মঞ্চের বাইরে

মঞ্চের বাইরে


বলি- 'নন্দিতা সুরক্ষা'র কথা

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০১৯      

হাসানউজ্জামান, ফরিদপুর

বলি- 'নন্দিতা সুরক্ষা'র কথা

নন্দিতা সুরক্ষার কার্যক্রম

দেশের নারীরা চরম অনিরাপত্তায়। বাদ নেই শিশুরাও। প্রতিনিয়ত কিছু মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষ নানাভাবে শিশুদের যৌনবস্তু ভেবে নিচ্ছে। গবেষণায় শিশুদের যৌন হয়রানির বিষয়ে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। তাতে দেখা যায়, শতকরা ৭৫ ভাগ যৌন হয়রানির ঘটনাই ঘটে পরিচিতজনের মাধ্যমে। ছেলেশিশুরাও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। প্রতি ছয়জন ছেলেশিশুর মধ্যে একজন যৌন হয়রানির শিকার। মেয়েশিশুদের মধ্যে তা প্রতি চারজনে একজন। শিশু নির্যাতন দেশে এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। 'বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা, আমার এই অক্ষিগোলকের মাঝে তুমি আঁখিতারা'। একগুচ্ছ স্বপ্নমাখা আবেগি এই স্লোগান নিয়ে কলেজের ক্লাস শেষে পাওয়া অবসরটুকু ফরিদপুরের ক'জন উদ্যমী তরুণী কাজে লাগাচ্ছে মেয়েশিশুদের সুরক্ষা ও সচেতন করতে। 'নন্দিতা সুরক্ষা' নামে শুরু হওয়া এই সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগের সঙ্গে রয়েছে উত্তরণ, প্রত্যাশা ও ঘুরিফিরি ফরিদপুর নামের তিনটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। আর এদের সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে কাজটি করছে ফরিদপুরের সমকাল সুহৃদ সমাবেশ। ধর্ষণের পাশাপাশি ধর্ষণতুল্য অপরাধের মাত্রাও অনেক বেড়েছে। এই সচেতনতাও পরিবারের মাঝে শেখানো হচ্ছে। শিশুরা যা শিখছে- আমাদের শরীরে চারটি স্থান আছে, যা খুব বিপজ্জনক। যেসব স্থানে অন্য কাউকে হাত লাগাতে বা স্পর্শ করতে দেওয়া যাবে না। কোন সে চার জায়গা? প্রথম জায়গাটি ঠোঁট, দ্বিতীয়টি বুক, তৃতীয়টি দুই পায়ের মাঝখানে এবং চতুর্থটি পেছনে। এখানে একটা জরুরি কথা আছে, মা-বাবা আমাদের যত্ন নেওয়ার সময় এসব স্থানে কখনও কখনও স্পর্শ করতে পারেন। কখনও কখনও চিকিৎসকও স্পর্শ করতে পারেন। তবে মা-বাবা সঙ্গে থাকলে তবেই চিকিৎসক স্পর্শ করতে পারেন, নয়তো সেটাও পারেন না। আর কেউ যদি বিপজ্জনক স্থানে খারাপভাবে স্পর্শ করে তাহলে সবার প্রথমে জোরে 'না' বলে চিৎকার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমরা সেখান থেকে সরে যাব। কোন জায়গায় যাব আমরা? সেটা ঘর হতে পারে। এমন জায়গায় যেতে হবে, যেখানে আমরা নিরাপদ। কখনও কখনও আমরা ঘরে নাও থাকতে পারি, স্কুলে থাকতে পারি। স্কুলের টয়লেটেও কখনও এ রকম হলে দৌড়ে শিক্ষকের কাছে, শ্রেণিকক্ষে চলে যেতে হবে। প্রিন্সিপালের অফিসে যেতে হবে। তৃতীয়ত, মা-বাবাকে সব খুলে বলতে হবে। হতে পারে সেই সময় মা-বাবা কাছে নেই, সে ক্ষেত্রে দাদা-দাদি বা শিক্ষকের কাছে সব খুলে বলতে হবে। বড়দের মধ্যে এমন কাউকে বলতে হবে, যার ওপর আমাদের ভরসা আছে, যিনি আমাদের সুরক্ষা দেবেন। শিশুদের শেখানো হয়- আমাদের শরীরে ৪টি বিপজ্জনক জায়গায় কেউ স্পর্শ করলে আমরা ৪টি কাজ করব। ১. তাকে বলব- না ২. ওখান থেকে চলে যাব ৩. বাড়িতে বা আপনজনের কাছে যাব ৪. মায়ের কাছে বলব। এটাই মূলত সেফ ও আনসেফ টাচ এডুকেশন। নন্দিতা সুরক্ষার আহ্বায়ক তাহিয়াতুল জান্নাত রেমি জানান, একটি দেশে আট মাস, আড়াই বছর, পাঁচ বছরের কন্যাশিশু ধর্ষিত হয়। হেঁটে হেঁটে ফরিদপুর শহরের বস্তিগুলোতে ঘুরেছি ক'জন বান্ধবী সঙ্গে নিয়ে। চেষ্টা করেছি সেখানকার শিশুদের বোঝাতে। কিছু ক্ষেত্রে বুঝেছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রচার কাজে বাধারও সম্মুখীন হয়েছি। চেষ্টা করছি ওদের মনের ভেতরটা পড়তে, পেরেছি কি-না জানি না, তবে ওদের কোমল হাতের স্পর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছি। আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছেন অনেকে, অনেক সংগঠনের নারী কর্মীরা। শিশুদের এই ভয়ানক যৌন আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে 'নন্দিতা সুরক্ষা' মূলত ফরিদপুর জেলাব্যাপী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেভেলের মেয়েশিশুদের নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ শিক্ষা দেবে এবং এ ক্ষেত্রে করণীয় কী জানাবে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ফরিদপুর সদরসহ ৯টি উপজেলায় কার্যক্রম চলমান থাকবে।

আমাদের এই প্ল্যাটফর্মের প্রচার ও প্রসারের জন্য একটি স্ট্রং মাধ্যম প্রয়োজন, যারা আমাদের সাপোর্ট দেবে এবং এগিয়ে যেতে হেল্প করবে। প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম ফরিদপুর জেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ শিক্ষা দেওয়ার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।