কেন এই নৃশংসতা

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০১৯      

মাহবুবা সুলতানা

একদল মানুষ (মানুষ!!!) হাতে লোহার রড, লাঠিসোটা নিয়ে শরীরের পুরো শক্তি দিয়ে 'কিছু একটা' মারছে। আর শ'খানেক লোক নিজেদের স্মার্টফোনে সেই মারের দৃশ্য ধারণ করছে। মারার ধরন দেখলে মনে হতে পারে, বিষাক্ত কোনো সাপ মারছে সবাই। আমাদের দুর্ভাগ্য, এই 'কিছু একটা' আর কিছু নয়, একজন জলজ্যান্ত মানুষ, একজন মা, একজন হতভাগ্য তাসলিমা বেগম রানু। কেন মার খেলেন রানু? সন্দেহের জেরে। নিজের দুই সন্তানকে ভর্তির বিষয়ে খবর আনতে স্কুলে গিয়েছিলেন রানু। স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছু নারী তার নাম-পরিচয় জানতে চান। হয়তো রানু তাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন, হয়তো উত্তর দিতে গিয়ে রানু দ্বিধা করছিলেন, কী হয়েছিল আমরা তো সঠিক কেউ তা জানি না। লোকজন মিলে তাকে নিয়েও গিয়েছিল প্রধান শিক্ষকের কক্ষে। কিছুক্ষণের মধ্যে শত শত লোক এসে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যায় রানুকে। স্কুলের বাইরের ফাঁকা জায়গায় শুরু হয় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি।

তার পরের ঘটনা কম-বেশি আমরা সবাই জানি। হতভাগ্য রানু আর ফিরে আসেনি বাসায় তার অপেক্ষারত সন্তানদের কাছে। ফেসবুক আর শত শত মানুষের স্মার্টফোনের কল্যাণে আমরা দেখেছি থেঁতলে যাওয়া মুখে রক্তমাখা চুলে ঢাকা রানুর বিমর্ষ চেহারা। দেখেছি নিথর হয়ে যাওয়ার পরও কেমন করে একদল মানুষ পাষণ্ডের মতো পিটিয়েছে একজন রানুকে। রানুর এই ঘটনা একটা দুর্ঘটনা হয়ে এখানেই শেষ হয়ে গেলে পারত। কিন্তু তা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী গত কয়েক দিনে প্রায় ১৯ জন মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছে। এর সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে। তবে গত শনিবারই গণপিটুনিতে মারা গেছে ৫ জন।

