মঞ্চের বাইরে

মঞ্চের বাইরে


শিশুর মন আপনার হাতে

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০১৯      

জোহরা শিউলী

শিশুর মন আপনার হাতে

শিশু বেড়ে উঠুক মনের আনন্দে -ছবি : আয়াতুল আমীন

নানি-দাদির ছত্রছায়ায় ছেলেমেয়ে মানুষ হতো এক সময়। যৌথ পরিবারে অনেক বাবা-মা সারাদিনের জন্য দেখা পেতেন না সন্তানের। কিন্তু তারা নিশ্চিন্তে থাকতেন, বাড়ির যে কোনো প্রান্তেই থাকুক না, তাদের সন্তান নিরাপদে আছে। বর্তমানে সারাক্ষণ বাবা-মাকে উদ্বিগ্ন থাকতে হয় সন্তানকে নিয়ে। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীকে- তার সন্তান ঠিকঠাক আছে তো? সকাল-সন্ধ্যা সন্তানের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তার জন্য বরাদ্দ হচ্ছে সারাদিনের পুষ্টিকর খাবার, শরীরে বেড়ে ওঠার জন্য। কিন্তু তাদের মনের বিকাশে কতটুকু করছি আমরা? তবে বাবা-মায়ের চিন্তার শেষ নেই সন্তানের মানসিক বিকাশে। এ বিষয়ে আমরা কি আরেকটু দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে দেব তাদের মাঝে? বরং মঞ্চের বাইরের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা বাবা-মা, পরিবারের সদস্যদের আরেকটু সচেতন করতে পারি কীভাবে তারা শিশুর কোমল মনকে আরও সুন্দর রূপে সাজিয়ে দিতে পারেন, চারাগাছটি যত্নের মধ্য দিয়ে বড় করে তুলতে পারেন।

পাঠকদের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারাহ দীবা। 'শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের সময়টা তার সারা জীবনের ভিত। এই ভিত যদি মজবুত না হয়; ওই শিশুটা হয়তো সমস্যা সমাধান, পরিকল্পনা বা সমাজের অন্য কারও সঙ্গে মিশতে সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। তাই মা-বাবা, পরিবার থেকে শুরু করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বে যারা আছেন মানে কমিউনিটি, সরকার অর্থাৎ যারা উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।' বললেন ফারাহ দীবা।

তিনি আরও জানান, একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য যেমন সুষম খাবার দরকার, তেমনি মনের দিক থেকে বেড়ে উঠতে মনের যত্ন দরকার। সুশিক্ষা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্থ্য সুরক্ষা ও ভালোবাসা দিয়ে শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পূর্ণ বিকশিত করে তোলা দরকার। সকালে সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আমরা যার যার কর্মক্ষেত্রে চলে যাই। ফোনে খোঁজখবর নিলেও সারাদিনের গল্প, মনের খোঁজ কি আমরা নিই? সন্তানকে নিয়ে অনেক উচ্চাশা, স্বপ্ন থাকা সত্ত্বেও তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অনেক অভিভাবক সন্তানের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করলেও তাদের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। তারা শিশুর বিকাশের মূলে প্রবেশ না করে শিশুর ওপর চাপ প্রয়োগ করে শিশুকে প্রতিযোগী মানসিকতায় গড়ে তোলেন। অনেক শিশুই সে ভার সহ্য করতে না পেরে হীনমন্যতায় ভোগে।

শিশুকে তার বেড়ে ওঠার জন্য সুন্দর পরিবেশ কি আমরা দিতে পারি? শিশুর নৈতিক মূল্যবোধ, শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে যে নির্মল ও প্রাণবন্ত পরিবেশ দরকার, তা কি আমরা শিশুর জন্য দিতে পারি? শিশুর অকপটে সামনে এগিয়ে যেতে ও তার সৃজনশীলতার বিকাশে উপযুক্ত পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। শিশুসন্তান কখন কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, বাড়ি ফেরে কখন, এগুলো বাবা-মাকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সন্তান কতক্ষণ মোবাইল দেখল, ট্যাবে সময় ব্যয় করল, টিভিতে কোন কোন অনুষ্ঠান দেখল, এগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ খেয়াল রাখতে হবে। বিদ্যালয়ে শিশুর ফল আশানুরূপ হচ্ছে কি-না, খেয়াল রাখতে হবে। বাড়িতে গৃহশিক্ষক রাখলেও সে শিক্ষক সন্তানের ঠিকমতো পড়াশোনার ব্যাপারে মনোযোগ তৈরি করতে পারছেন কি-না দেখতে হবে। শিশু শেখার ধাপগুলো একাকী আয়ত্ত করতে পারে না। পরিবেশ ও পরিবার থেকে সে এগুলো শিখে নেয়। কর্মজীবী বাবা-মায়েরা অতি ব্যস্ত সময় কাটান। এর মাঝেই সময় বের করে সময় দিতে হবে সন্তানকে। বাবা-মায়ের আদলেই গড়ে ওঠে সন্তান- এটা তাদের মনে রাখতে হবে এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করতে হবে। এটা করো, ওটা করো না- এমন না বলে বরং যা করা উচিত তা অভিভাবকের জীবনযাত্রায় গেঁথে নিতে হবে। দেখবেন সন্তান আপনাদের দেখানো পথেই হাঁটছে।

আরও যা মেনে চলতে পারেন-
 
-সন্তানকে ভালো কাজে উৎসাহী করুন। যদি সে কোনো ভালো কাজ করে তাকে উৎসাহ দিন।
 
-পারিবারিক ঝগড়া, অশোভন আচরণ শিশুর সামনে আদৌ নয়।
 
-পরিবারের অন্যান্য শিশু ও প্রতিবেশীর শিশুর সঙ্গে আপনার শিশুকে খেলার সুযোগ ও মিশতে দিন।
 
-ভালোমানুষ ও বিভিন্ন নতুন জিনিসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন। এতে মেধার বিকাশ ঘটে।
 
-শিশুর ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেবেন না। তাকে পছন্দ করার সুযোগ তৈরি করুন। এতে তার আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
 
-শিশুকে ধমক, উচ্চ স্বরে কথা, বকা দেবেন না। মারধরও নয়। এতে শিশুর মেধার বিকাশে সমস্যা হয়।
 
-শিশুকে কোয়ালিটি টাইম দিন। তার সঙ্গে কথা বলুন। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। ছুটিতে তাকে বেড়াতে নিয়ে যান। এতে তার বুদ্ধি বিকাশ ঘটবে।
 
-শিশু সৃষ্টিশীল কোনো কিছু করলে তা করতে দিন এবং শেষ হয়ে গেলে তার প্রশংসা করুন। এতে সে সৃষ্টিশীল কাজে আরও উৎসাহ পাবে, যা তার মেধা-মননে কাজে দেবে।
 
-বাসার ছাদ, বারান্দা কিংবা একটু খোলা জায়গা যেখানেই পান সন্তানকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করুন। খেলাধুলায় মেধার বিকাশ হয় পর্যাপ্ত।