৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের অবদান আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করতে ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে দিনটি। ব্যক্তির জীবন গড়ে তোলায় শিক্ষকের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়, শিক্ষকের কথা বলা, জীবনাচার, পছন্দ-অপছন্দ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রেখাপাত করে শিক্ষার্থীর মানসপটে। কোনো কোনো শিক্ষক হয়ে ওঠেন আইকন। দিনটি উপলক্ষ করে আমাদের কয়েকজন গুণী শুনিয়েছেন তাদের প্রণম্য প্রিয় শিক্ষকের কথা



আমার জীবনে শিক্ষা এবং শিক্ষকতা প্রায় একই সঙ্গে শুরু হয়েছিল। ছোটবেলাতে আমি নিজে যখন পড়তাম, তখনই পাশের জনকে আমার সেই পড়াটা শিখিয়ে দিতাম। এটাকে যদি শিক্ষকতা বলি, তাহলে শিক্ষকতা আমার সত্তার সঙ্গেই মিশে আছে। আমাদের সমাজে এমন মানুষ আছেন, যারা অক্ষর চেনেন না কিন্তু তারা নানা জ্ঞানে জ্ঞানী। এমন জ্ঞানী মানুষ তখনকার দিনে গ্রামে গঞ্জে অনেক মিলত।

এখনও এমন অক্ষরজ্ঞানহীন অনেক গুরু আছেন। তাদের জ্ঞানটা বই পড়া জ্ঞান নয়, একদম এই বাস্তব জগৎ থেকে নেওয়া। আমি এমন মানুষদের থেকে অনেক শিখেছি। প্রকৃতি থেকে পাঠ নিয়েছি। সে জন্যই আমার শিক্ষাগুরু বিষয়ে একটা কথা প্রায়শ বলি- 'আমার অথিক গুরু, ব্যথিক গুরু, গুরু অগণন'।

প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও যদি বলি, সেখানেও আমার শিক্ষকসংখ্যা প্রচুর। যখন কেবল গ্রামের পাঠশালায় যাই, প্রথম শ্রেণিতে পড়ি- আমার পাশে যে বন্ধু ছিল, সে আমাকে শেখাত, আমিও তাকে একইভাবে শেখাতাম। এমনি করে একই সঙ্গে শিখেছি এবং শিখিয়েছি।

আমার পাঠশালায় যাওয়া শুরু হয়ে ছিল পাঁচ বছর বয়সেরও একটু আগে। বাবা একদিন আমাকে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। রণ মাস্টার নাম। তিনিই আমাদের প্রথম পণ্ডিত। পাশের গ্রামে তিনি পাঠশালা খুলেছেন। তিনি বললেন, তোমরা ওর পাঠশালায় পড়তে যাবে। আমাদের হাতেখড়িটা সেখানেই হয়েছে। বামুন গ্রামের এক সচ্ছল কৃষকের বৈঠকখানার নিচের অংশে ছিল আমাদের সেই পাঠশালা। সেখানেই আমরা রণজিৎ দৈবজ্ঞ মাস্টারের কাছে অক্ষরজ্ঞান নিতে শুরু করলাম। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়ের প্রথম ভাগ ও দ্বিতীয় ভাগ দিয়ে শুরু। পরে আমি যে পাঠশালায় পড়তে শুরু করলাম, লোকে তাকে বলত দাশরথী পাঠকের পাঠশালা। আর বাবার কাছ থেকে আরও আগেই পেয়েছিলাম জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। সেটা হলো, কখনও মিথ্যা বলা যাবে না। জীবনে তো বটেই, শিক্ষকতায়ও মিথ্যা কথা অবাঞ্ছিত।

আমরা একটু বড় হওয়ার পর আমার বড় বোনের যখন বিয়ে হলো, তাতে আমাদের যিনি দুলাভাই হলেন তিনি অত্যন্ত শিক্ষিত মানুষ ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে এসেছেন। তিনি আমাদের বাড়িতে এলে কখনও এক দেড় মাস থাকতেন। তার কাছেই আমার ইংরেজি শেখার হাতেখড়ি। মজার বিষয় হলো, আমি তার কাছে যা শিখতাম ওইগুলোই ক্লাসে গিয়েই অন্যদের শিখাতাম। এভাবেই আমি আমার শিক্ষাগুরুদের কাছ থেকে জীবনের পাঠ যেমন নিয়েছি, অন্যদেরও তা বিতরণ করেছি সমস্ত জীবন ধরে।

মন্তব্য করুন