পথের সাথীকে চিনে নিও

বন্ধু দিবস

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০১৯      

মাহবুবা সুলতানা

সংসারের নানা রকম জাঁতাকলে পিষে হারিয়ে যায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বন্ধুত্ব। স্বামী এবং স্ত্রীর বন্ধন এবং বন্ধুত্ব হলো পৃথিবীর সবচেয়ে আপন এবং মধুর একটি সম্পর্কের বন্ধন। পরস্পরের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, সমঝোতা, সম্মান এসবের ঘাটতি হলে দাম্পত্য জীবন সুখের হবে এই আশা দুরূহ। অথচ একজন স্বামী বা একজন স্ত্রী যদি পরস্পরের বন্ধু হয়ে থাকাটা শুধু মানসিকতা আর চর্চার ব্যাপার মাত্র

বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও
মনের মাঝেতে চিরদিন তাকে ডেকে নিও
ভুলো না তারে ডেকে নিতে তুমি।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গানটিই যেন বলে দেয় জীবনে একজন সঠিক বন্ধু কতটা প্রয়োজন আর সেই বন্ধুকে চিনে নেওয়া কতটা জরুরি। বন্ধু! একটা ছোট্ট শব্দ। কিন্তু এই ছোট্ট শব্দের গভীরতা অসীম। আর বন্ধুত্ব? এটি এমন একটি আত্মার সম্পর্ক, যা ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ, বংশ-বয়স সব কিছুর বন্ধুত্ব একটি পারস্পরিক সম্পর্ক আর জীবনে একজন ভালো বন্ধুর কোনো বিকল্প নেই। জীবনের নানা সময়ে আমাদের যেই পরিবর্তনগুলো আসে, সবার জীবনে এই পরিবর্তনগুলো সব সময় সুখকর হয় না। জীবনের সেই কঠিন মুহূর্তে ছায়াসঙ্গী হয়ে যদি পাশে কেউ থাকে তাহলে সেই বন্ধুর পথটিও যেন মসৃণ হয়ে যায়। বন্ধু জীবন চলার এমনি এক শক্তি। বন্ধু যদি এমনই এক শক্তি হয়ে থাকে তাহলে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় বন্ধুটি কে? অবশ্যই সে, যার সঙ্গে আমরা আমাদের সারা জীবন নিশ্চিন্তে, নির্ভাবনায় কাটিয়ে দিতে চাই, কাটিয়ে দিতে পারি। জীবনে চলার পথে অবশ্যই বন্ধুর দরকার আছে, আর আমাদের জীবন সঙ্গী/জীবন সঙ্গিনী যদি হয় সেই বন্ধুটি তাহলে জীবনের পথচলাটা হয়তো অনেক সহজ হয়ে ওঠে।

জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক; স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটাও যে বন্ধুত্বপূর্ণ হতে পারে বা হওয়া উচিত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টা কেমন যেন এখনও অনেকের কাছে অন্যরকম, অস্বাভাবিক অনেকটা ভাস্বর চক্রবর্তীর এই কবিতার মতো-

প্রেমিকরা একদিন স্বামী হয়।

স্বামীরা তারপর আর প্রেমিক থাকে না।

অথচ ওমলেট খায়। ফিশফ্রাই খায়।

দু-তিন চারপাক রাস্তায় ঘুরে এসে বিড়ি খায়।

আরো একটু রাত হলে ন্যাংটো ছবি দেখে।

প্রেমিকারা? তারা বা কোথায় যায়?

তারা তো স্ত্রী হয়, আর পেটে বাচ্চা ধরে।

কথাগুলো, কোথায় হারিয়ে যায়।

রান্নাঘরে আলো জ্বলে ওঠে।

যেন স্বামী হয়ে গেলে আর তাকে প্রেমিক হওয়া যাবে না, বন্ধু হওয়া যাবে না। অথচ আমাদের আশপাশে এমন অনেকেই কিন্তু আছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে শুধু একসঙ্গে সংসারই করছেন বছরের পর বছর একই ছাদের নিচে তারা পরস্পরের ভালো বন্ধুও।

