটেই, বছরের অন্যান্য সময়ের আয়োজনও হয়ে উঠবে দর্শকবান্ধব।