আমাদের আশপাশের মানুষ যেন হঠাৎ করেই কেমন অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছে। অনায়াসে মারতে মারতে মানুষ মেরে ফেলছে, নৃশংস-উন্মত্ত আচরণ করছে। যেন তাদের ভেতরে কোনো মায়া নেই, মমত্ববোধ নেই, ভালোবাসা নেই। একেকটি গুজবকে কেন্দ্র করে একেকটি দুর্ঘটনা ঘটছে আর মানুষ আতঙ্কিত হচ্ছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে সেই আতঙ্ক। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এক ধরনের গণহিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত এখন। হিস্টিরিয়া কী? এটি এক ধরনের মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে একই সঙ্গে আতঙ্ক এবং প্রচণ্ড আবেগ কাজ করে এবং এই অবস্থায় এ ধরনের রোগীরা যে কোনো ধরনের কাজ করতে পারে। আমাদের চারপাশে এখন ঠিক এই ঘটনাই ঘটছে। নিজেদের আতঙ্ক দূর করার জন্যই মানুষ এমন নৃশংস আচরণ করছে। প্রাণ নিয়ে নিচ্ছে অন্য মানুষের। কেন হচ্ছে এমন? কেন মানুষ এমন পশুর মতো আচরণ করছে? কেন মানুষের মনে এত আতঙ্ক? এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবার সময় এসেছে এখন। এই প্রশ্ন করলে অনেকেই বলবেন, দীর্ঘদিনের নির্যাতন, বিচারহীনতার পরিবেশ, নির্যাতনের পরিবেশ থেকে পরিত্রাণের উপায় না পাওয়া, নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক এমন নানা রকম কারণে জনগণের মনে রোষানল জমতে থাকে। সেই রোষানলেরই বহিঃপ্রকাশ এই নৃশংসতা। বর্তমান সময়ে কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। সবাই বিভাজিত। আর বিভাজিত সময়ের বহিঃপ্রকাশ এই গণপিটুনি। মানুষ হিসেবে প্রতিটি মানুষই বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ তাগিদ অনুভব করে এবং প্রতিটি মানুষের ভেতরে দুটি সত্তা বাস করে। একটি সৃষ্টিশীল সত্তা আরেকটি ধ্বংসাত্মক। সৃষ্টিশীল সত্তা মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতা তৈরি করে, তাকে নতুন নতুন নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করে। অন্যদিকে ধ্বংসাত্মক সত্তা সব সময় নিজের বা নিজের গোষ্ঠীর নিরাপত্তার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকে। নিজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়- এমন কোনো আশঙ্কা থেকেই মানুষের মধ্যে এই মনোভাব জেগে ওঠে। রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে এমন পরিবেশ বজায় রাখা, যাতে করে তার জনগণ এই দুই সত্তার মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে চলতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষ যে চরমভাবে আতঙ্কিত; গণপিটুনি নামক হিস্টিরিয়া রোগের লক্ষণ হলো তার বহিঃপ্রকাশ। খুব স্বাভাবিকভাবে যদি দেখি এই আতঙ্কের অন্যতম কারণ হলো শিশু। তাদের ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে- এইটাই এই আতঙ্কের অন্যতম কারণ। এখন প্রশ্ন হলো, শিশুদের নিয়ে এমন আতঙ্ক তৈরির কারণ কী? গত কয়েক মাসে শিশু নির্যাতনের যেই ঘটনা ঘটেছে তা আগের সব নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। শিশুদের নিয়ে অভিভাবক তথা সাধারণ জনগণের মধ্যেও এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে এবং সেই সঙ্গে বিচারহীনতার এক দীর্ঘ চর্চা তো রয়েছেই। আছে জবাবহীনতার সংস্কৃতি। প্রশাসনের কোথাও জবাবদিহি কোনো চর্চা চোখে পড়ে না। দীর্ঘদিনের এমন অরাজকতায় মানুষ কারও ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। ফলে তারা প্রশাসন, প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছে আর নিজেদের বাঁচানোর তাগিদেই ধ্বংসাত্মক সত্তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর থেকে বেরিয়ে আসার পথ কিন্তু এত সহজ নয়। মানুষ যখন নিরাপত্তাহীনতার হতাশা থেকে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে তখন তাকে শান্ত করতে হলে, তাকে আশ্বস্ত করতে হবে, তাকে ভরসা দিতে হবে। প্রশাসন তথা সমাজের সর্বস্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

এর থেকে পরিত্রাণ এত সহজ নয়। এই জাতীয় সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কী করতে হবে সেই সম্পর্কেও বলেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, এ ধরনের সমস্যার সমাধান চট করে সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তার সঙ্গে সঙ্গে নিতে হবে তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় পাল্টাতে হবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, বদলে ফেলতে হবে সন্তান বড় করার দৃষ্টিভঙ্গি। পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের গোটা চিন্তার জগতে। আর তাৎক্ষণিক প্রতিকারের অন্যতম উপায় ইবযধারড়ৎ ঞযবৎধঢ়ু। অপরাধীদের গ্রেফতার করতে হবে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে মিডিয়ার জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রচার করতে হবে সচেতনমূলক বার্তা। মিডিয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচারণায় অংশ নিতে হবে সাধারণ মানুষদেরও। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ধর্মীয় নেতা যেমন মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, শিক্ষকসহ সাধারণত যাদের প্রতি মানুষের আস্থা বেশি কাজ করে, তাদের এগিয়ে আসতে হবে।

বিভাজিত এই আমাদের এক হতে হবে। রাষ্ট্র বিচার করতে পারছে না বলে সাধারণ মানুষ হাতে আইন তুলে নিচ্ছে- এটা সাময়িক একটা ব্যাখ্যা হতে পারে, কিন্তু এটাই সমাধান হতে পারে না। রাষ্ট্রের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বুক উঁচিয়ে সবাইকে সংঘবদ্ধ হতে হবে রাষ্ট্রের অনিয়মের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে হবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে, সুবিচার করতে। আমরা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য ভালো ক্যারিয়ার গড়ার উৎসাহ দিচ্ছি। এর পাশাপাশি ওদের মনুষ্যত্বের গল্প, মানবিকতার শিক্ষাও দিতে হবে। ওদের হৃদয়কে কোমল করে গড়ে তুলতে হবে। আর অনতিবিলম্বে এটা করতেই হবে। নইলে বড় হয়ে রানুর মেয়ে তুবা জানবে যে, সে সেই নোংরা শহরেই বড় হয়েছে, যেই শহর তার মাকে শুধু সন্দেহের বশে খুন করেছিল।

পরবর্তী খবর পড়ুন : এই অর্জন দেশের জন্য

অন্যান্য