একদল তরুণের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা তখনই সমাজকে আলোকিত করে, যখন স্বপ্নগুলো থাকে সমাজের মানুষের জন্য; যখন নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করে তারা সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়। তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রামকে দেশ ও বিশ্বের মাঝে আলোকিত করতে কাজ করে যাচ্ছে তারা। কাজ করছে সমাজের অসহায় ও চলাচলে অক্ষম মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। নাম তাদের 'টিম চিটাগং'।

যেভাবে শুরু

২০১৫ সালে এক চায়ের আড্ডা থেকে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ইমতিয়াজ উদ্দীন জিহাদ, সহপ্রতিষ্ঠাতা যথাক্রমে আহমেদ সাব্বির, আবদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হানসহ আরও কয়েকজন স্বপ্নবাজ তরুণ তাদের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ভাবনায় ছিল চট্টগ্রাম শহরের তরুণদের দক্ষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করা। বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে, এমন ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল তাদের দু' চোখ ভরে। প্রতিযোগিতামূলক এই বিশ্বে চট্টগ্রামের তরুণরা যাতে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে পারে, সে লক্ষ্যেই মূলত এ উদ্যোগ।

২০১৫ সালের ১ মে চট্টগ্রামে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে এই 'টিম চিটাগং'। সংগঠনটির শুরুর দিকের পথটি সহজ না হলেও স্বল্প সময়ে সংগঠনটি তরুণদের কাছে জনপ্রিয়তা পায়। বর্তমানে সংগঠনের সদস্যসংখ্যা ৪০০। টিম চিটাগংয়ের ইভেন্টগুলো হলো- স্কিলস কোর্স, অ্যাকসেস টু ফিউচার, ব্লাড ফর লাইফ, গ্রেইস কমিকন, আইকিউ মাস্টার ২০২০, চট্টগ্রাম ব্যাডমিন্টন ফেস্ট, প্রজেক্ট স্বাবলম্বীকরণ। দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিসের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে সাহায্য করেছে। তারা দক্ষতা আরও পরিপকস্ফ করে বিভিন্নভাবে দেশের সেবা করে যাচ্ছে।

হাসি ফোটানো কর্মসূচি

স্কুল অব ফোর এস : কর্মসূচির ডিজাইন করা হয়েছে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য। এতে বেসিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, দেশের বাইরে লেখাপড়া করতে যাওয়ার ব্যাপারে ধারণা এবং কলেজে থাকাকালে সফট স্কিলসে স্কিলড হয়ে উঠতে পারার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

স্পেশাল স্কিলস কোর্স : এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে এসএসসি পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা তাদের সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে পারে এবং নামমাত্র ফি দিয়ে সময়োপযোগী সব বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পারে সে ব্যবস্থা করা হয়। যেমন গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড-এক্সেল, স্পোকেন ইংলিশসহ ১০টি বিষয়ে মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় মাত্র ৫০০ টাকা ফিতে।

অ্যাকসেস টু ফিউচার : এটি 'টিম চিটাগং'-এর সিগনেচার প্রোগ্রাম; এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে তরুণদের প্রফেশনাল জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্কিলসের ব্যাপারে ধারণা দেওয়া হয়। এটি মূলত দিনব্যাপী একটি প্রোগ্রাম, যেখানে দেশের স্বনামধন্য স্পিকাররা আসেন এবং তরুণরা প্রফেশনাল জীবনের জন্য কীভাবে নিজেদের তৈরি করবে সে ব্যাপারে বিশদ আলোচনা করা হয়।

প্রজেক্ট স্বাবলম্বীকরণ : প্রজেক্ট স্বাবলম্বীকরণের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয় একটি অসহায় পরিবারকে স্বাবলম্বী করে তোলার। সার্ভে করার মাধ্যমে অসহায় পরিবারের একজন ব্যক্তিকে রিকশা বা একটি ছোট দোকান কিনে দেওয়া হয়, যেটা থেকে আয় করে একটি পরিবার আস্তে আস্তে হয়ে ওঠে স্বাবলম্বী। রিকশা বা দোকান দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে না টিম চিটাগং, দুই বছর তাদের তত্ত্বাবধানে রাখেন; এর মধ্যে কোনো সমস্যা হলে সাহায্য করা যায়।

ব্লাড ফর লাইফ : বিশেষ করে ঈদের সময় বা যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে, তখন যাতে রক্তের প্রয়োজনে কষ্টভোগ করতে না হয় তার জন্য ব্লাড ফর লাইফ ইভেন্ট। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোলাবোরেশনের মাধ্যমে ব্লাড সংগ্রহ করে ব্লাডব্যাংকে জমা দেওয়া হয়।

ঈদ ফর অল :কর্মসূচি ঈদ ফর অল-এর মাধ্যমে প্রতি বছর রমজান মাসে ফান্ড সংগ্রহ করে অসহায় মানুষের মাঝে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তাদের কাছে জামাকাপড় এবং সেমাই-চিনিসহ ঈদের আগে বাজার পৌঁছে দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম ব্যাডমিন্টন ফেস্ট : প্রতি বছর শীতের সিজনে ব্যাডমিন্টন ফেস্টের আয়োজন করা হয়। চট্টগ্রামের করপোরেট হাউসগুলো নিয়ে করপোরেট হাউসগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন বাড়ানো হয়।

অর্জন

'টিম চিটাগং'-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঘিরে রয়েছে তরুণরা। টিম চিটাগংয়ের দুই শতাধিক সদস্য, যারা স্নাতক শেষ করে প্রত্যেকেই এখন কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠানে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। সংগঠনের একজন সদস্যও গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর বেকার নেই। সদস্যরা মনে করে, এটাই টিম চিটাগংয়ের অর্জন। তা ছাড়া তিনটি পরিবারকে তিনটি রিকশা এবং তাদের এক বছর নিজেদের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন সমস্যায় সাহায্য করেছে। সেই তিনটি পরিবার এখন সচ্ছল জীবনযাপন করছে। তিনটি পরিবার চরম দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে এখন মোটামুটি স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে- এটা টিম চিটাগংয়ের সার্থকতা।

লক্ষ্য স্বাবলম্বী বাংলাদেশ

'টিম চিটাগং' চট্টগ্রামের তরুণদের নিয়ে কাজ করে। প্রতিযোগিতাশীল বিশ্বে এই শহরের তরুণরা যাতে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে পারে, তার জন্যই এ উদ্যোগ। টিম চিটাগংয়ের স্বপ্ন, বাংলাদেশে অদক্ষ তরুণের সংখ্যা শূন্যে নেমে আসবে এবং একটি স্বাবলম্বী বাংলাদেশ তৈরি হবে।

মন্তব্য করুন