আমাদের শোবিজের আদর্শ দম্পতি আলী যাকের ও সারা যাকের। নাটকের দল নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় আসলে আলী যাকের ও সারা যাকের দম্পতির ভালোবাসার প্ল্যাটফর্মের একটি রূপ। নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই আলী যাকের জড়িত। ১৯৭৩ সালে নাগরিকে যোগ দেন সারা যাকের। শুরুতে খুব চুপচাপ আর শান্ত স্বভাবের সারা যাকেরকে চোখেই পড়েনি আলী যাকেরের। একটি নাটকের প্রদর্শনীর ঠিক আগের দিন একজন অভিনেত্রী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলে বিপাকে পড়ে যায় দল। এ অবস্থায় সারা যাকের নিজে থেকেই এগিয়ে আসেন। আলী যাকেরের ওপর ভার পড়ে তাকে তৈরি করার। খুব দ্রুতই চরিত্রটিতে নিজেকে মানিয়ে নেন সারা যাকের। তার এই প্রতিভা মুগ্ধ করে আলী যাকেরকে। এই ঘটনার রেশ ধরেই আলী যাকের আর সারা যাকেরের কাছে আসা। দু'বছর পর বিয়ে।

একসঙ্গে তারা থিয়েটার করছেন, একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা পরিচালনা করছেন। প্রায় প্রতিদিনই তারা একসঙ্গেই অফিস আসেন, বেশিরভাগ দিন একসঙ্গেই ফেরেন। ঘরে-বাইরে সবসময়ই তারা পাশাপাশি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ভালোবাসা সম্পর্কে আলী যাকের বললেন, অনেক রকম ভালোবাসা আছে। নারী-পুরুষের ভালোবাসা হলো মানসিক ও শরীরবৃত্তীয় রসায়ন, যা একে অন্যকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করে। সারা যাকেরের মতে, ভালোবাসা হলো একে অন্যের প্রতি আস্থা আর বিশ্বাস। আর ভালোবাসার মূলমন্ত্র হলো, পারস্পরিক নির্ভরতা ও সহমর্মিতা।

বন্ধুত্ব ছাড়া এই সহমর্মিতা, পারস্পরিক নির্ভরতা, আস্থা আর বিশ্বাস অর্জন করা সহজ নয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একজন পুরুষ বা একজন নারী 'স্বামী' আর 'স্ত্রী' হতে গিয়ে পারস্পরিক বন্ধুত্বের জায়গা থেকে কখন সরে আসেন, নিজেরাও টের পান না। অনেকেই চোখ কপালে তুলে বলেন, বিয়ের সম্পর্কে আবার বন্ধুত্ব কিসের? অথবা স্বামী-স্ত্রী আবার বন্ধু হওয়ার দরকার কেন? অনেকে ভাবতেই পারে না স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও হতে পারে। সেখানে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া কেন জরুরি- এটা বোঝানো দুস্কর। বাস্তবতা হলো, সংসারের নানা রকম যাঁতাকলে পিষে হারিয়ে যায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বন্ধুত্ব। স্বামী এবং স্ত্রীর বন্ধন এবং বন্ধুত্ব হলো পৃথিবীর সবচেয়ে আপন এবং মধুর একটি সম্পর্কের বন্ধন। পরস্পরের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, সমঝোতা, সম্মান এসবের ঘাটতি হলে দাম্পত্য জীবন সুখের হবে এই আশা দুরূহ। অথচ একজন স্বামী বা একজন স্ত্রী যদি পরস্পরের বন্ধু হয়ে থাকাটা শুধু মানসিকতা আর চর্চার ব্যাপার মাত্র। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য স্বামী স্ত্রীকে ১) একে অন্যার প্রতি দারুণভাবে শ্রদ্ধাশীল হতে হতে হবে ২) দু'জনের মধ্যে ছাড় দেওয়ার মতো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে ৩) মান অভিমান কিংবা মনোমালিন্যের সময় যে কোনো একজনকে নমনীয় হতে হবে ৪) স্ত্রীকে যেমন স্বামীর ভালোলাগা কিংবা মন্দ লাগার বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে তেমনি স্বামীকেও তার স্ত্রীর জন্য এসব বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

জীবন নামের এই যাত্রাপথে নানা প্রতিকূলতা পার হয়ে দিন শেষে যখন বাড়ি ফিরি তখন প্রিয় বন্ধুটি যদি কাছে এসে মাথায় হাত রেখে পাশে দাঁড়ায়, নশ্বর এই পৃথিবীতে এক জীবনে বেঁচে থাকতে আর কী লাগে বলুন তো? ভাবনার জগতের একটু পরিবর্তন, পুরনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার মানসিকতা আর একটু সচেতনতা আপনার পায়ে পায়ে তাল মিলিয়ে চলা মানুষটিকেই করে তুলতে পারে আপনার সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু!

পরবর্তী খবর পড়ুন : টনসিলাইটিস সমস্যা

অন্যান্য